জোড়াতালির বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে বিপাকে পিডিবি


২৮ ডিসেম্বর, ২০২৫ ১:৪৩ : অপরাহ্ণ

জেনারেটরসহ অন্যান্য যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ২০২১ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। ফলে গত চার বছরে বিপুল এই সম্ভাব্য আয় থেকে বঞ্চিত হয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। সংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, এ সময় থেকে বর্তমান আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা।

জানা গেছে, গ্যাস টারবাইনসহ অন্যান্য যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে প্রায় ৪ বছর বন্ধ রয়েছে পিডিবির শিকলবাহা ১৫০ মেগাওয়াটের এই পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্টটি। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নষ্ট জেনারেটরসহ গ্যাস টারবাইন ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি গুলো আর মেরামতযোগ্য নয়।

পিডিবি সূত্রে জানা গেছে, শিকলবাহা ১৫০ মেগাওয়াটের পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্টটি ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনের পর প্রায় ১০-১১ বছর প্ল্যান্টটি ভালোভাবে চললেও ২০২১ সালের মাঝামাঝি সময়ে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে যায়।

বিপিডিবি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান অবস্থায় নতুন জেনারেটর ক্রয়প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে পুনরায় উৎপাদনে যেতে অন্তত আরও এক থেকে দেড় বছর লাগবে। এতে কেন্দ্রটির লোকসানের অঙ্ক আরও প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা তাঁদের। অথচ যে জেনারেটরের অভাবে উৎপাদন চালু করা যাচ্ছে না সেটি প্রতিস্থাপনে ব্যয় হবে ১৩০ কোটি টাকা।

কেন্দ্রের সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের কাছ থেকে জানা যায়, এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিদ্যুৎ উৎপাদনের জেনারেটরটি আগুনে জ্বলে নষ্ট হয়ে গেছে। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের জেনারেটর, গ্যাস টারবাইনসহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংকটে গত ৪ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে।

পিডিবির এক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জানান, শিকলবাহা ৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি আর মেরামত যোগ্য নয়। এই কেন্দ্রের প্রায় যন্ত্রপাতি গুলো প্রায় নষ্ট হয়ে গেছে। নিয়মিত মেরামত করেও সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। এটি মেরামত করে চালু করতে অনেক টাকার প্রয়োজন। তাই সরকারি ভাবে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে।

কেন্দ্রসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, শিডিউলভিত্তিক রক্ষণাবেক্ষণের অংশ হিসেবে টারবাইন, কম্প্রেসার ও কম্বাশন চেম্বারের মেজর ওভারহোলিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় সব যন্ত্রাংশ ইতিমধ্যে কেন্দ্রের ভান্ডারে মজুত রয়েছে। তবে জেনারেটর সমস্যার কারণে টারবাইন অংশের ওভারহোলিং শেষ করা সম্ভব হয়নি।

জানা গেছে, ২০২৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির জন্য ৯১ কোটি ৮৫ লাখ ৫১ হাজার ৪৮৯ টাকার যন্ত্রপাতি কেনার প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছিল–বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ঢাকার জেঅ্যান্ডসি ইমপেক্সের কাছ থেকে শিকলবাহা পাওয়ার প্ল্যান্টের গ্যাস টারবাইন অংশের সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশ সংগ্রহ, স্থাপন এবং বিশেষজ্ঞ সেবা নেবে।

এ জন্য ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯১ কোটি ৮৫ হাজার ৪৮৯ টাকা। মেরামতের ওই প্রকল্পটি আর বাস্তবায়ন হয়নি। বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি গ্যাস টারবাইনসহ অন্যান্য যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এরও প্রায় দেড় বছর আগে থেকে বন্ধ হয়ে আছে।

শিকলবাহা ১৫০ মেগাওয়াট পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্টের প্রধান প্রকৌশলী গোলাম হায়দার তালুকদার জানান, বিশেষজ্ঞদের সুপারিশের ভিত্তিতে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের ২১০০তম সভায় নতুন জেনারেটর কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নতুন আরোপিত পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর), ২০২৫ অনুসরণ করে জেনারেটর ক্রয়ের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

পিডিবির এক কর্মকর্তা জানান, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহা ইউনিয়নে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির অবস্থান। চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সাতটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে। সাত কেন্দ্রের তিনটি গ্যাসভিত্তিক, দুটি পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্ট, একটি পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও একটি কম্বাইন্ড সাইকেল। যার উৎপাদন ক্ষমতা এক হাজার ২৮৫ মেগাওয়াট, এটিও শিকলবাহা একই এলাকায়। দীর্ঘদিন ধরে সেগুলো চলছিল জোড়াতালি দিয়ে। এর মধ্যে চারটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ রয়েছে।

এই কর্মকর্তা আরও জানান, শিকলবাহার ১৫০ ও ৬০ মেগওয়াট এবং রাউজান ২১০ মেগাওয়াট করে দুটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র আছে। শিকলবাহায় পিডিবির ৩টি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মধ্যে বর্তমানে শুধুমাত্র শিকবাহা ২২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি চালু আছে। এছাড়া ১৫০ পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্টটি জেনারেটর ও গ্যাস টারবাইনসহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির সংকটে চার বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। অপরদিকে ৬০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি যন্ত্রপাতি প্রায় নষ্টের পথে। পিডিবি এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করে নিলামে বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানিয়েছেন পিডিবির সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা।

উল্লেখ্য—এই কেন্দ্রের ব্যবস্থাপকসহ সকল কর্মচারীদের পার্শ্ববর্তী অন্য বিদ্যুকেন্দ্রে বদলি করা হয়েছে। শিকলবাহায় পিডিবির ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি সচল রাখতে প্রয়োজন ৩৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। গত সাড়ে ৩ বছরের বেশি সময় ধরে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেয় কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (কেজিডিসিএল)।

এসএস/এমএফ

0Shares

আরো সংবাদ