স্বৈরাচারের দোসর থেকে পূর্ব রেলের জিএম কে এই সুবক্তগীন!


২ মার্চ, ২০২৫ ৪:৩৬ : অপরাহ্ণ

মো. সুবক্তগীন। রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) চলতি দায়িত্ব পেয়েছেন তিনি। চালচলনে আছে আভিজাত্য। প্রথম দেখায় যে কেউ ভাবতে পারেন মুখে দাড়ি, সহজ-সরল একজন স্বজ্জন ব্যক্তি। অথচ ঘুষ-দুর্নীতি-অনিয়ম, কমিশন বাণিজ্যে ও স্বেচ্ছাচারিতার নজির সৃষ্টি করেছেন তিনি। অধীনস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতিতে বাধ্য করারও অভিযোগ আছে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলওয়ের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

নানা অনিয়ম-দুর্নীতির পাশাপাশি এবার অভিযোগ উঠেছে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের ডিঙিয়ে বিতর্কিত এই কর্মকর্তাকে রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) পদে পদায়ন করা হয়েছে। এতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছেন যোগ্য ও দক্ষ হিসেবে দাবিদার কর্মকর্তারা। এনিয়ে ফ্যাসিবাদের এই দোসরকে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের জিএম করায় তার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। দুর্নীতিবাজ এই কর্মকর্তাকে সরানো না হলে আবারও যে কোনো মূহুর্তে আন্দোলন করার হুশিয়ারি দিয়েছেন তারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করে বলেন, এই কর্মকর্তা ফ্যাসিস্ট সরকারের একজন দোসর, স্বৈরাচার আমলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী ও দোহাজারী রেললাইন প্রকল্পের পরিচালক, থাকা অবস্থায় এবং রেলের গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে বিভিন্ন প্রকল্প থেকে কমিশন বাণিজ্যের মতো নানা কর্মকাণ্ডে সমালোচিত ও বিতর্কিত। তিনি রেল অঙ্গনের একজন শীর্ষ দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা। এমন কর্মকর্তাকে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের জিএম (চলতি দায়িত্ব) পদের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি পদে পদায়ন কেবল বিতর্ককেই উসকে দিয়েছে।

তারা আরও বলেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার প্রশাসনের সর্বস্তরে বৈষম্য নিরসন করে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। অনিয়ম-দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্তরে সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ে প্রশাসনে সংগঠিত অনিয়ম-দুর্নীতি নিরসনে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার পদক্ষেপ নিলেও তার প্রভাব পড়েনি রেলওয়ের প্রশাসনে। এমন অভিযোগ একাধিক ভুক্তভোগী কর্মকর্তার।

অভিযোগ উঠেছে, রেলওয়ের দ্বিতীয় গ্রেডের এই পদের জন্য যোগ্য, দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তা হিসেবে গ্রহণযোগ্য (১৮ ব্যাচের) চার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে বিতর্কিত এক কর্মকর্তাকে (২০ ব্যাচ) পদায়ন করা হয়েছে। এই কর্মকর্তাকে পদায়নের নেপথ্যে রয়েছে বিপুল পরিমাণ অর্থনৈতিক লেনদেন ও ভবিষ্যতে অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার অঙ্গীকার। এমন অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

ক্ষুব্ধ কর্মকর্তারা হলেন, ফরিদ আহমেদ (১৮ ব্যাচ), সলিমুল্লাহ বাহার (১৮ ব্যাচ), আহমেদ মাহবুব (১৮ ব্যাচ), মইনুল ইসলাম (১৮ ব্যাচ) এই চার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে মো. সুবক্তগীন (২০ ব্যাচের) পদায়ন করা হয়েছে। ওই চার কর্মকর্তা সবাই তৃতীয় গ্রেডের।

জানা যায়, সুবক্তগীনের বিরুদ্ধে বিগত স্বৈরাচার সরকারের আমলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী থাকা অবস্থায় বিভিন্ন ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ করার অভিযোগ আছে। এক প্রকল্পকে একাধিকবার নতুন প্রকল্প হিসেবে দেখিয়ে পছন্দের ঠিকাদারদের দিয়ে কাজ করিয়েছেন। বিশেষ করে এপিপির আওতায় এসব ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ হাতিয়ে নিয়েছিলেন তিনি।

