করোনা কালে ১ হাজার টাকার অক্সিমিটার কেনা হয় ৩ হাজার ৮০০ টাকায়, ৫০ টাকার মাস্ক কেনা হয় ৪৮৫ টাকায়, ২০০ টাকার বালিশ কেনা হয় ৬৫০ টাকায়, প্রতিটি মেডিকেল বেড কেনা হয় ১৫ হাজার ৮০০ টাকায়….?
করোনাকালে আইসোলেশন সেন্টারের টেন্ডার ছাড়া মেডিকেল সামগ্রী ক্রয় করে লাখ লাখ টাকার দুর্নীতিতে জড়িয়েছিলেন নিজেকে। দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তে সেটি প্রমাণিতও হয়। স্থানীয় সরকার বিভাগের পৃথক তদন্ত প্রতিবেদনেও উঠে আসে তার দুর্নীতির ফিরিস্তি। তবুও প্রেষণে এসে একই পদে ১২ বছর দায়িত্ব পালন করছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) সালমা খাতুন।
চাকরি বিধিমালায় উপ-সহকারী প্রকৌশলী ও সহকারী প্রকৌশলী পদে সরাসরি অথবা পদোন্নতির মাধ্যমে পদসমূহ পূর্ণ করার বিধান থাকলেও, ২০১২ সাল থেকে প্রেষণে নিযুক্ত হন সালমা খাতুন। এখন উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদে বিদ্যুৎ উপ-বিভাগে কর্মরত রয়েছেন তিনি। যদিও ৩ বছরের বেশি সময় প্রেষণে নিয়োজিত থাকার বিধান নেই। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও চসিক’র সহকারী প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) ও প্রকিউরমেন্ট অফিসার হিসেবে নিজের চেয়ার ধরে রেখেছেন সালমা খাতুন।
এমনকি ২০২১ সালে স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয় থেকে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতিও পেয়েছেন। সেই পদোন্নতির চিঠি চসিক’র জমা দেয়ার পর তৎকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শহিদুল আলম মতামত দেন, নিয়োগবিধি অনুযায়ী প্রেষণে সহকারী প্রকৌশলী নিয়োগের কথা বিধিমালায় নেই। বিধি অনুযায়ী সহকারী প্রকৌশলীর কোনো পদ না থাকার কারণে প্রেষণে নিয়োগপ্রাপ্ত সালমা খাতুনকে স্থানীয় সরকার বিভাগে ফেরত নেয়া যেতে পারে বলে অনুমোদন দেন মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শহিদুল আলম। ওই অনুমোদনটি দেয়া হয় ২০২২ সালের ৩রা ফেব্রুয়ারি। কিন্তু সালমা খাতুনকে নিজ মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠানোর নির্দেশনা থাকলেও তা কার্যকর হয়নি।
এই বিষয়ে চসিক’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তৌহিদুল ইসলাম বলেন, চসিক’র উপ-সহকারী প্রকৌশলী, সহকারী প্রকৌশলী ও নির্বাহী প্রকৌশলী পদে প্রেষণে আসার থাকার সুযোগ ও নিয়ম নেই। তারপরও আমরা বিষয়টি দেখছি এবং নজরে আছে। সালমা খাতুন অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করলেও অফিসিয়ালি বিভিন্ন নথিতে তিনি স্বাক্ষর করেন ‘নির্বাহী প্রকেীশলী’ হিসেবে। অতিরিক্ত দায়িত্ব তিনি কোথাও লেখেন না। যেটি আইনের ব্যত্যয় বলছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রাম সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী।
দুদকের সহকারী পরিচালক আবু সাইদের তদন্তে বলা হয়, টেন্ডার ছাড়াই আইসোলেশন সেন্টারের জন্য ১ কোটি ৩০ লাখ ১৩ হাজার ৯৯৭ টাকার মেডিকেল ও প্লাস্টিক সামগ্রী ক্রয়াদেশ দেয়ার নেপথ্য কুশীলব ছিলেন বিদ্যুৎ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ঝুলন কুমার দাশ, সহকারী প্রকৌশলী সালমা খাতুনসহ আরও ৫ জন।