বেপরোয়া মোস্তাফিজ-আমীরের এত্ত পাওয়ার–লাগাম টানবে কে?


১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ ২:৪৮ : অপরাহ্ণ

রেলওয়েতে চাহিদা না থাকা সত্ত্বেও সীমিত দরপত্র পদ্ধতিতে বাজারমূল্য থেকে বেশি দামে একের পর এক যন্ত্রপাতি কেনা, সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ঠিকাদারের মাধ্যমে যন্ত্রপাতি মেরামত করে কোটি কোটি টাকা লোপাট করছেন রেলওয়ের পাহাড়তলী কারখানার কর্মকর্তারা।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের পাহাড়তলী কারখানা এখন অনিয়ম-দুর্নীতির মহাব্যধিতে পরিণত হয়েছে। যন্ত্রাংশ কেনাকাটায় হচ্ছে ব্যাপক অনিয়ম। ৫-১০ শতাংশ কমিশন আদায়ের জন্য যন্ত্রাংশ সরবরাহের কাজ দেওয়া হচ্ছে পছন্দের ঠিকাদারদের। কেবল তাই নয়, যন্ত্রাংশ পরীক্ষায়ও ঠিকাদারদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে ২ শতাংশ কমিশন। এতে নিুমানের যন্ত্রাংশ সরবরাহ করতে বাধ্য হচ্ছে ঠিকাদাররা।

আর এসব কাজের নেতৃত্ব দিচ্ছেন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়ক কারখানা (ডিএস) মোস্তাফিজুর রহমান ভুঞা ও কর্ম ব্যবস্থাপক (নির্মাণ) সৈয়দ আমির উদ্দীন।

অভিযোগ উঠেছে, এই দুই কর্মকর্তা এখন পাহাড়তলী কারখানা জিম্মি করে ফেলেছেন। সবকিছু নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে রামরাজত্ব কায়েম করেছেন। পূর্বাঞ্চলের একাধিক কর্মকর্তা ও বেশ কয়েকজন ঠিকাদার-সাপ্লাইয়ারদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে প্রায় ৪৫ হাজার সাপ্লাই আইটেম রয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী ঠিকাদারদের কাছ থেকে এসব যন্ত্রাংশ সরবরাহ করে কর্তৃপক্ষ। আর এ ধরনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে ৫০-৬০টি। অপরদিকে ঠিকাদারের সরবরাহ করা অধিকাংশ যন্ত্রাংশ পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে বুঝে নেয় পাহাড়তলী কারাখানা কর্তৃপক্ষ। যার কারণে প্রতি অর্থবছরে বাজারমূল্যের চেয়ে অস্বাভাবিক উচ্চদরে মালামাল কেনায় রেলওয়ের ক্ষতি করা হয় কয়েক কোটি টাকা।

অডিট প্রতিবেদনেও পাহাড়তলী কারখানার কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে। বিশেষকরে প্রধান যন্ত্র প্রকৌশলী (পূর্ব), বিভাগীয় যন্ত্র প্রকৌশলী (লোকো-পাহাড়তলী), সহকারী যন্ত্র প্রকৌশলী (ক্যারেজ অ্যান্ড ওয়াগন)।

জানা যায়, নিরীক্ষায় বিল বই, দাপ্তরিক প্রাক্কলন, বিল চালান ও চুক্তিপত্র অনুযায়ী কেনা মালামালের দাম স্থানীয় বাজারদরের চেয়ে বেশি দেখিয়ে এই কর্মকর্তারা লুট করেন সরকারি অর্থ। রেলওয়ের জন্য বেশিরভাগ যেসব যন্ত্রপাতি কেনা হয় সেগুলো হলো- বিয়ারিং পুলার, স্ট্যান্ডার্ড পিভিসি বোর্ড, সিসি ক্যামেরা, সালফিউরিক অ্যাসিড, হাইড্রো মিথানল, ক্যাবল, সাদা টুইল কাপড়, গ্যাস ব্রেক সিলিন্ডার, গ্যাস ভ্যাকুয়ামসহ আরো অনেক আইটেম। যার কারণে এসব আইটেম কেনাকাটার ক্ষেত্রেই দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া যায়।

তথ্য সূত্র জানায়, নিয়ম অনুযায়ী যে কোনো যন্ত্রাংশ ঠিকাদারের কাছ থেকে সরবরাহ করতে গেলে পুরো চালান বুঝে নিয়ে মান যাচাইয়ের জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন ওয়ার্কস ম্যানেজার (নির্মাণ)। ম্যানেজারের নেতৃত্বে একটি কমিটির মাধ্যমে সরবরাহ করা যন্ত্রাংশ থেকে স্যাম্পল নিয়ে পরীক্ষা করা হয়। মান ভালো হলে সেই যন্ত্রাংশ বুঝে নেওয়া হয়, খারাপ হলে তা ফিরিয়ে দেওয়ার নিয়ম তাকলেও বর্তমানে এ নিয়ম পাল্টে গেছে।

ভুক্তভোগী ঠিকাদাররা জানান, পুরো কারখানা এখন ডিএস মোস্তাফিজ-ও কর্ম ব্যবস্থাপক আমীরের নিয়ন্ত্রণে। তাদের নির্দেশে ঠিকাদাররা এখন পুরো মাল বুঝিয়ে দিচ্ছেন না। পরীক্ষার জন্য উন্নতমানের স্যাম্পল দিয়ে ডেলিভারিতে দিচ্ছেন নিুমানের যন্ত্রাংশ। এক্ষেত্রে ওয়ার্কস ম্যানেজার (নির্মাণ) সৈয়দ মোহাম্মদ আমীর উদ্দিন প্রভাব বিস্তার করছেন করছেন বলেও জানান নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই ঠিকাদাররা।

