চট্টগ্রামে ‘ম্যানেজ প্যাকেজে’ চলে ৩ শতাধিক অবৈধ ইটভাটা!


৭ জানুয়ারি, ২০২৬ ১০:০০ : পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রামের ১৫ উপজেলায় অনুমোদনপ্রাপ্ত ইটভাটা রয়েছে মাত্র ১২০টি। এর বাইরে অবৈধ ৩ শতাধিক ইটভাটা পরিবেশ ধ্বংস করে চলেছে। এসব ইটভাটার অধিকাংশ গড়ে উঠেছে পাহাড়, ফসলি জমি, লোকালয় কিংবা জনবসতিপূর্ণ এলাকায়। এমনকি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হালদা ও কর্ণফুলী নদীর পাড় ঘেঁষেও অনেক ইটভাটা রয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম জেলার ১৫টি উপজেলায় ইটভাটা আছে ৪১৩টি। এর মধ্যে ফিক্স চিমনি (৮৯–১২০ ফুট উঁচু) ইটভাটা আছে ২৭৩টি, জিগজ্যাগ চিমনি আছে ১১৬টি এবং পরিবেশ ফ্রেন্ডলি টেকনোলজির ইটভাটা আছে মাত্র ১১টি। ইটভাটা পরিচালনার জন্য ছাড়পত্র আছে ১২০টির। সংস্থাটির হিসেবে আরও ২৯৩টি ইটভাটা পরিচালিত হচ্ছে প্রশাসনকে মাসোহারা দিয়ে অনুমোদনহীনভাবে।

সূত্র আরো জানায়, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার ১২টি ইটভাটার মধ্যে সবগুলোর অনুমোদন আছে। তবে আনোয়ারায় দুটির মধ্যে একটি, পটিয়ায় দুটির মধ্যে একটি, সন্দ্বীপে ১১টির মধ্যে ৯টি, বাঁশখালীতে ১২টির মধ্যে ১০টি, বোয়ালখালীতে ৫টির মধ্যে ৪টি, মীরসরাইয়ের ১৫টির মধ্যে ৯টি, সীতাকুণ্ডে ৮টির মধ্যে ৬টি, চন্দনাইশে ৩২টির মধ্যে ২৫টি, লোহাগাড়ায় ৪৮টির মধ্যে ৪৫টি, ফটিকছড়িতে ৫৫টির মধ্যে ৪৩টি, সাতকানিয়ায় ৭০টির মধ্যে ৪৫টি, রাউজানে ৩৭টির মধ্যে ২৯টি, রাঙ্গুনিয়ায় ৬৯টির মধ্যে ৬৬টি ও হাটহাজারীতে ৩৫টির মধ্যে ২০টি ইটভাটা অবৈধ বলে জানা গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইটভাটার দুইজন মালিক জানায়, প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই চলছে অবৈধ ভাটার কার্যক্রম। অবৈধ এসব ইটভাটায় প্রকাশ্যে পোড়ানো হচ্ছে কাঠ। কয়লার দাম বাড়তি থাকায় স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে আমাদের চলতে হয়। মাঝে মধ্যে অভিযান চালায় শুধু লোক দেখানো। এসব অভিযান ওদের ভণ্ডামি। ৩ শতাধিক ইটভাটা থেকে বছরে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় সংঘবদ্ধ একটি চক্র।

সূত্র আরো জানায়, চট্টগ্রামের সবচেয়ে বেশি ইটভাটা রয়েছে রাঙ্গুনিয়ায়। এসব ইটভাটাগুলোর মধ্যে দক্ষিণ রাজানগর, রাজানগর, ইসলামপুর, হোসনাবাদের নিশ্চিন্তাপুর, সরফভাটা ইউনিয়নেই অধিকাংশ গড়ে উঠেছে। এছাড়া বেতাগী, পৌরসভা এবং কোদালা ইউনিয়নে রয়েছে বাকী ইটভাটাগুলো। পাহাড়ে কিংবা ফসলি জমি, কর্ণফুলী নদীর পাড়, শস্যভাণ্ডার গুমাইবিলেও গড়ে উঠেছে ইটভাটা। ইটভাটাগুলোতে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বনের কাঠ।

এদিকে গ্রামীণ সড়ক অবকাঠামো নির্মাণ ও পুনর্বাসন এবং সরকারি বিভিন্ন ভবন নির্মাণকাজে ভাটায় পোড়ানো ইটের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব ব্লক ইট ব্যবহারের নির্দেশনার যথাযথ বাস্তবায়ন হচ্ছে না। স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তর, গণপূর্ত বিভাগ, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ), সিটি করপোরেশনসহ সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ব্লক ব্যবহারের নির্দেশনা প্রতিপালনে গড়িমসি করছে।