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের অজুহাতে জরুরি ভিত্তিতে আইসোলেশন সেন্টারের জন্য সরঞ্জামসহ রোগীর বেড ক্রয়ের জন্য পিপিআর ২০০৮ এর ৭৬ (১) ঞ ধারায় টেন্ডারবিহীন ক্রয়ের পেছনের কারিগরও সালমা খাতুনসহ চসিকের ৫ দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা। এই সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একক দরদাতা হিসেবে ২০২০ সালের ১০ই জুন মেসার্স এবি কর্পোরেশনকে মোট ৭১ লাখ ৭১ হাজার ৪০০ টাকার ক্রয়াদেশ দেয়া হয়। একইভাবে এন মোহাম্মদ প্লাস্টিক লিমিটেডকে প্লাস্টিক সামগ্রী সরবরাহের ৬ লাখ ১৪ হাজার ৫০০ টাকার কার্যাদেশ দেয়া হয়। কেএন ৯৫ মাস্ক এবং এন ৯৫ মাস্ক সরবরাহের কাজ দেয়া হয় আলিফ এড ও গ্রামার কিটস নামের দু’টি প্রতিষ্ঠানকে। আলিফ এড ব্যাংককে ২ লাখ ৬৪ হাজার এবং গ্রামার কিটসকে ১ লাখ ৮৪ হাজার টাকার ক্রয়াদেশ দেয়া হয়েছে। অভিযোগ তদন্ত করে দুর্নীতির প্রাথমিক সত্যতা পান দুদকের তদন্তকারী কর্মকর্তা।
দুদকের নথি অনুযায়ী ৩ হাজার ৮০০ টাকায় কেনা হয় ১ হাজার ৫০০ টাকার অক্সিমিটার। ৫০ টাকার প্রতিটি মাস্ক কেনা হয়েছে ৪৮৫ টাকা করে। ২০০ টাকার বালিশ কেনা হয় ৬৫০ টাকা করে। চারগুণ বেশি দামে কেনা হয় স্যালাইনের স্টান্ড। প্রতিটি মেডিকেল বেড কেনা হয়েছে ১৫ হাজার ৮০০ টাকা করে। ৩ হাজার ৪০০ টাকা করে কেনা হয় মেট্রেস। প্রতিটি আইটেম অস্বাভাবিক দামে ক্রয় করার বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে তদন্তকারী কর্মকর্তার অনুসন্ধানে। দুদক বিষয়টি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে চিঠি আকারে জানায়।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় তদন্ত করে সালমা খাতুনসহ জড়িত অন্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য চসিককে জানায়। কিন্তু চসিক অজ্ঞাত কারণে ২ বছরেও সালমা খাতুনের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এদিকে ২০২১ সালের ৭ই ডিসেম্বর বিদ্যুৎ উপ-বিভাগে বিধিমালা বহির্ভূত প্রেষণে প্রকৌশলী নিয়োজিত না করার জন্য মেয়র বরাবর চিঠি দেন একই বিভাগের ৫ প্রকৌশলী। তারা হলেন- সালাউদ্দিন ইউসুফ, রুপক চন্দ্র দাশ, সরওয়ার আলম খান, ফখরুল ইসলাম, সবুজ আচার্য।
চিঠিতে তারা উল্লেখ করেন, ১০ থেকে ১৫ বছর নিয়োজিত থাকার পরও তারা স্ব স্ব পদে স্থায়ী হতে পারেননি। এমনকি উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকলেও পদোন্নতিও পাননি। মামলার রিট পিটিশন নম্বর-৪২০৭ (২০১৪)। মামলার বাদী ছিলেন চসিক’র বিদ্যুৎ প্রকৌশলী সরওয়ার আলম খান। সরওয়ার আলম খান বলেন, অন্য বিভাগ থেকে প্রেষণে এনে পদে বসানো সেটি কর্তৃপক্ষের বিষয়। তবে আমাদের রিট পিটিশনের প্রেক্ষিতে এখনো পদোন্নতি পাইনি।
বিধিমালা বহির্ভূত প্রেষণে প্রকৌশলী নিয়োজিত না করার জন্য ২০২১ সালের ৮ই ডিসেম্বর চসিক’র বিদ্যুৎ উপ-বিভাগের ৫ কর্মকর্তা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে সচিব বরাবর চিঠি দেন। তারা হলেন- উপ-সহকারী প্রকৌশলী কামাল হোসেন সেলিম, এনামুল হক, বাবু সবুজ মানিক আচার্য, সালাউদ্দিন ইউসুফ মজুমদার, সরোয়ার আলম খান, রুপক চন্দ্র দাশ ও ফখরুল ইসলাম।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে সালমা খাতুনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ব্যস্ত আছেন বলে কল কেটে দেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চসিক’র মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, এই বিষয়ে খোঁজ নেয়া হবে। দুর্নীতিতে কেউ জড়িত হলে বা অনিয়ম থাকলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে।
সূত্র–এমজে/এসএস