ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বন্ধের মুখে ইস্টার্ন রিফাইনারি


নিজস্ব প্রতিবেদক ৪ এপ্রিল, ২০২৬ ১১:৩৯ : পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রামে রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসি চরম সংকটে পড়েছে। অপরিশোধিত জ্বালানি তেল বা ক্রুড অয়েলের অভাবে যেকোনো সময় বন্ধ হতে পারে এর কার্যক্রম। দিনে ৪ হাজার টন তেল শোধনের ক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে উৎপাদন ১ হাজার টনের নিচে নামানো হয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত শোধনাগারে মাত্র ১৫ হাজার টন তেল মজুত ছিল। এই সামান্য তেল দিয়ে বর্তমানের সীমিত গতিতে বড়জোর ৪ দিন কাজ চালানো সম্ভব। দ্রুত সরবরাহ না মিললে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পুরোপুরি থমকে যাবে এই শোধনাগারের চাকা।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে মার্চ মাসে দেশে কোনো ক্রুড অয়েল আসেনি। ২ লাখ টনের বেশি মজুত ক্ষমতার এই শোধনাগার এখন প্রায় তেলশূন্য। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে শেষ জাহাজটি এসেছিল। দেড় মাস পার হলেও নতুন কোনো জাহাজ বন্দরে ভেড়েনি। ওমেরা গ্যালাক্সি নামের ওই জাহাজে প্রায় ১ লাখ টন তেল এসেছিল। স্বাভাবিক উৎপাদনে এই তেল ২৫ দিনেই শেষ হওয়ার কথা। সরবরাহ না থাকায় প্রতিষ্ঠানটি এখন সক্ষমতার চার ভাগের এক ভাগ ব্যবহার করে টিকে আছে।

চট্টগ্রামের পতেঙ্গার শোধনাগার এলাকা এখন নিস্তব্ধ। স্বাভাবিক সময়ে কাটগড় ও বিমানবন্দর সড়ক তেলের লরি আর শ্রমিকদের ব্যস্ততায় মুখর থাকে। গতকাল সেখানে সুনসান নীরবতা দেখা গেছে। রিফাইনারির পাশেই পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানির অবস্থান। শোধনাগার থেকে পরিশোধিত তেল এসব প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করা হয়। উৎপাদন কমায় এসব এলাকায় যানবাহনের আনাগোনা নেই বললেই চলে। ব্যবস্থাপনা পরিচালক শরীফ হাসনাতকে ফোনে পাওয়া যায়নি।

তবে কর্মকর্তারা জানান, আগামী সপ্তাহের মধ্যে তেল না এলে কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হবে। ইস্টার্ন রিফাইনারির কাঠামো শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ক্রুড অয়েল পরিশোধনের উপযোগী। এতে সৌদি আরব বা আরব আমিরাত থেকে তেল না এলে বিকল্প উৎস ব্যবহারের সুযোগ নেই।

বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি) জানিয়েছে, ১ লাখ টন তেল নিয়ে ‘এমটি নর্ডিক পোলক্স’ জাহাজটি সৌদি আরবের জুয়াইমা বন্দরে আটকে আছে। হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার অনুমতি মেলেনি। ২০ মার্চ আরব আমিরাত থেকে রওনা দেওয়ার কথা থাকলেও অন্য জাহাজটি আসেনি। হরমুজ প্রণালি পার হয়ে বাংলাদেশে আসতে একটি জাহাজের ১৫ দিন সময় লাগে। ইরান থেকে ৬টি জাহাজ আসার খবর রটলেও বাস্তবে একটিরও অনুমতি মেলেনি।

বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক জানান, মার্চে একটি জাহাজও আনা সম্ভব হয়নি। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যোগাযোগ চলছে। আশা করছি ইরান দ্রুত সাড়া দেবে। ১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই শোধনাগার ১৯৬৮ সালে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে। গত ৫৬ বছরে প্রতিষ্ঠানটি এমন সংকটে পড়েনি। এর বার্ষিক পরিশোধন ক্ষমতা ১৫ লাখ টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরেও ১৬ লাখ টনের বেশি তেল শোধন করেছে এটি। এখান থেকে ডিজেল, পেট্রল, অকটেন ও বিটুমিনসহ ১৬ ধরনের জ্বালানি পণ্য উৎপাদিত হয়।

ক্রুড অয়েল কমলেও পরিশোধিত ডিজেল, এলপিজি ও এলএনজি আমদানি স্বাভাবিক রেখেছে বিপিসি। গত মার্চ মাসে ৩৫টি জ্বালানিবাহী জাহাজ বন্দরে এসেছে। মালয়েশিয়া থেকে ৩০ হাজার টন ডিজেল আনা হয়েছে। এপ্রিলে সিঙ্গাপুর থেকে আরও তেল আসার কথা রয়েছে। তবে দেশে তেল শোধনের খরচ আমদানি করা তেলের চেয়ে অনেক কম। শোধনাগার বন্ধ হলে সরকারের ব্যয় বহুগুণ বাড়বে।

বিপিসি সচিব শাহিনা সুলতানা বলেন, যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে। জাহাজ চলাচলেও বিঘ্ন ঘটছে। আমরা বিকল্প উৎস খুঁজছি। অন্য দেশ থেকে ক্রুড আমদানির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারণে হুট করে অন্য দেশের তেল ব্যবহারের সুযোগ কম। মধ্যপ্রাচ্যের অচলাবস্থা না কাটলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বড় ঝুঁকিতে পড়বে। সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতাই এখন ইস্টার্ন রিফাইনারি বাঁচানোর শেষ পথ।

এসএস/এমএফ

0Shares

আরো সংবাদ