চট্টগ্রাম শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে চোর-পুলিশ খেলা!


৩০ নভেম্বর, ২০২৫ ১২:২১ : পূর্বাহ্ণ

দেশের সরকারি-বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজে শিক্ষা সংক্রান্ত কর্মসূচি বাস্তবায়ন, প্রকল্পের দরপত্র আহ্বান, ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন, নতুন ভবন নির্মাণ, বিদ্যমান ভবনের সম্প্রসারণ ও রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত, সংস্কার এবং আসবাবপত্র সরবরাহ করে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর (ইইডি)। এছাড়া মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম ও আইসিটি ল্যাব স্থাপন, ইন্টারনেট সংযোগ, আইসিটি সুবিধা দেওয়ার কাজও করে থাকে অধিদপ্তরটি। কিন্তু দপ্তরটি ঘিরে প্রকৌশলীদের অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ বহু পুরনো।

সারা দেশের মত চট্টগ্রাম শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরেও অনিয়ম-দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য চলছে দুর্দান্ত গতিতে। কোনোভাবেই বন্ধ হচ্ছে না এই দপ্তরের দুর্নীতি। আঁতাত করে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ দেওয়া, বিল ও জামানতের চেক পরিশোধের ক্ষেত্রে গুনে গুনে কমিশন বুঝে নেওয়া, নানা উপায়ে অতিরিক্ত ব্যয় প্রাক্কলন, দরপত্র প্রক্রিয়ায় ঘুষ, প্রকৌশলীদের অনৈতিক সুবিধা আদায়, মোটা অংকের কমিশন বাণিজ্যসহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে এই দপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে।

জানা যায়, এই দপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ কামরুল আহসান চট্টগ্রামে যোগদানের পর থেকেই দূর্নীতির দূর্গ গড়েছেন। তিনি দূর্নীতির দূর্গ সচল রাখতে তার ঊর্ধ্বতন স্যারদেরও ম্যানেজ করেন। আবার সরকারি নিয়মের তোয়াক্কাও করেন না তিনি। তার এসব অপকর্মের বিষয়ে গণমাধ্যমে মুখ খুললে কথায় কথায় হুঁশিয়ারিও দেন বলে জানান ইইডি সূত্র।

জানা গেছে, এই দপ্তরে বিভিন্ন স্তরে স্তরে সমঝোতার নামে নির্বাহী প্রকৌশলী, সহকারী প্রকৌশলী, উপ-সহকারী প্রকৌশলী ও উচ্চমান সহকারী ঠিকাদারদের থেকে আদায় করছেন অনৈতিক সুবিধা। গড়েছেন ‘ঠিকাদার-প্রকৌশলীর’ শক্তিশালী সিণ্ডিকেট। চট্টগ্রামজুড়ে কারিগরি স্কুল ও কলেজ (টিএসসি) স্থাপন ও মাদ্রাসা নির্মাণে হচ্ছে নিম্নমানের কাজ। মোটা অংকের ঘুষ নিয়ে ‘কামরুলচক্র’ করছেন রেট শিডিউল ফাঁস।

ইইডি সূত্র জানায়, কাজ শেষ হওয়ার আগেই অতিরিক্ত অগ্রিম বিল পরিশোধেরও অভিযোগ রয়েছে এই নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে। তার এসব অপকর্মের দুদকের তদন্ত চেয়েছে ভুক্তভোগী কয়েকজন ঠিকাদার। তারা বলেন, নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল আহসান একজন বড় মাপের দুর্নীতিবাজ ও ঘুষখোর। চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্কুল-মাদ্রাসা ভবন নির্মাণে ৫% থেকে ১০% ‘পারসেন্ট’ পর্যন্ত কমিশন নেন তিনি। যার কারণে ঠিকাদাররা সুযোগ নিয়ে নিম্নমানের কাজ করছেন। যা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত করলে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে বলে জানান ইইডি সংশ্লিষ্টরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুজন ঠিকাদার সকালের-সময়কে জানান, এই প্রকৌশলী একজন পুরো মাত্রায় স্বৈরাচারের দোসর। তিনি সেই দাপটে এই দপ্তরকে অনিয়ম-দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য বানিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, তার সিণ্ডিকেটের ঠিকাদাররাই কাজ পায় এখানে। এছাড়া তার চক্রের কয়েকজন ঠিকাদারকে কাজের অতিরিক্ত রানিং বিল প্রদান করে মোটা অংকের ঘুষ নিয়েছেন তিনি।

