২০১১ সালে ৪২৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০ সেট ডেমু কেনার চুক্তি হয় চীনের তাংশান রেলওয়ে ভেহিকল কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে। এর সঙ্গে শুল্ক, কর, কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ, বিদেশ ভ্রমণ ও ভাতা সংযুক্ত করে সব মিলিয়ে প্রকল্প ব্যয় দাঁড়ায় ৬৫৪ কোটি টাকা। এরপর ২০১৩ সালের শুরুর দিকে রেলের বহরে যুক্ত হয় ২০ সেট ডিজেল ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট তথা ডেমু ট্রেন। সামনে-পেছনে ইঞ্জিনবিশিষ্ট এ ডেমু উদ্বোধন করা হয় সে বছর ২৪ এপ্রিল।
তবে বছরে ১০০ কোটি টাকা মুনাফা হবে এ যুক্তিতে ডেমুগুলো কেনা হলেও এখন রেলের লোকসানের বোঝাই ভারী করছে ডেমু। এছাড়া নিয়মিতই বিকল হয়ে পড়ছে ডেমুগুলো। ডিজাইন ত্রুটি ও নানা কারিগরি জটিলতার কারণে ঘনঘন বিকলও হচ্ছে এসব ট্রেন।
কিন্তু ডেমু মেরামতেও নানা ধরনের জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন ঢাকা-চট্টগ্রামের রেলের ঊর্ধ্বতন কিছু অসাধু কর্মকর্তা। সম্প্রতি রেলের কয়েকজন কর্মকর্তা ডেমু ট্রেন মেরামতে নানা ধরনের অনিয়ম-জালিয়াতির বিষয়ে একটি অভিযোগ জমা দিয়েছেন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বরাবর। এ অভিযোগে ডেমু মেরামতে তিন ধরনের জালিয়াতির তথ্য-প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে।
এতে দেখা যায়, ডেমুর ইঞ্জিন মেরামতে মূল কোম্পানিকে বাদ দিয়ে স্থানীয় এক কোম্পানিকে কাজ দেয়া হয়েছে। আবার ইঞ্জিন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়ে অন্য কোম্পানি থেকে যন্ত্রাংশ কেনা হয়েছে। এছাড়া ইঞ্জিন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের কারিগরি সহায়তা বা ম্যানুয়ালও নেয়া হয়নি।
দুর্নীতি দমন কমিশনে জমা দেয়া অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ডেমুর ইঞ্জিন বিশেষ ধরনের, যেগুলোর মডেল নং-ডি২৮৭৬ এলইউই ৬২২। উচ্চগতিসম্পন্ন ভারী পরিবহনের জন্য খুবই আধুনিক ও উন্নতমানের ইঞ্জিন এগুলো। ইঞ্জিনগুলো তৈরি করেছে জার্মানির এমএএন গ্রুপ। এসব ইঞ্জিন নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করার কথা থাকলেও যা কখনও করা হয়নি।
অথচ এমএএন গ্রুপের লোকাল অফিস বাংলাদেশেই আছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইঞ্জিন রক্ষণাবেক্ষণ ও ওভারহোলিংয়ের জন্য ঢাকায় ওয়ার্কশপও স্থাপন করেছে কোম্পানিটি। বিদেশি প্রকৌশলী ও কারিগরিভাবে দক্ষ ব্যক্তিদের দিয়ে সেখানে কাজ করানো হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, রেলওয়ের পক্ষ থেকে কখনও তাদের সঙ্গে যোগাযোগও করা হয়নি।
২০১৭-১৮ সালে ওয়ার্কশপ ম্যানেজার ডিজেল ঢাকার অধীনে ১০টি ও ২০১৮-১৯ সালে চট্টগ্রামের অধীনে ৫টি ডেমুর ইঞ্জিন ওভারহোলিং করা হয়েছে বলে দেখানো হয়, যা বাস্তবে ধোয়া-মোছা ছাড়া আর কিছুই হয়নি। রেলওয়ের ক্রয়নীতি অনুসারে ডেমু ইঞ্জিন ওভারহোলিং করতে হলে মূল কোম্পানি এমএএন গ্রুপের প্রতিনিধি থাকতে হবে বা এমএএন গ্রুপের মাধ্যমে কাজ করাতে হবে, যা রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ আমলে নেয়নি।
