সরকারী বিভিন্ন দফতরের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা অঢেল সম্পদের মালিক বনে গেলে ফ্ল্যাট ও প্লট মালিক হন। কিন্তু সাগরে জাহাজ ভাসান এমন নজির খুব কমই রয়েছে। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম চট্টগ্রাম পতেঙ্গা সার্কেলের কানুনগো মোহাম্মদ দিদারুল আলম চৌধুরী। তিনি বিদেশে টাকা পাচার, প্লট ও ফ্ল্যাট ও জমির পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরে ভাসিয়ে যাচ্ছেন জাহাজ। শুধু তাই নয়, পতেঙ্গা সার্কেলের কানুনগো পদে কর্মরত দিদারুলের কাছে ভূমি অফিস যেন টাকার খনি।
যখন যেখানে পদায়ন হয়েছেন টাকা কামিয়েছেন দুই হাতে। এর মধ্য দিয়ে নিজের এবং স্ত্রী-সন্তান ও আত্মীয়-স্বজনের নামে বিপুল সম্পদ গড়েছেন। এসব সম্পদের মূল্য শতকোটি টাকা ছাড়িয়েছে যাবে। নিজে ও স্ত্রী-সন্তানরা চলাফেরা করেন দামি গাড়িতে। তার পরিবার বসবাস করেন নগরীর বিলাসবহুল হিলভিউ আবাসিক এলাকার ফ্ল্যাটে। আর এসব সম্পদ তার আয়কর ফাইলেও দেখানো হয়নি। পুকুরচুরি করা হয়েছে ফাইলে।
সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের দুদকের প্রধান কার্যালয়ে ও দুদক চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ে অভিযোগ জমা পড়েছে। অভিযোগ পাওয়ায় দুর্নীতি দমন কমিশন অভিযোগের তদন্ত শুরু করেছে।
ভুমি অফিসের কর্মকর্তারা জানান, এর আগে কানুনগো দিদারুল আলমের বিরুদ্ধে তিন দফায় দুদকে অভিযোগ জমা পড়ে। প্রতিবারই মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে অভিযোগগুলো উধাও হয়ে যায়। ফলে তিনি আরও বেপরোয়াভাবে অনিয়ম দুর্নীতিতে জড়িয়েছেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, পতেঙ্গা সার্কেল ভূমি অফিসের কানুনগো মোহাম্মদ দিদারুল আলম একজন আপাদমক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। তিনি চট্টগ্রাম এলএ শাখা, বান্দরবান এলএ শাখা ও কক্সবাজার এলএ শাখায় ভূমি অধিগ্রহন নিয়ে অনিয়ম দুর্নীতি করে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। দুর্নীতির টাকায় কিনেছেন জাহাজ। সেই জাহাজ দিয়ে বঙ্গোপসাগরে করছেন ব্যবসা।
দুদকের অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, জাহাজটির নাম ‘ওটি চয়ন’ রেজিস্ট্রেশন নম্বর- এম-৬৮৮০, সার্ভে সনদ নম্বর ৩৪৬৩। জাহাজটির দৈর্ঘ্য ৪০ মিটার ও প্রস্থ ৭ দশমিক ৬২ মিটার। জাহাজটি দিয়ে চোরাই তেলের ব্যবসা পরিচালনা করা হয়। দিদারের অবৈধ টাকায় জাহাজ কেনার খবর সহকর্মিদের কাছে জানাজানি হওয়ার পর এখন এটি বিক্রি করে দেওয়ার তোরজোর শুরু করেছেন তিনি।
কানুনগো দিদারুল আলম ব্যবসায় কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন। তার আরও ২-৩ জন ব্যবসায়ীক অংশীদার রয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছে ওমর ফারুক ও হাজী নুরুল আলম কোম্পানি উল্লেখযোগ্য। তার দুই ছেলে বিদেশে পড়া লেখা করে। প্রতিমাসে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা বিদেশে পাঠাতে হয় তার। তার দুই স্ত্রী রয়েছে। দুই স্ত্রীকে দুই ফ্ল্যাট কিনে দিয়েছেন। হিলভিউ আবাসিক এলাকায় রয়েছে ১৯ টি প্লট।