অবৈধ ইটভাটা বন্ধ এবং সরকারি কাজে শতভাগ ব্লক ইট ব্যবহার-দুই ক্ষেত্রেই উচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। তবে সরকারি সংস্থাগুলো সেই নির্দেশনা বাস্তবায়নে উদ্যোগ নিচ্ছে না। এ অবস্থায় চট্টগ্রামে তিন শতাধিক অবৈধ ও অননুমোদিত ইটভাটায় পুড়ছে বনের কাঠ, পাহাড়ের মাটি। নষ্ট হচ্ছে কৃষি জমির টপ সয়েল।

জানা গেছে, পাঁচ বছর আগেই সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ গ্রামীণ সড়ক অবকাঠামো নির্মাণ, মেরামত ও পুনর্বাসন এবং সরকারি ভবন নির্মাণে পরিবেশবান্ধব ব্লক ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়। সে অনুযায়ী ধীরে ধীরে পরিবেশ বিধ্বংসী অবৈধ বা বৈধ ইটভাটা বন্ধ করে দেওয়ারও সিদ্ধান্ত ছিল। এ লক্ষ্যে সহজশর্তে ঋণ প্রদানসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হয়। সরকারি এই সুযোগ নিয়ে চট্টগ্রামসহ সারা দেশে ৮০০ ব্লক কারখানা গড়ে উঠেছে। যেখানে উৎপাদন হচ্ছে পরিবেশবান্ধব ইউনি ব্লক হলো ব্লকসহ নানা ধরনের ব্লক।

মূলত অবৈধ ইটভাটায় কাঠ পোড়ানোর মাধ্যমে বন উজাড় হচ্ছে। ইটভাটায় টপ সয়েল ব্যবহারের কারণে কৃষি জমির উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে। পাহাড়ের মাটি সাবাড় হয়ে যাচ্ছে। পরিবেশের এই ক্ষতি রোধে সড়ক অবকাঠামো নির্মাণে কংক্রিট বা ইউনি ব্লক ব্যবহার এবং ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে হলো ব্লক ব্যবহারে গুরুত্ব দিয়ে সরকার এ উদ্যোগ নিয়েছিল। সরকারি পর্যায়ে সড়ক ও ভবন নির্মাণে ব্লক ইট ব্যবহার ধাপে ধাপে শতভাগ নিশ্চিত করতে শুরু হয় প্রক্রিয়া।

এ জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে চিঠিও দেওয়া হয়। গ্রাম সড়ক পুনর্বাসন প্রকল্প’-এর ডিপিপিতে অন্তর্ভুক্ত ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের পরিবেশবান্ধব ইউনি ব্লক দ্বারা সড়ক পুনর্বাসনের প্রাক্কলন প্রণয়ন ও প্রেরণ’ সংক্রান্ত একটি চিঠিতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী মো. মতিয়ার রহমান স্বাক্ষর করেন। ২৩ মার্চ ২০২০ তারিখে ইস্যু করা এ সংক্রান্ত চিঠি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রধান কার্যালয় ছাড়াও চট্টগ্রামসহ সারা দেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সংস্থার দায়িত্বশীলদের কাছে পাঠানো হয়।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগে প্রকল্প পরিচালকের (পিডি) দায়িত্ব পালন শেষে সম্প্রতি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী হিসাবে যোগ দিয়েছেন আনিসুর রহমান। সরকারি কাজে ব্লক ইট ব্যবহার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ব্লক ইট এখন সহজলভ্য হয়েছে। শুরুতে সরকারি কাজে ৮-১০ ভাগ ব্লক ইট ব্যবহার হলেও এখন তা ২০-২৫ ভাগে উন্নীত হয়েছে। তবে তা শতভাগ নিশ্চিত হওয়া জরুরি। কারণ ব্লক ইটের ব্যবহারে কাজের গুণগত মান, সৌন্দর্য ও পরিবেশ সব কিছুই ঠিক থাকে। অবৈধ ভাটাগুলো বন্ধ হলে ব্লক ইটের ব্যবহার দ্রুতই বৃদ্ধি পাবে বলে জানান তিনি।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, রাঙ্গুনিয়া ও ফটিকছড়িতে বেশির ভাগ ইটভাটা পাহাড়ের পদদেশে। সাতকানিয়ার ইটভাটাগুলো গড়ে উঠেছে কৃষি জমিতে। চন্দনাইশেও পাহাড়ের পাদদেশে ইটভাটা রয়েছে। এসব ইটভাটায় পাহাড় কেটে মাটি কেটে ইট বানানো হয়। পাহাড়ের বন উজাড় করে ভাটায় পোড়ানো হয় কাঠ। সাতকানিয়ায় বেশির ভাগ ইটভাটা গড়ে উঠেছে কৃষি জমিতে। এসব ইটভাটায় কৃষি জমির টপ সয়েল কেটে ইট বানানো হয়।

এসএস/এমএফ

0Shares

আরো সংবাদ