বর্তমান মহাপরিচালক ও অতিরিক্ত মহাপরিচালক (আরএস) এ কাজের মূল পরিকল্পনাকারী। তারা নিয়মনীতি ভঙ্গ করে স্থানীয় এক কোম্পানিকে এই কাজ দেয়। অথচ তাদের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই বললেই চলে, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কোনো বিশেষজ্ঞ নেই, কোনো ওয়ার্কশপ নেই। ওভারহোলিং করার কোনো যন্ত্রাংশও নেই।
এছাড়া এমএএন গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ করে দেখা গেছে, তাদের থেকে ওভারহোলিংয়ের জন্য কোনো খুচরা যন্ত্রাংশ কেনা হয়নি, কোনো কারিগরি সহায়তা নেয়া হয়নি, ইঞ্জিন ওভারহোলিংয়ের কোনো ম্যানুয়ালও নেয়া হয়নি। তদন্তে জানা গেছে, ওভারহোলিং বলা হলেও বাস্তবে তেমন কোনো কাজ হয়নি।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, রেলওয়ের মহাপরিচালক, বিভাগীয় টেকনিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার লোকোমোটিভ ডিএমই লোকো ঢাকা ও চট্টগ্রাম, ডব্লিউএম ডিজেল ঢাকা ও চট্টগ্রাম যৌথভাবে ব্যক্তিগত লাভের জন্য ইঞ্জিনপ্রতি ৫৫ লাখ টাকা করে ওভারহোলিং বিল পরিশোধ করেছেন। মহাপরিচালক নিজস্ব ক্ষমতার কৌশলে এই অর্ডার দেন। এভাবে ১৫ ডেমুতে ৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা ইঞ্জিন ওভারহোলিংয়ের নামে লোপাট করা হয়।
এ টাকা মহাপরিচালক, অতিরিক্ত মহাপরিচালক (আরএস), বিভাগীয় মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, লোকোমোটিভ ডিএমই, লোকো ঢাকা, লোকো চট্টগ্রাম, ডব্লিউএম ডিজেল ঢাকা ও ডব্লিউএম ডিজেল চট্টগ্রাম ভাগাভাগি করে নিয়েছেন।
দ্বিতীয় অভিযোগটি ছিল, ডেমুর জন্য বিভিন্ন খুচরা যন্ত্রাংশ সংগ্রহে মূল নির্মাতা প্রতিষ্ঠান তাংশান ভেহিকলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়নি। তবে ডেমুর খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহের জন্য ৩৮টি কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করেছে রেলওয়ে। আর এসব যন্ত্রাংশ কেনায় কোনো ধরনের উক্ত দরপত্র আহ্বান করা হবে না। সীমিত দরপত্রের (এলটিএম) মাধ্যমে এসব কোম্পানি থেকেই ডেমুর যন্ত্রাংশ কেনা হবে।
আবার ৩৮টি কোম্পানি বলা হলেও এগুলোর প্রকৃত স্বত্বাধিকারী ৫-৬টি কোম্পানি। তারা নিজেদের কোম্পানির নামে ও বেনামে ব্যবসা করে যাচ্ছে। এগুলো হলো এমআরআর ইন্টারন্যাশনাল, দ্য কসমোপলিটান করপোরেশন, এআরএম ইঞ্জিনিয়ার্স, জেআর এন্টারপ্রাইজ, এমআরটি ইন্টারন্যাশনাল ও ফেরদৌস ইমপেক্স (প্রা.) লিমিটেড। এই কোম্পানিগুলো নিজেদের মধ্যে কার্টেল করে নিয়েছে ও বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে বহুগুণ মূল্যে জিনিস বিক্রি করছে।
এদিকে ডেমুর মূল নির্মাতা প্রতিষ্ঠান তাংশান ভেহিকলকে লিস্টেড না করায় বিভিন্ন যন্ত্রাংশের সঠিক দাম জানা যাচ্ছে না। তবে কেনা হচ্ছে নিম্মমানের যন্ত্রাংশ। এক্ষেত্রে ডেমুর ট্র্যাকশন মোটর কেনার উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে।
