বহুরূপী ফ্যাসিস্ট ‘সিএফ মোল্যায়’ অতিষ্ঠ চট্টগ্রাম বন অঞ্চল!


২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ ১২:৫২ : পূর্বাহ্ণ

বন বিভাগে রাম-রাজত্ব, অনিয়ম-দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, টাকা আত্মসাত, বদলি বাণিজ্যে, কাঠ পাচার থেকে শুরু করে করেন না এমন কোনো কাজ নেই চট্টগ্রাম বন সংরক্ষক (সিএফ) রেজাউল করিম। তিনি কখনো আওয়ামীলীগ, কখনো বিএনপি, আবার কখনো জামায়াত।

দেশের পটপরিবর্তনে অনিয়ম-দুর্নীতির মাত্রা সরকারি প্রায় দপ্তরে কমে আসলেও চট্টগ্রাম বন-বিভাগে তার বিন্দু পরিমাণ পরিবর্তন হয়নি। উল্টো বন-বিভাগের দেওয়াল থেকে চেয়ার টেবিল পর্যন্ত চলছে রমরমা হরিলুট, অনিয়ম-দুর্নীতি, আত্মসাৎ করা হচ্ছে বিভিন্ন প্রকল্পের সরকারের কোটি কোটি টাকা। মোল্যাসহ তার সংঘবদ্ধ চক্রে একপ্রকার অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে চট্টগ্রাম বন বিভাগ।

জানা যায়—চট্টগ্রাম অঞ্চলের এক মূর্তিমান আতঙ্কের নাম মোল্যা রেজাউল। তার বিরুদ্ধে পাওয়া গেছে নানা ধরনের দুর্নীতির দলিল। অভিযোগ রয়েছে, ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে বন অধিদপ্তর মোল্যা রেজাউল করিমের দুর্নীতি চিহ্নিত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে একের পর এক চিঠি দিলেও কোনও ব্যবস্থা নেয়নি পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়। ২০২৫ সালে (সম্প্রতি) দুদকে করা অভিযোগের সুরাহা করেনি দুদক কর্তৃপক্ষও।

জানা গেছে, সেই সময় সরকার সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে ভালো সম্পর্কের কারণে মোল্যা রেজাউলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরে ফ্যাসিস্ট মোল্লা এখন বিএনপি-জামায়াতের অনুসারী সেজেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

নানা অনিয়ম-দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমে বিগত সরকারের আমলে গড়েছেন সম্পদের পাহাড়। জুলাই বিপ্লবের পর ভোল পালটে বনে যান সংস্কারপন্থি। চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রতিটি বিভাগ ও চেক স্টেশন থেকে চাঁদাবাজি করতে তার অনুগত বন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দিয়ে গড়ে তুলেছেন ‘মোল্যা বাহিনী’। এই বাহিনীর অলিখিত ‘ক্যাশিয়ার’ ফরেস্টার আব্দুল হামিদ।

বন দপ্তর সূত্রে জানা যায়—শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর সুবিধাবাদী মোল্যা নিজেকে সংস্কারপন্থি দাবি করে বন অধিদপ্তরে আন্দোলনের হুমকি দেন। এই সুযোগে বাগিয়ে নেন চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষকের পদটিও। ২০০৩ সালে বন বিভাগে নিয়োগ পাওয়া মোল্যা রেজাউল করিম শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সেপ্টেম্বরে চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক (সিএফ) পদে পদায়ন পান।

জানা গেছে—মোল্যা রেজাউল করিমের অনিয়ম-দুর্নীতি খবর দীর্ঘদিন ধরে বন অধিদপ্তরে আলোচনার খোরাক যোগাচ্ছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি বন বিভাগকে দুর্নীতির মহামারীতে পরিণত করেছেন। গত সরকারের আমলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো আর অধস্তনদের চোখ রাঙানো ছিল তার নিয়মিত কাজ।

