চট্টগ্রাম পওর সার্কেল (বাপাউবো) চট্টগ্রাম অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পুর) খ ম জুলফিকার তারেকের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ পাহাড় সমান। প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারি অর্থ লোপাটের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। ‘অনাপত্তি প্রত্যয়ন’ ছাড়াই ঠিকাদারদের শত-শত কোটি টাকার বিল ছাড়ের মতো অনিয়ম করেছেন তিনি। বিভিন্ন গণমাধ্যমে এসব দুর্নীতি নিয়ে সংবাদ প্রকাশ হলেও বহাল তবিয়তে পানির এই জমিদার। তাঁর খুঁটির জোর আসলে কোথায়–সেই প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই।
পাউবো সূত্রে জানা গেছে, কোটি টাকার ওপরে কোনো প্রকল্পে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ‘অনাপত্তি প্রত্যয়নপত্র’ ছাড়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ‘চূড়ান্ত বিল’ দেওয়া যাবে না। তবে তিনি এ নিয়ম মানেননি। ‘বিশ্বাস বিল্ডার্স’ নামক এক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানসহ কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে মোটা অংকের কমিশন নিয়ে তিনি শত শত কোটি টাকার বিল প্রদান করেছেন।
পাউবো সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের টাকা মেরে এই প্রকৌশলী বিদেশে অর্থপাচার করে যাচ্ছেন। কৌশলে তিনি তার পরিবারকে অস্ট্রেলিয়ায় পাঠিয়ে দিয়েছেন, এখন তারা সেখানে বসবাস করছেন, সেখানে আছে এই প্রকৌশলীর বিলাসবহুল বাড়ি ও গাড়ি, আছে ব্যাংকে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা, এমন চাঞ্চল্যকর অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে।
সূত্র জানায়, পাউবোর চট্টগ্রাম অঞ্চলের চলমান বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এই প্রকৌশলী। আনোয়ারা, বাঁশখালী, পটিয়া, বোয়ালখালী, সীতাকুণ্ড, সন্দ্বীপ ও রাঙামাটির প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি মূল্যের প্রকল্পে কাজ চলছে। সেই প্রকল্পগুলো থেকে কমিশন বাণিজ্য করে তিনি মোটাতাজা হয়েছেন।
জানা গেছে, পাউবোর চট্টগ্রাম অঞ্চলের তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের কাজে নিম্নমানের পাথর ও সাগরের লবণাক্ত বালু ব্যবহার এবং বাঁধ নির্মাণে বালুমিশ্রিত মাটি ব্যবহারের অভিযোগ আছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা পিডি’র বিরুদ্ধে। নিম্মমানের কাজের কারণে বছর যেতে না যেতেই বাঁধ দেবে ভাঙন ধরেছে।
অভিযোগ রয়েছে, ‘বিশ্বাস বিল্ডার্স’ নামের একটি বিতর্কিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পিডি) খন্দকার জুলফিকার তারেকের সরাসরি আর্থিক যোগসূত্র রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানের অধীনে বর্তমানে সন্দ্বীপ বেড়িবাঁধ প্রকল্পসহ প্রায় ৫৬২ কোটি টাকার কাজ চলছে। এছাড়াও ৮১০ কোটি টাকার আরও দুটি প্রকল্পেও একই প্রতিষ্ঠানের কাজ রয়েছে।
এদিকে—পটিয়ায় চলছে ১১৫৮ কোটি টাকার প্রকল্প। শুরু থেকে নানা অভিযোগ রয়েছে এই প্রকল্প ঘিরে। সন্দ্বীপে চলছে ৫৬২ কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ। আনোয়ারা ও বাঁশখালীর ৮৭৫ কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার আগে মান নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় সূত্র বলছে, এসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পেছনে রয়েছে জুলফিকার তারেকের নিজস্ব যৌথ ঠিকাদারি ব্যবসা। যার মাধ্যমে তিনি সরকারি প্রকল্প থেকে কমিশন বাণিজ্য করে হয়েছেন আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ।
জানা গেছে, এই প্রকৌশলী গত ৬ বছরে তিনি চিকিৎসা, প্রশিক্ষণ ও সেমিনারের অজুহাতে সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও থাইল্যান্ডে একাধিকবার সফর করেছেন। সরকারি আদেশে বিদেশে গেলেও তিনি বারবার সময়সীমা অতিক্রম করে অতিরিক্ত ছুটি কাটিয়েছেন। সর্বশেষ থাইল্যান্ডে তিন দিনের কর্মশালার নামে ছুটি নিয়ে অতিরিক্ত ১০ দিন অবস্থান করেন বিদেশে। অভিযোগ রয়েছে, এসব সফরের বেশিরভাগ সময়ই তিনি কাটান অস্ট্রেলিয়ায় থাকা পরিবারের সঙ্গে।
খোজ নিয়ে জান গেছে, চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিভিন্ন প্রকল্পের শুরু থেকে কাজের অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছিল বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা। এমন অভিযোগে তারা মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা করেছে বার বার, তারপর প্রকল্পের পিডি খ ম জুলফিকার তারেকের বিরুদ্ধে এখনো কোনো ব্যবস্থা গ্রহন করেনি সরকার। দেখভালোর দায়িত্বে থাকা পাউবোর পিডি ও কর্মকর্তারা কালেভদ্রে প্রকল্প ঘুরে আসতেন। মিলেমিশে বাঁধ নির্মাণে হরিলুট করেছেন সরকারের কোটি কোটি টাকা।
২০২৩ সালে চট্টগ্রামের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (এসই) পদে যোগ দেয়ার পর থেকেই পছন্দের ঠিকাদার দিয়ে সন্দ্বীপ, আনোয়ারা, বাঁশখালী, সীতাকুন্ড ও রাঙামাটির ৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে ৫টি চলমান প্রকল্পের কাজ করেছেন। এর আগে ২৩-২৪ ও ২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার কাজ সমাপ্ত করেছেন তার সিণ্ডিকেট ঠিকাদার দিয়ে।
সম্প্রতি—বাঁশখালী, সন্দ্বীপ ও খাগড়াছড়ি জেলার প্রকল্পের অনিয়ম-দুর্নীতির তদন্ত করেছিল বাপাউবো। ঊচ্চ পর্যায়ের তিন সদস্যের তদন্ত টিম অনিয়ম ও নিম্নমানের কাজের প্রমাণ পেয়েছিল। প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ঠিকাদার কাজের মান নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে। টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনের চেয়ে অতিরিক্ত বিল প্রদান করা হয়েছে। নিম্নমানের তৈরি করা ব্লক বাতিল করা হয়েছে। তারপরও জুলফিকার অদৃশ্য ক্ষমতায় এখনো চেয়ার আঁকড়ে আছেন।
অনিয়ম-দুর্নীতি, কমিশন বানিজ্য ও অভিযোগের বিষয়ে জানতে পাউবো চট্টগ্রাম অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (এসই) জুলফিকার তারেকের মুঠোফোনে কল করা হলে তিনি কল রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপ ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য—তীর সংরক্ষণ ও উপকূলীয় বাঁধ নির্মাণ, ব্লক বসানো ও সংস্কারে কয়েক হাজার কোটি টাকা খরচ করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো)। তবে পানির টাকা বেশির ভাগই গিলে ফেলেছে চট্টগ্রাম অঞ্চলের কুমিররা। এসব বাঁধ সংস্কারে প্রতি বর্ষায় আবার কোটি কোটি টাকা খরচের আয়োজন করে বাপাউবো। যেখান থেকে সরকারের কোটি কোটি টাকা হরিলুট হয়।
এসএস/এমএফ