এ বিষয়ে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, ট্র্যাকশন মোটরের মূল ম্যানুফ্যাকচারার যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাইজেল সাপ্লাই ইনকরপোরেশন। কিন্তু যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী হিসেবে কানাডিয়ান ডিজেল ইমপেক্সকে রেল ইন্ডাস্ট্রিজ কানাডা ইনকরপোরেশনের ডিস্ট্রিবিউটর দেখানো হয়েছে। বাস্তবে রেল ইন্ডাস্ট্রিজ কানাডা ইনকরপোরেশনের সঙ্গে ডিজেল ইমপেক্সের কোনো সম্পর্ক নেই। আর এ কোম্পানি ট্র্যাকশন মোটর তৈরিও করে না।
ডিজেল ইমপেক্সের স্থানীয় এজেন্ট হিসেবে এমআরআর ইন্টারন্যাশনালকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তবে বাস্তবে এ দুটি প্রতিষ্ঠানের মালিক একই। ফলে প্রকৃত ম্যানুফ্যাকচারার থেকে মালপত্র আনা সম্ভব হয়নি। এতে ট্র্যাকশন মোটর সম্পর্কিত ৪টি অর্ডার সম্প্রতি কমপ্লেইন পাওয়ার পরে রেল কর্তৃপক্ষ বাতিল করেছে। এর মধ্যে প্রথমটির অধীনে ১০টি, দ্বিতীয়টির অধীনে ১২টি, তৃতীয়টির অধীনে ১৪টি ও চতুর্থটির ১১টি ট্র্যাকশন মোটর কেনার কথা ছিল।
রেল কর্তৃপক্ষ অনুসন্ধান করে দেখেছে, এখানে বিরাট অনিয়ম হয়েছে। তাই এ দরপত্র বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু কাউকে এ বিষয়ে শোকজ করা হয়নি বা কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেয়া হয়নি। অথচ এ চার অর্ডারের মাধ্যমে প্রায় ২৯ কোটি টাকা দুর্নীতির ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল।
ডেমুর ১০টি এইচএমআই ডিসপ্লে কেনায় অনিয়মের উদাহরণও তুলে ধরা হয়েছে অভিযোগে। এতে বলা হয়, এইচএমআইয়ের প্রতিটির দাম সর্বোচ্চ দুই হাজার ডলার হলেও ৪৯ হাজার ৮০০ ডলারে তা কেনা হয়েছে। এতে প্রায় ৪ কোটি টাকার দুর্নীতি করা হয়েছে। এছাড়া জাম্পার কেবল কেনা হয়েছে প্রতিটি ৪ হাজার ডলারে। যদিও এগুলোর দাম সর্বোচ্চ ২০০ ডলার।
তৃতীয় অভিযোগটি হলো, ডেমুর খুচরা যন্ত্রাংশ একবারে সংগ্রহ না করে ছোট ছোট লটে কেনা হয়েছে। এক্ষেত্রে ২০১৭ সালের একটি দরপত্রের উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। এতে দেখা যায়, ডেমুর জন্য ১২৭ লাইন আইটেম কেনার কথা ছিল। তবে তা একেবারে না কিনে এলটিএমের মাধ্যমে ৫-৬টি ভাগে কেনা হয়, যাতে সিসিএস নিজেই তা অনুমোদন করতে পারে। কারণ দরপত্রের মূল্য বেশি হলে তা অনুমোদনের ক্ষমতা সিসিএসের নেই। সেক্ষেত্রে দরপত্র অনুমোদনের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পাঠাতে হতো।
এসব বিষয়ে জানার জন্য বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) মো. শামসুজ্জামান ও অতিরিক্ত মহাপরিচালক (আরএস) মো. মঞ্জুর-উল-আলম চৌধুরীর সঙ্গে মোঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও তারা ফোন রিসিভ না করায় তাদের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
সূত্র: এসবি/এসএস/এমএফ