আরও জানা যায়, ভুয়া প্রকল্পের কাজ করার জন্য নামে-বেনামে একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছেন সুবক্তগীন। এমনকি প্রকল্পের কাজ ইজিপিতে টেন্ডার দেখালেও ৬ এবং ৭ নম্বর রেটের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিয়ে অর্থ হাতিয়েছেন। এর মধ্যে প্রতিবছর কালুরঘাট সেতুসহ বিভিন্ন ব্রিজ-কালভার্ট মেরামত, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান ভবন সংস্কার, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ২৬টি স্টেশনের ভবনসহ নানা অবকাঠামো সংস্কার ও নির্মাণ, সিআরবি হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পের মত শত শত কোটি টাকার প্রকল্প বানিয়ে অর্থ হাতিয়েছেন তিনি। এভাবে লুট করেছেন রেলওয়ের শত-শত কোটি টাকা।

রেলওয়ে এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে চট্টগ্রাম ইস্ট জোনে। এর মধ্যে চট্টগ্রামে একটি বড় ওয়ার্কশপ, একটি ট্রেনিং একাডেমি, লোকোশেডসহ আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা আছে। এসব জিএম পূর্ব’কে দেখভালো করতে হয়। এই জোন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এবং এখানে জটিলতা বেশি থাকায় এবং দেশের বিরাজমান পরিস্থিতিতে বর্তমান বিতর্কিত জিএম অনিয়ম-দুর্নীতিতে আরও দুর্দান্ত গতিতে এগিয়ে যাবে বলে ধারনা এই কর্মকর্তার।

এ প্রসঙ্গে রেলওয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল রিসিভ করেনি।

জানা যায় গত ২৭ ডিসেম্বর (বৃহস্পতিবার) রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন শাখার উপসচিব উজ্জ্বল কুমার ঘোষ স্বাক্ষরিত পৃথক প্রজ্ঞাপনে রেলওয়েতে রদবদল করা হয়েছে।

প্রজ্ঞাপনে সাবেক রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী ও চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেললাইন প্রকল্পের পরিচালক মো. সুবক্তগীনকে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) পদে বদলি করা হয়। অন্যদিকে পূর্বাঞ্চলের আরেক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মোহাম্মদ নাজমুল ইসলামকে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) পদে বদলি করা হয়।

ভিন্ন এক প্রজ্ঞাপনে বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) মো. বেলাল হোসেন সরকারকে চট্টগ্রামের প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (চলতি দায়িত্ব) পদে বদলি করা হয়। এবং আরেক প্রজ্ঞাপনে রাজশাহীর বিভাগীয় চিকিৎসা কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) ডা. এসএম মারফুল আলমকে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) পদে বদলি করা হয়েছিল।

অনিয়ম-দুর্নীতির ও স্বৈরাচারের দোসরের বিষয়ে জানার জন্য রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের জিএম মো. সুবক্তগীনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল রিসিভ করেনি।

উল্লেখ্য—দুঃখজনক বাস্তবতা হচ্ছে, দুর্নীতির রাহুগ্রাস থেকে বাংলাদেশ এখনো মুক্ত হতে পারেনি। বাংলাদেশ এক সময় দুর্নীতির জন্য পর পর পাঁচবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। দুর্নীতির সেই কলঙ্কতিলক মোচন করতে আমরা সক্ষম হয়েছি এটা যেমন সত্য, একইভাবে সত্য যে, আমরা সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে দুর্নীতি নির্মূল করতে পারিনি। যার কারণে আমাদের আশানুরূপ উন্নতি হয়নি। দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করেছেন অন্তবর্তী সরকার এ ব্যাপারে তাদের রয়েছে জিরো টলারেন্স নীতি।

সকালের-সময় ডটকম

0Shares

আরো সংবাদ