জানা যায়, সরকারি এই চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই অধস্তনদের কোণঠাসা করতে স্টিম রোলার চালকের আসনে ছিলেন তিনি। গত সরকারের বন উপমন্ত্রী হাবিবুন নাহারকে মা ডেকে গড়ে তুলেছেন অর্থ-সম্পদের পাহাড়। বিশ্বস্ত অধস্তনদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন বিশাল সম্রাজ্যে। চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক (সিএফ) মোল্যা রেজাউল করিম শুধু চট্টগ্রাম নয়, খোদ বন অধিদপ্তরের জন্যই এক মূর্তিমান আতঙ্কের নাম।

জানা যায়, পদ্মা সেতু নির্মাণের পর মোল্যা রেজাউল তার ব্যক্তিগত ফেসবুকে লিখেছিলেন, জেদি মেয়ে আমার শাসন করেছে প্রমত্তা পদ্মা বহমান, জান্নাত হতে চেয়ে দেখে পিতা, শেখ মুজিবুর রহমান। জুলাই বিপ্লবের পর তিনি ফেসবুকে লেখেন, সারাটি দিন কাটিয়ে দিলাম চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে। শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতি বিজড়িত এই চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে। তিনি শতকরা ৫% হারে বিভাগীয় বন কর্মকর্তাদের মাধ্যমে চাঁদা আদায় করেন বলেও অভিযোগ আছে।

আরও জানা যায়—বিগত দিনে চট্টগ্রাম ফরেস্ট অ্যাকাডেমির পরিচালকের পদে থেকে ৫ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের নামে নিজস্ব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিয়ে কোটি টাকার বেশি আত্মসাৎ করেছেন। এবং নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ফরেস্ট অ্যাকাডেমির ডরমেটরি ভেঙে নিজের জন্য বাসস্থান তৈরি করেছেন। এবং সৌন্দর্যবর্ধনের নামে অপ্রয়োজনীয় ঝুলন্ত ব্রিজ নির্মাণ করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

প্রতিবেদকের হাতে আসা নথি বলছে, বিগত ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত তৎকালীন বন অধিদফতরের প্রধান বন সংরক্ষক (সিসিএফ) মো. ইউনুছ আলী মোল্যা রেজাউল করিমের দুর্নীতি চিহ্নিত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে একের পর এক চিঠি দেন পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ে। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের দোসর হওয়ায় মোল্যা রেজাউলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। উল্টো তাকে ফেনী জেলা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা পদ থেকে পাল্পউড বাগান বিভাগ বন্দরবানে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা পদে প্রাইজ পোস্টিং দেয় পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়।

২০১৬ সালের ২৬ এপ্রিল তৎকালীন প্রধান বন সংরক্ষক মো. ইউনুছ আলী পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ করেন, মোল্যা রেজাউল ফেনীর বিভাগীয় বন কর্মকর্তা থাকা অবস্থায় ২০১০-২০১১ ও ২০১১-২০১২ আর্থিক সালে বাগান উত্তোলনে ২ কোটি ৩১ লাখ ২৯ হাজার ৬৮০ টাকা ব্যয় করেন। তবে বাগানটি ব্যর্থ হওয়ায় সরকারি বরাদ্দের ওই পরিমাণ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়। মোল্যা রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৩ ও ৭ মে ২০১৫ সালে দুইবার চিঠি দেওয়া করা হলেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কোনও ব্যবস্থা নেয়নি বলেও প্রধান বন সংরক্ষকের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

নথি পর্যালোচনা করে আরও জানা যায়, মোল্যা রেজাউল করিম ঢাকার মিরপুর জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের পরিচালকের দায়িত্ব পালনকালে ২০১৭-২০১৮ ও ২০১৮-২০১৯ আর্থিক সালে সিভিল অডিট অধিদফতর অডিটকালে ১২টি সাধারণ অডিট আপত্তি উত্থাপিত হয়।

জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান ও টিকাটুলি বলধা গার্ডেনের পরিচালক থাকাকালীন সময় তার বিরুদ্ধে সর্বমোট ২০ কোটি টাকা উন্নয়ন কাজের বরাদ্দের সীমাহীন দুর্নীতির অভিযোগ উঠে। গভীর নলকূপ স্থাপনে ৩০ লাখ টাকা খরচ হলেও দেখানো হয় সাড়ে ৭০ লাখের বেশি। পতিত পুকুর খননের নামে বিপুল অঙ্কের টাকা আত্মসাৎসহ ভুয়া প্যাড কাগজ এবং বিল ভাউচারের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।