তারা বলেন, পণ্যের স্থানীয় বাজারমূল্যের সঙ্গে সরবরাহকারী বা ঠিকাদারের মুনাফা, আয়কর ভ্যাট, পরিবহন খরচ যোগ করে যে মূল্য হয় এসব মালামালের দাপ্তরিক প্রাক্কলন প্রস্তুত করে কোটি কোটি টাকার চুক্তি সম্পাদন করেন এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা। এতে বাজারদরের চেয়ে উচ্চদরে দাপ্তরিক প্রাক্কলন প্রস্তুত করে মালামাল কেনায় সরকারের লাখ লাখ টাকা লুট করেন তারা।

জানা যায়, এসব কেনাকাটায় সাধারণ ভবিষ্য তহবিল বিধিমালা (জিএফআর), রেলওয়ে জেনারেল কোড, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালার (পিপিআর) তোয়াক্কা করেননা এই কর্মকর্তারা। কেনাকাটার ক্ষেত্রে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করার বিধান থাকলেও তা মানা হয়না। পাশাপাশি প্রাক্কলন ব্যয় প্রস্তুত করার সময় পরিবহন ব্যয়, মুনাফা, ঝুঁকি, জটিলতা অনগ্রসর, মূল্য সংযোজন কর যুক্ত করার নিয়ম থাকলেও তা না করেন না, অন্যদিকে কারখানায় লোকো, কোচ ও ওয়াগন মেরামতের ব্যয় দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা সরকারের ক্ষতি করেছেন তারা।

পাহাড়তলী কারখানা সুত্রে জানা যায়, এই কারখানায় যন্ত্রাংশ সরবরাহের জন্য একচেটিয়া কাজ পাচ্ছেন ভুঁইয়া এন্টারপ্রাইজের একরামুল করিম রাসেল, পিআর এন্টারপ্রাইজের প্রিন্স, করিম এন্টারপ্রাইজের আবদুল করিম, আজিজ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আজিজ, জননী এন্টারপ্রাইজের মজিবুর রহমান ও এসএকে প্রোডাক্টের সুজন দত্তসহ আরও অনেকে।

তারা সবাই, ডিএস মোস্তাফিজুর রহমান ভূঞার গ্রামের বাড়ী কুমিল্লা ও আশেপাশের জেলার বলে জানা গেছে। এ কারণে পাহাড়তলী কারখানার ৫০ শতাংশ কাজ এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে করানো হচ্ছে। এসব ঠিকাদারের সঙ্গে ডিএস মোস্তাফিজুর রহমানের কমিশনের চুক্তি রয়েছে তাদের। চুক্তি অনুযায়ী ২০ লাখ টাকার বেশি যে কোনো বিলে ৫ শতাংশ ও তার কম পরিমাণ বিলে ৭ শতাংশ কমিশন আদায় করেন কারখানার এই তত্ত্বাবধায়ক (ডিএস)।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ঠিকাদার বলেন, বর্তমান ডিএস যোগ দেওয়ার পর থেকে সব ক্ষেত্রেই স্বজনপ্রীতি করছেন। ঠিকাদারদের কাছ থেকে কমিশন আদায় করেই যন্ত্রাংশ পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফাইল অনুমোদন দিচ্ছেন তিনি।

আরও জানা যায়, নিরীক্ষাযোগ্য সময়ে লোকমোটিভগুলোর কোনো ইন বা আউট টার্ন না হলেও শিডিউলসংক্রান্ত মেরামত করতে লোকোমোটিভের বিপরীতে স্টোর থেকে মালামাল উত্তোলন করেন অভিযুক্ত কর্মকর্তারা। অডিট প্রতিষ্ঠান এই বিষয়ে প্রমাণও পেয়েছে, এতে কাল্পনিকভাবে লোকোর ইন টার্ন দেখানো হয়েছে। অডিট প্রতিষ্ঠান এ ব্যাপারে রেলওয়ের সচিবকে দফায় দফায় চিঠি দিলেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

তথ্যসূত্র জানায়, কারখানার কার্য সম্পাদনের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও চুক্তি করে ঠিকাদারের মাধ্যমে কাজ সম্পাদন করা হয়েছে বলে জানায় পাহাড়তলী কারখানার নতুন কোচ উৎপাদন, ওয়াগন তৈরি বা সংযোজন করার সক্ষমতা পাহাড়তলী কার্যালয়ের ওয়ার্কশপে রয়েছে। এ ছাড়া ক্যারেজ শপ, মেশিন শপ, পেইন্ট শপের সক্ষমতা থাকলেও যন্ত্রাংশ মেরামতের জন্য ঠিকাদারের শরণাপন্ন হয় পাহাড়তলীর কারখানা কর্তৃপক্ষ।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়ক (কারখানা) মোস্তাফিজুর রহমান ভূঞা ও কারখানার কর্ম ব্যবস্থাপক (নির্মাণ) দৈয়দ মোহাম্মদ আমীর উদ্দীনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে উভয়ে কল রিসিভ করেনি।

পছন্দের ঠিকাদার ছাড়া অন্য কাউকে কাজ না দেওয়া এবং কমিশন আদায় প্রসঙ্গে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সুবক্তগীনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনিও কল রিসিভ করেনি।

এসএস/এমএফ

0Shares

আরো সংবাদ