কর্ণফুলীতে দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির প্রস্তাবিত সভাপতি আ.লীগ নেতা!


১০ ডিসেম্বর, ২০২৫ ৪:০২ : অপরাহ্ণ

কর্ণফুলী উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির প্রস্তাবিত নামের তালিকায় আওয়ামী নেতা ও বিতর্কিত ব্যক্তিদের নতুন কমিটিতে সদস্য করার জোর তদবির চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। নতুন কমিটির প্রস্তাবিত এই নামের তালিকা নিয়ে কর্ণফুলীতে চলছে বিতর্ক।

জানা গেছে, কর্ণফুলী উপজেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা ও শিপিং ব্যবসায়ী আজিজুর রহমান ওরফে সমতা শিপিংয়ের ‘আজিজকে’ চট্টগ্রাম কর্ণফুলী উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির নতুন সভাপতি করার প্রস্তাবনা দিয়েছে দুদক। এছাড়া সাধারণ সম্পাদকের জন্য বিকেএমইএ পরিচালক মো. ইয়াছিনকে প্রস্তাবনায় রাখা হয়েছে। নতুন এই কমিটি যাচাই-বাছাই করে ফাইনাল অনুমোদন দিবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

গত ৭ ডিসেম্বর দুদক চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয় থেকে পূর্ণাঙ্গ কমিটির তালিকা অনুমোদন করেন দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয়–২ (চট্টগ্রাম) এর উপপরিচালক রিয়াজ উদ্দিন। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নতুন কমিটি আগামী তিন বছরের জন্য দায়িত্ব পালন করবে বলে জানা যায়।

নবগঠিত ফাইনাল কমিটির প্রস্তাবিত সভাপতি এই আওয়ামী লীগ নেতা ছাড়াও সহ-সভাপতি পদে প্রফেসর মোহাম্মদ মহিউদ্দীন চৌধুরী ও অনজন মজুমদারকে প্রস্তাব রাখা হয়েছে, সাধারণ সম্পাদক রাখা হয়েছে মো. ইয়াছিনকে। সদস্য রাখা হয়েছে ফরিদা ইয়াসমিন (রুনু), শামসুন নাহার বেগম, মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন, মোহাম্মদ মিসবাহ উদ্দীন, অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ জোবাইর হোসেনকে।

জানা যায়, দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির নিয়মিত কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে গণসচেতনতা বৃদ্ধি, সেমিনার আয়োজন, কর্মশালা, মতবিনিময় সভা, মানববন্ধন, পথসভা, বক্তৃতা ও রচনা প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ দুর্নীতিবিরোধী বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে নতুন কমিটি।

এছাড়া ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে আগত মানুষের মধ্যে দুর্নীতি বিরোধী মূল্যবোধ ছড়িয়ে দিতে বিশেষ সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানোর পরিকল্পনাও থাকবে কমিটির দায়িত্বে। জানা গেছে, পূর্ববর্তী কমিটিতেও আওয়ামী লীগের আজিজুর রহমান সভাপতি এবং মো. ইয়াছিন সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এবারও আজিজুর রহমানকে সভাপতি ও ইয়াছিনকে সম্পাদক পদে রাখার জন্য প্রস্তাবে করেছে দুদক।

এই বিষয়ে কর্ণফুলী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সজিব কুমার রুদ্র সকালের-সময়কে বলেন, এই কমিটি এখনো ফাইনাল হয়নি, এটা যাচাই-বাছাই হবে, দুদক, পুলিশ ভ্যারিফিকেশন করবে তার পর অনুমোদন হবে। এটা প্রস্তাবিত তালিকায় তাদের নাম আসছে, অনুমোদন এখনো হয়নি।

স্থানীয়রা জানান, কর্ণফুলী উপজেলার আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী অর্থ যোগানদাতা হিসেবে পরিচিত আজিজুর রহমান এবং তার ভাই মনির এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এই স্বৈরাচারের দোসরকে এখনো গ্রেপ্তার করেনি। ৫ আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও শেখ হাসিনা ও তার মন্ত্রী-এমপি পালিয়ে গেলেও এই দোসর এখনো বুক ফুলিয়ে পুলিশের নাকের ডগায় প্রকাশ্য দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।

জানা যায়, ইনল্যান্ড ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব চিটাগাংয়ের (আইভোয়াক) সাধারণ সম্পাদক ও সমতা শিপিংয়ের মালিক এই আজিজুর রহমান। তার বাড়ি চরলক্ষ্যা ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডে, তার বাবার নাম মোহাম্মদ হোসাইন।

সূত্র জানায়, গোপনে আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, ড. হাছান মাহমুদ, সাবেক সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন, সাবেক সংসদ সদস্য এমএ লতিফ ও একরামুল করিমের জাহাজ দেখভালের দায়িত্বে আছেন এই আজিজ। প্রকৃত জাহাজ ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে রাখারও অভিযোগ আছে এই আজিজের বিরুদ্ধে।

হামিদুল ইসলাম নামের একজন তার ফেসবুকে লিখেন—প্রতাপশালী ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ এর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিল এই লোক আজিজ। জাবেদ বিদেশে হাজার খানেক বাড়ী এবং প্রপার্টি কিনেছে। আজীজ এলাকায় প্রচুর জায়গা দখল করেছে। আওয়ামীলীগের প্রভাব খাটিয়ে সে অনেককে বাড়ীঘর থেকে উচ্ছেদ করেছে। উচ্ছেদ করা না গেলে ক্রসফায়ারের নির্দেশনা দিত সে পুলিশকে।

তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগের আমলে কায়েম করে রেখেছিল ত্রাসের রাজত্ব। কী মনে হয়? ৫ আগস্টের পর রাজ্য হারিয়ে পালিয়ে গেছে সে? না। তার রাজত্ব আছে আগের মতই। জায়গায় জায়গায় বিভিন্ন দলের কিছু নেতাকে টাকা এবং ব্যবসা ভাগ দিয়ে সে এমনকি তার দখলকৃত জমিগুলো পর্যন্ত ধরে রেখেছে আগের মত করে। ২৪শের শহীদের রক্ত ঝরানো খুনীরা এখনো ঘুরে বেড়াচ্ছে বীরদর্পে। যেনো কোথাও কিছু ঘটেনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের এক ছাত্র জানান, ২৪ এর গণঅভ্যুত্থান ছিল আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসনের রাজনৈতিক দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ। রাষ্ট্রযন্ত্রের অপব্যবহার, দেশের সম্পদ লুন্ঠন, গুম, হত্যা, নির্যাতন, ভোটাধিকার হরণ ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে দেশের ছাত্র-জনতার সম্মিলিত প্রতিরোধে নতুন বাংলাদেশ পেয়েছি। কিন্তু সেই স্বৈরাচারের দোসররা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির মতো কমিটিতে প্রস্তাবিত নামের তালিকায় দেখে হতবাক হলাম।

এই বিষয়ে জানার জন্য আওয়ামী লীগ নেতা আজিজুর রহমানের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল রিসিভ করেনি।

এসএস/এমএফ

0Shares

আরো সংবাদ