এদিকে বন অধিদফতর সুত্রে জানা গেছে, বন অধিদফতরে কর্মরত ২০ জন ফরেস্টার ২০২৫ সালে (সম্প্রতি) মোল্যা রেজাউল করিমের দুর্নীতি তদন্ত এবং তার স্বৈরাচারী আচরণ থেকে মুক্তি পেতে দুর্নীতি দমন কমিশন, বন সচিব এবং প্রধান বন সংরক্ষকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন।

অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, চাকরি জীবনের শুরুতে রাঙ্গামাটি দক্ষিণ বন বিভাগের কাপ্তাই রেঞ্জ কর্মকর্তা পদে প্রশিক্ষণকালেই মোল্যা রেজাউল ঘুষ লেনদেনে জড়িয়ে পড়েন। কাপ্তাই রেঞ্জে সেগুন বাগান বিক্রি করে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেন। পরবর্তীতে তৎকালীন সহকারী বন সংরক্ষক শাহাবুদ্দিন মোল্যা রেজাউলের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেও বন বিধ্বংসী কার্যক্রম থামাতে পারেননি।

ফেনী ডিভিশনের দায়িত্বে থাকাকালীন তিনি বাগান সৃজন ও ইকোপার্ক প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎ করেন। তদন্তে প্রমাণ পেয়ে তৎকালীন প্রধান বন সংরক্ষক ইউনুছ আলী মোল্যা রেজাউলের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে বন মন্ত্রণালয়ে লিখিত প্রস্তাব পাঠান।

যদিও তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সহযোগিতায় প্রস্তাবের সেই ফাইল মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ধামাচাপা পড়ে যায় বলে অভিযোগ উঠেছে। মোল্যা রেজাউল বাগেরহাট ডিভিশনের দায়িত্বে (ডিএফও) থাকাকালীন তৎকালীন সরকারের আমলে পিরোজপুরে ইকোপার্ক নির্মাণ প্রকল্পের বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুদকের পরিচালক (জনসংযোগ) আকতার উল ইসলাম বলেন, কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেলে তা স্বাভাবিক নিয়মেই তদন্ত হবে। এখানে ব্যত্যয় ঘটার কোনও সুযোগ নাই। বন অধিদফতরের কর্মকর্তা মোল্ল্যা রেজাউলের বিরুদ্ধে আনীত অফিযোগও তদন্ত হবে, এবং তদন্ত শেষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ ব্যাপারে সাবেক এক প্রধান বন সংরক্ষক (সিসিএফ) জানান, মোল্যা রেজাউলের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগগুলো তদন্ত হয়েছিল। তদন্তে দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেয়ে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে বন মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়। তবে সেই প্রস্তাব আর আলোর মুখ দেখেনি।

এ প্রসঙ্গে প্রধান বন সংরক্ষক আমীর হোসাইন চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। আমি বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।

এ বিষয়ে অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া দুদক সমন্বিত চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়–১ এর সহকারী পরিচালক সাঈদ মাহমুদ ইমরান সাংবাদিকদের বলেন, প্রধান বন সংরক্ষকের বিরুদ্ধে আমাদের কাছে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধান চলছে। তাকে দীর্ঘ তিন ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বলে জানান দুদক।

অনিয়ম-দুর্নীতির ও প্রকল্পের টাকা আত্মসাতের বিষয়ে জানার জন্য মোল্যা রেজাউলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল রিসিভ করে মিটিংয়ে আছি বলে লাইন কেটে দেন, পরদিন হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

প্রিয় পাঠক, চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক (সিএফ) রেজাউল করিমসহ তার সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের আরও এক্সক্লুসিভ খবর দ্বিতীয় পর্বে আসছে..সঙ্গে থাকুন—ধন্যবাদ।

সকালের-সময় ডটকম

0Shares

আরো সংবাদ