বৈষম্য বিরোধীর মোড়কে স্বৈরাচারী কর্মকাণ্ডে রাবিপ্রবি উপাচার্য!


৮ ডিসেম্বর, ২০২৫ ৩:১৬ : অপরাহ্ণ

রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবিপ্রবি) চলমান প্রশাসনিক অস্থিরতা, নিয়োগ-সংক্রান্ত অনিয়ম এবং জাতিগত বৈষম্যের অভিযোগকে কেন্দ্র করে শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ক্রমেই বাড়ছে। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. আতিয়ার রহমানের দায়িত্ব গ্রহণের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনে একাধিক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রম অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সারাদেশে ছাত্রজনতার আন্দোলনের প্রেক্ষিতে তৎকালীন সরকারের পতনের পর রাবিপ্রবির উপাচার্য প্রফেসর ড. সেলিনা আখতার ও প্রো–ভিসি প্রফেসর ড. কাঞ্চন চাকমা পদত্যাগ করেন। এরপর প্রায় দুই মাস বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক সব কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে।

এই পরিস্থিতি সাময়িকভাবে স্বাভাবিক করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ৯ অক্টোবর সহকারী অধ্যাপক ড. নিখিল চাকমাকে অস্থায়ী প্রশাসনিক দায়িত্ব দিলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া কার্যকর হয়নি। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় ৯ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে প্রফেসর ড. মো. আতিয়ার রহমানকে চার বছরের জন্য উপাচার্য নিয়োগ দেয়।

অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্ব গ্রহণের পর উপাচার্য শুরুতে শিক্ষার্থীবান্ধব ও দক্ষ প্রশাসক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করলেও পরে একক সিদ্ধান্ত ও স্বেচ্ছাচারীতার মাধ্যমে প্রশাসনের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে থাকেন।

শিক্ষক, কর্মকর্তা, বিভাগের ডিন, বিভাগীয় চেয়ারম্যান ও রেজিস্ট্রারের মতামত উপেক্ষা করা, ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতা এবং কর্মীদের সঙ্গে অপ্রিয় আচরণের অভিযোগও উঠে এসেছে। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক মনোভাব এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে বিভাজন তৈরির চেষ্টা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন একাধিক শিক্ষক ও কর্মকর্তা।

অর্থনৈতিক অনিয়ম নিয়েও তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ পাওয়া গেছে। আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণ ছাড়াই আন্তর্জাতিক বায়োসায়েন্স কনফারেন্স আয়োজনের নামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে বড় অংকের অর্থ সংগ্রহ করা এবং তার হিসাব প্রদান না করার অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ নীতিমালা উপেক্ষা করে অনভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের বড় অংকের স্বাক্ষরাধিকার দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

জানা যায়, উন্নয়ন প্রকল্পে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি অনুসরণ না করে পছন্দের ঠিকাদারদের কোটেশন ভিত্তিক কাজ দেওয়ায় আর্থিক অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে বলে দাবি করেন কয়েকজন কর্মকর্তা। প্রশাসনিক ভবনের ইন্টেরিয়র ডিজাইন, মনুমেন্ট নির্মাণ, গ্যারেজ নির্মাণসহ বিভিন্ন কাজে অতিরিক্ত ব্যয় এবং স্বচ্ছতার অভাবের অভিযোগও পাওয়া যায়। অভিযোগ রয়েছে, এসব কাজের বেশিরভাগ সিদ্ধান্ত প্রকল্প পরিচালককে উপেক্ষা করে সরাসরি উপাচার্যের নির্দেশে সম্পন্ন হয়।

নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়েও ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষক ও কর্মকর্তা নিয়োগে নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ, একাধিক পদে প্রতিদ্বন্দ্বী ছাড়া একক প্রার্থীকে সাক্ষাৎকারে উত্তীর্ণ করা, বয়সসীমা শিথিল করা, ফৌজদারি মামলার আসামিদের নিয়োগ দেওয়া, এবং পাহাড়ি ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার না দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ইউজিসির পর্যবেক্ষণ দলও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু সূত্র জানিয়েছে। বিভাগীয় শিক্ষকদের দাবি, অনেক যোগ্য প্রার্থী আবেদন করলেও উপাচার্যের পছন্দের প্রার্থী বাছাইয়ের জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে।

শাস্তিমূলক ব্যবস্থায়ও স্বেচ্ছাচারের অভিযোগ রয়েছে। তদন্ত ছাড়াই কর্মকর্তা বহিষ্কার, শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অযৌক্তিকভাবে বদলি আদেশ জারি করার অভিযোগ করেছেন অনেক শিক্ষক–কর্মকর্তা। পাহাড়ি কর্মকর্তা ও শিক্ষকদের গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া, পদোন্নতি বঞ্চিত করা এবং শোকজ নোটিশের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করার অভিযোগও পাওয়া যায়।

উপাচার্যের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী–শিক্ষকদের রাজনৈতিক কর্মসূচি নিষিদ্ধ থাকলেও নিজে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের গেস্ট হাউস রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের মিলনস্থলে পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে রিজেন্ট বোর্ড ও নিয়োগ বোর্ডে অংশ নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা লঙ্ঘনের অভিযোগও প্রফেসর আতিয়ার রহমানের বিরুদ্ধে রয়েছে।

নিয়ম অনুযায়ী রাঙ্গামাটিতে সার্বক্ষণিক অবস্থান করার কথা থাকলেও উপাচার্য নিয়মিত চট্টগ্রাম থেকে সরকারি গাড়িতে যাতায়াত করছেন, যা অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এসব অভিযোগের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে গভীর অসন্তোষ ও হতাশা দেখা দিয়েছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যেও ক্ষোভ বাড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক বিভিন্ন সূত্রের দাবি, পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বড় ধরনের আন্দোলন শুরু হতে পারে।

অনিয়ম-দুর্নীতি বিষয়ে জানার জন্য রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. আতিয়ার রহমানের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল রিসিভ করেনি।

এসএস/এমএফ

0Shares

আরো সংবাদ