নগরীর মুরাদপুর এন.মোহাম্মদ প্লাস্টিকের পাশে রয়েছে ৮ কাঠার প্লট। নগরীর হামজারবাগ এলাকায় রয়েছে বিশাল প্লট। এছাড়া সুন্নিয়া মাদ্রাসার পাশে রয়েছে ১০ কাঠার একটি জমি। তার নামে বেনামী রয়েছে শতকোটি টাকার সম্পত্তি। তার এক ছেলে যুক্তরাজ্যে পড়া লেখা করে। তার জন্য প্রতিমাসে চার লাখ টাকা বেশি পাঠাতে হয়। তার ছেলের কাছে টাকা পাঠানোর নামে বিপুল পরিমাণ টাকা বিদেশে পাচার করেছেন বলেও অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে।
ভূমি অফিসের একাধিক কর্মকর্তা জানান, কানুনগো দিদারুল আলম বান্দরবান দায়িত্বরত থাকাকালে তিনটি মেগা প্রকল্প পিবিআই’র প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ, কক্সবাজার পৌরসভার পানি পরিশোধনাগার প্রকল্প ও ইস্টার্ন রিফাইনারি’র সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং নির্মাণ প্রকল্পের জমি অধিগ্রহন হতে হাতিয়ে নিয়েছেন শত কোটি টাকা।
কানুনগো দিদারুল আলমের বিরুদ্ধে এর আগেও দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ জমা পড়লেও অদৃশ্য কারণে তা গায়েব হয়ে গেছে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের কানুনগো পদে কর্মরত থাকায় ভূমি পরিদর্শন, খাসজমি বরাদ্দে মতামত, তদন্তসহ নানাবিধ গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ও সিদ্ধান্ত দেওয়ার সময় মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তিনি সব কাজ সম্পন্ন করে থাকেন। প্রতিবেদন ও খাসজমি বরাদ্দে তিনি নেন লাখ লাখ টাকার ঘুষ। তার প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে কথা বললে তিনি নানাভাবে হেনস্থা করে থাকেন।
অবৈধভাবে বেশি টাকা কামাতে তিনি চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় কাটিয়েছেন চাকরি জীবনের অধিকাংশ সময়। অন্য কোথাও বদলি হলেও তিনি মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে পুনরায় চট্টগাম শহরে বদলি হয়ে আসেন।
জানা গেছে, দুদকের কার্যালয়ে লেনদেনের একটি দশ লাখ টাকার পে-অর্ডারের কপিও জমা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কানুনগো দিদারুল আলম চৌধুরীর লেনদেন সংক্রান্ত একাধিক লেজারও জমা দেওয়া হয়েছে।
অনিয়ম-দুর্নীতি ও অঢেল সম্পদের বিষয়ে জানতে মোহাম্মদ কানুনগো মোহাম্মদ দিদারুল আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন—আমার দুই ছেলে বিদেশে লেখাপড়া করে ঠিক, আমার বিরুদ্ধে কিছু লোক উঠে পড়ে লেগেছে। আপনি নিউজ করিয়েন না প্লিজ, আমার বিশাল ক্ষতি হয়ে যাবে।
এবিষয়ে দুদকে অভিযোগ দাখিলকারী আবদুল হামিদ জানান, আমি বিস্তারিত দুদকে জমা দিয়েছি। দুদকের অভিযোগে বিস্তারিত আছে, এখানে মুখে বলার কিছু নেই।
এই বিষয়ে জানার জন্য পতেঙ্গা সার্কেলের সহকারী কমিশনার ভূমি ফারিস্তা করিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল রিসিভ করেনি।
এসএস/এমএফ