জানা গেছ, চট্টগ্রাম শিক্ষা প্রকৌশলে বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ঠিকাদার রয়েছে যাদের অনিয়ম-দুর্নীতি চরমে। সিণ্ডিকেটভুক্ত হওয়ায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন তেমন কাজ করে কামরুলের যোগসাজশে সরকারি টাকা আত্মসাৎ করছেন। এবং গত জুন মাসেও অতিরিক্ত বিল পরিশোধ করেছেন তিনি। এবং সিণ্ডিকেটভুক্ত ঠিকাদার ছাড়া অন্য ঠিকাদার এখানে কাজ পায় না।

ইইডির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সকালের-সময়কে বলেন, যেসব ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া যায় তাদেরকে আমরা কালো তালিভুক্ত করি, তাদের বিরুদ্ধে আমরা আ্যকশনে যায়, নির্বাহী প্রকৌশলীও আইনের ঊর্ধ্বে নন, তিনিও যদি অনিয়ম করেন তাহলে তার বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহন করব।

অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে, চলমান অর্থবছরে বেশ কয়েকটি প্রকল্প ও গত অর্থবছর চট্টগ্রামের ১৯টি প্রকল্পের দরপত্র আহ্বান করে চট্টগ্রাম শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর। যার মধ্যে ১০টিই পুরনো প্রকল্প। এই প্রকল্পগুলোর চলমান কাজে ঠাণ্ডা মাথায় প্রভাব খাটিয়ে মোটা অংকের কমিশন বাণিজ্য করে আসছেন প্রকৌশলী কামরুল।

অভিযোগ উঠেছে, প্রকল্পের দায়িত্বে থেকেই মধু খাচ্ছেন তিনি। কৌশলে অর্থ আত্মসাৎ করে হাতিয়ে নিচ্ছেন সরকারের লাখ লাখ টাকা। কাজ না করে টাকা উত্তােলনেরও অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। এত এত অভিযোগের পরও বহাল তবিয়তে রয়েছেন তিনি। একাধিক তথ্য মতে, ২০২৪- ২০২৫ অর্থ বছরের চট্টগ্রামজুড়ে প্রায় সবকটি স্কুল-মাদ্রাসা-ভবন নির্মাণে করেছেন লাখ লাখ টাকার দুর্নীতি। বিভিন্ন সময়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়ার আগেই মোটা অঙ্কের টাকা নিয়েছেন তিনি।

জানা যায়, ৫ আগস্টের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এই প্রকৌশলী ও তার সিণ্ডিকেট শিক্ষা প্রকৌশল থেকে হাতিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা। যার ভাগ পেয়েছেন এই দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও। মোটা অংকের কমিশন নিয়ে পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে অনেক প্রকল্পের পুনঃ দরপত্রের কথাও উল্লেখ করেনি। যার কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে অগণিত দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

এদিকে—কাজের মনিটরিংয়ের দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলীরা ঠিকাদারদের নানা প্রলোভনে লোভ সামলাতে না পেরে জড়িয়ে পড়ছেন নানা অনিয়ম-দুর্নীতিতে। যার নেতৃত্বে আছেন খোদ নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল আহসান, সাথে আছেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীও।

অনিয়ম-দুর্নীতি, ভবন নির্মাণে নিম্নমানের কাজ ও কমিশন বাণিজ্যের বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ কামরুল আহসানের হোয়াটসঅ্যাপে তিন দিন ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়ে জানতে চাইলে তিনি তার কোনো উত্তর দেননি।

উল্লেখ্য—চরম বিশৃঙ্খলা চলছে সরকারের গুরত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে। প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলীদের কারণে প্রকল্পে অস্বচ্ছতা, গাফিলতি, অযোগ্যতা, অদক্ষতা, ঘুষ বাণিজ্য, কমিশন বাণিজ্য, অনিয়ম, দুর্নীতিসহ নানা কারণে ইইডিতে এখন অস্থিরতা নেমে এসেছে। যা দেখার যেন কেউ নেই?

প্রিয় পাঠক—নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল আহসান ও চট্টগ্রাম শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের আরও দুর্নীতিবাজদের অনিয়ম-দুর্নীতির এক্সক্লুসিভ খবর আগামী পর্বে দেখুন…।

এসএস/এমএফ

0Shares

আরো সংবাদ