ঠিকাদারের টাকায় যুক্তরাষ্ট্র যাচ্ছেন চট্টগ্রাম ওয়াসার ৩ কর্মকর্তা!


২৭ ডিসেম্বর, ২০২৫ ১২:১৫ : পূর্বাহ্ণ

সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে বিদেশ সফরে যাচ্ছেন চট্টগ্রাম ওয়াসার তিন কর্মকর্তা। ঠিকাদারের অর্থে বিদেশ সফর পরিহার করতে চলতি বছরের ৬ এপ্রিল পরিপত্র জারি করে সংশ্লিষ্ট সব দপ্তর ও সংস্থাকে সতর্ক করে সরকার। তবু সেই নির্দেশনা উপেক্ষা করে চট্টগ্রাম ওয়াসার তিন কর্মকর্তা ও স্থানীয় সরকার বিভাগের একজন প্রতিনিধি যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন, এমন তথ্য জানা-জানির পর নতুন করে সৃষ্টি হয়েছে বিতর্ক।

জানা যায়, ২০২২ সালের ডিসেম্বরে চট্টগ্রাম নগরীতে তিন হাজার স্মার্ট মিটার বসানোর জন্য একটি পাইলট প্রকল্প হাতে নেয় চট্টগ্রাম ওয়াসা। ৫ কোটি ৭৯ লাখ টাকা ব্যয়ে এই তিন হাজার মিটার বসাতে সময় লাগে প্রায় সাড়ে তিন বছর। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে এই মিটার বসানোর কাজ শেষ হয়। বর্তমানে চলছে বিলিং কার্যক্রম।

তবে—মিটার বসানোর কাজ শেষ হওয়ার পর ঠিকাদারের টাকায় ডিজিটাল মিটার সরবরাহ, স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত ‘কারিগরি ও সফটওয়্যার প্রশিক্ষণ’ নিতে যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন চট্টগ্রাম ওয়াসার তিন কর্মকর্তা। তাদের সঙ্গে থাকবেন স্থানীয় সরকার বিভাগের একজন প্রতিনিধিও।

সফরকারীদের মধ্যে রয়েছেন ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মুহাম্মদ মাহবুবুল আলম, প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা রুমন দে এবং কম্পিউটার প্রোগ্রামার লুৎফি জাহান। তবে স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধির নাম জানা যায়নি। আগামী সোমবার ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাঁদের যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে যাত্রা করার কথা রয়েছে। সফরের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫ দিন।

বিদেশ সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনোয়ারা বেগম। তিনি বলেন, এই সফরের প্রক্রিয়া অনেক আগেই সম্পন্ন হয়েছে এবং এতে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন রয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এ সফরে সরকারের বা চট্টগ্রাম ওয়াসার কোনো অর্থ ব্যয় হচ্ছে না, ডিজিটাল মিটার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘ঠিকাদার’ সম্পূর্ণ ব্যয় বহন করছে।

জানা গেছে, ২০২২ সালের ডিসেম্বরে হাতে নেওয়া এই পাইলট প্রকল্পে মিটার ছয় মাসের মধ্যে বসানোর কথা ছিল। তবে সেই কাজ শেষ হয়েছে চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে। মিটার স্থাপনে খরচ হয়েছে ৫ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। মিটার সরবরাহ করেছে ‘উইংস ইনভেস্টমেন্ট এলএলসি’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান।

চট্টগ্রাম ওয়াসার কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর এর আগেও অনেকবার হয়েছে। প্রায় প্রতিটি প্রকল্পেই বিদেশ সফর করেন কর্মকর্তারা। তেমনি ২০১৯ সালে উগান্ডা সফর করে আলোচনায় এসেছিলেন। সেইবার ওয়াসার ২৭ কর্মকর্তা-কর্মচারী ‘প্রশিক্ষণের’ জন্য উগান্ডায় সফর করেছিলেন। তাদের সঙ্গে গিয়েছিলেন বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের আরও ১৪ কর্মকর্তা। এ সফর দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন এমন কর্মকর্তাদের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মুহাম্মদ মাহবুবুল আলম সরাসরি ডিজিটাল মিটার স্থাপন কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন না। তবু তাঁকে এই সফরের জন্য মনোনীত করা হয়েছে। এর আগেও তিনি ২০২২ সালের জুলাই মাসে অন্য একটি প্রকল্পের যন্ত্রপাতি কেনার আগে শিল্পকারখানা পরিদর্শনের অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছিলেন। সে সময় তাঁর সঙ্গে আরও কয়েকজন কর্মকর্তা ছিলেন।

সুশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঠিকাদারের অর্থায়নে বিদেশ সফর প্রশাসনিক স্বচ্ছতার পরিপন্থী। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পক্ষপাত, ভবিষ্যৎ প্রকল্প অনুমোদনে প্রভাব বিস্তারের ঝুঁকি তৈরি করে। সরকারি পরিপত্রের মূল উদ্দেশ্য ছিল এসব ঝুঁকি নিরসন করা। কিন্তু বাস্তবে সেই নির্দেশনা কতটা মানা হচ্ছে, চট্টগ্রাম ওয়াসার এই তিন কর্মকর্তার সফর নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।

এসএস/ফোরকান

0Shares

আরো সংবাদ