চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন মানে নগরজীবনের শৃঙ্খলা ও জনসেবার কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠান যখন আমলাতান্ত্রিক স্বেচ্ছাচারিতা ও দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়, তখন নাগরিকদের ভাগ্যে জোটে হয়রানি, দুর্নীতি আর অগণিত অভিযোগ। এমনই এক অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম।
তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে তিনি ঘুষ, অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারের কোটি কোটি টাকা লোপাট করেছেন। বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন এবং বিদেশে অর্থ পাচার করেছেন। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছে, যা ইতোমধ্যেই আলোড়ন সৃষ্টি করেছে নগরবাসীর মধ্যে।
অভিযোগপত্র বলছে, শেখ মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম একসময় ছিলেন এক সাধারণ পরিবারের সন্তান। তার পিতা ছিলেন একজন চতুর্থ শ্রেণির সরকারি কর্মচারী, যার আয়ের উপর ভর করে পরিবারের জীবন চলত কষ্টেসৃষ্টে। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায়, আমলাতান্ত্রিক ক্ষমতার বলয়ে ঢুকে, তিনি এখন শত শত কোটি টাকার মালিক। কীভাবে সম্ভব হলো এই অভাবনীয় সম্পদ-সঞ্চয়?
নগরীর অভিজাত এলাকায় একের পর এক জমি, দালান, ফ্ল্যাট এবং বিলাসবহুল গাড়ি কেনার পেছনের রহস্য কী? তার স্ত্রী-সন্তানের নামে বার্জ, কার্গো জাহাজ, ট্রলার থাকার তথ্যই বা কীভাবে এল? এসব প্রশ্নই এখন তদন্তের কেন্দ্রবিন্দু।
সাধারণ নাগরিকদের জন্য সিটি কর্পোরেশনের সেবা গ্রহণ এখন এক বিভীষিকা। অভিযোগ আছে, প্রতিটি ফাইল প্রসেসের জন্য ঘুষ না দিলে কোনো কাজ হয় না। হয়রানির শিকার হচ্ছেন ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিকরাও।
অভিযোগপত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, সিইও তৌহিদুল ইসলামের দপ্তর যেন এক ‘টাকা ছাপার কল’। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সৃষ্টি করে, ফাইল আটকে রেখে, বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের হাত করে তিনি বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করছেন। টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, সরকারি প্রকল্পের নামে অর্থ বাণিজ্য, অবৈধ নিয়োগ এবং আত্মীয়স্বজনকে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার মতো অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তৌহিদুল ইসলামের বৈধ আয়ের সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও, তার স্ত্রী ও আত্মীয়স্বজনের নামে যে বিপুল সম্পদ পাওয়া গেছে, তা বিস্ময়কর। তার স্ত্রীর নামে রয়েছে, ২টি বার্জ, ৩টি ট্রলার, ১টি কার্গো জাহাজ, ৫ কাঠার জমি (৩৫৯৮.৫৬ বর্গফুট) অনন্যা আবাসিক এলাকায় এবং নগরীর ডবলমুরিং থানায় ১০ শতক জায়গা, যেখানে এখন দাঁড়িয়ে আছে ১০ তলা ভবন।
তার নিজের নামে রয়েছে, ১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা মূল্যের ‘ফজুন ভিস্তা’ অ্যাপার্টমেন্টের ২৩৫০ বর্গফুট ফ্ল্যাট, একাধিক বিলাসবহুল গাড়ি (জিপ, প্রাইভেট কার, টয়োটা প্রিমিও) এবং গ্রামের বাড়িতে ভাইয়ের নামে ২০ বিঘা জমি (মূল্য প্রায় ১২ কোটি টাকা)।
এত সম্পদ কীভাবে এলো? এসব কি শুধুই কাকতালীয়, নাকি আমলাতান্ত্রিক ক্ষমতার অপব্যবহারের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ? এই ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুদক ইতোমধ্যেই মাঠে নেমেছে। দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় চট্টগ্রাম-১-কে দ্রুত তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে তদন্ত কর্মকর্তাও।
কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায় বাংলাদেশে এমন বহু দুর্নীতির তদন্ত হয়েছে, অনেক মামলাও হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে কতজনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? তৌহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে কি আদৌ কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, নাকি আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যাবেন আরও অনেকের মতো?
অভিযোগের ব্যাপারে জানতে শেখ মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামের মুঠোফোনে কল দেওয়া হলে মোবাইল সংযোগ পাওয়া যায়নি।
চট্টগ্রামবাসীর প্রত্যাশা স্বচ্ছ প্রশাসন ও ন্যায়বিচার। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নগর উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি। এখানে যদি আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি এই মাত্রায় বিস্তৃত হয়, তবে চট্টগ্রামবাসীর ভাগ্যে দুর্নীতিই বরাদ্দ থাকবে। তারা চান দুদকের নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত এবং দুর্নীতিবাজদের উপযুক্ত শাস্তি।
শুধু একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই হবে না, সিটি কর্পোরেশনের পুরো ব্যবস্থাপনাকে ঢেলে সাজাতে হবে। নইলে, আজ শেখ মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম, কাল অন্য কেউ এই দুর্নীতির চক্র কখনোই থামবে না।
উল্লেখ্য—চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) শেখ মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামের অপসারণের দাবিতে করপোরেশনের প্রধান ফটকে তালা দিয়ে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। পরে প্রায় ৪ ঘণ্টা পর মেয়রের আশ্বাসে তারা ফটকের গেট খুলে দেন।
গত ৩০ অক্টোবর বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত নগরভবনের সামনে এ বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চসিক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দেন। পাশাপাশি তাকে অপসারণে সাতদিনের সময় বেঁধে দেন। পরে চসিকের এই কর্মকর্তাক অপসারণ করা হয়।
এসএস/ফোরকান