বিপিসির বরপুত্র আজাদের জাল-জালিয়াতি, পদে পদে প্রতারণা!


১১ জানুয়ারি, ২০২৬ ৪:০৯ : অপরাহ্ণ

বয়স জালিয়াতি ও ভুয়া অভিজ্ঞতা সনদ দিয়ে চাকরি শুরু। একের পর এক অনিয়ম-দুর্নীতি। দ্রুতই বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক। ছিলেন ছাত্রলীগের প্রভাবশালী নেতা, সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বিপিসিতে একছত্র অধিপত্য, জাল-জালিয়াতি ও প্রতারণা করে হয়েছেন দুর্নীতির বরপুত্র। আছে ব্যাংকে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা, কিনেছেন জায়গা-জমি, ঢাকা ও চট্টগ্রামে আছে একাধিক ফ্ল্যাট-প্লট, দুদকেও আছে মামলা। এত্তো অভিযোগের পরও আছেন বহাল তবিয়তে, বিপিসির গুরুত্বপূর্ণ পদ আঁকড়ে আছেন বহুদিন ধরে।

জানা গেছে, বয়স চুরি ও ভুয়া সনদ দাখিল করে চাকরি নেওয়ার অভিযোগের ঘটনায় বিপিসির এই মহাব্যবস্থাপক (অর্থ) মোরশেদ হোসাইন আজাদের বিরুদ্ধে গত বছর ২৩ অক্টোবর জালিয়াতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন ও দুর্নীতির অভিযোগে হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক ছাত্র সংগঠন ‘স্টুডেন্টস ফর সোভারেনটি’-এর আহ্বায়ক মুহম্মদ জিয়াউল হক।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত ১২ নভেম্বর হাইকোর্টের বিচারপতি জেবিএম হাসান ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) মোরশেদ হোসাইন আজাদের বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশনা দেন। তদন্তকারী কর্মকর্তাকে ১৪ জানুয়ারির মধ্যে (তদন্ত প্রতিবেদন) দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

বিচারপতি জেবিএম হাসান ও বিচারপতি আজিজ আহমেদ ভুঁইয়ার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ নির্দেশ দেন। বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) রিটকারীর আইনজীবী মোহাম্মদ হাবিব বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মহাব্যবস্থাপক (অর্থ) মোরশেদ হোসাইন আজাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা রিটের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। মোরশেদ হোসাইন আজাদের বিরুদ্ধে দুদকের ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি)র তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের কথা ছিল। কিন্তু ( ৮ জানুয়ারি) আজ দাখিল না করায় হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ আগামী ১৪ জানুয়ারির মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন।

রিট আবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০০৯ সালের ১৩ মার্চ বিপিসির উপ-ব্যবস্থাপক (বিপণন) পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের সময় মোরশেদ হোসাইন আজাদের বয়স ছিল ৩৬ বছর ৪ মাস ২১ দিন, অথচ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী সর্বোচ্চ বয়সসীমা ছিল অনূর্ধ্ব ৩৩ বছর। এছাড়া চাকরিতে আবেদনের সময় অভিজ্ঞতা দেখাতে ‘গ্লোয়ার ট্রেডিং’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ভুয়া অভিজ্ঞতা সনদ দাখিল করা হয়, যা পরবর্তীতে অডিটে ধরা পড়ে। অডিট আপত্তি উত্থাপিত হলেও এ বিষয়ে কোনো কার্যকর তদন্ত হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়।

রিটে আরও বলা হয়, ছাত্রলীগের প্রভাবশালী নেতা হিসেবে মোরশেদ হোসাইন আজাদ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করেন এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ২০২১ সালের ৫ ডিসেম্বর যমুনা অয়েল কোম্পানির মোংলা ইন্সটলেশনের তৎকালীন ব্যবস্থাপক (পরিচালন) এ কে এম জাহিদ তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিস্তারিত অভিযোগ দুদকে দাখিল করলেও তা যথাযথভাবে তদন্ত করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

রিট আবেদনে রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে মোরশেদ হোসাইন আজাদকে চাকরিচ্যুত করা, তার বিরুদ্ধে প্রতারণা ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়, গত অর্থবছরে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মাধ্যমে তেল আমদানির সময় ডলার মূল্যের কারসাজিতে ৩৫৬ কোটি ৩ লাখ টাকা হেরফেরের অভিযোগের তদন্ত এখনও শুরু হয়নি। এই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহে বিপিসির মহাব্যবস্থাপক (অর্থ) মোরশেদ হোসাইন আজাদের বিষয়টি বিভিন্ন মাধ্যমে উঠে আসে।

বিপিসির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, দায়িত্বভার গ্রহণের পর আজাদের স্বেচ্ছাচারী ও একগুঁয়েমি সিদ্ধান্তে প্রতিষ্ঠান নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ। আর ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তিনি। ফলে কর্মস্থলে ইচ্ছেমতো প্রভাব খাটিয়েছেন তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০০৩ সালে চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে ছিলেন মোরশেদ হোসাইন আজাদ। ২০০৯ সালে বিপিসির উপব্যবস্থাপক (বিপণন) পদে বিজ্ঞপ্তির বিপরীতে তিনি নিয়োগ পান। এই নিয়োগে তিনি জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, বিজ্ঞপ্তিতে সংশ্লিষ্ট কাজে আট বছরের অভিজ্ঞতাসহ বয়স চাওয়া হয় অনূর্ধ্ব ৩৩ বছর (৩১.০৩.২০০৯ পর্যন্ত)। কিন্তু মোরশেদ হোসাইন আজাদ যখন নিয়োগ পান তখন তাঁর বয়স ছিল ৩৩ বছর ৪ মাস ২১ দিন। অভিজ্ঞতা হিসেবে গ্লোয়ার ট্রেডিং নামে একটি প্রতিষ্ঠানের সনদ দেওয়া হয়। পরে অডিটে বিষয়টি ভুয়া হিসেবে ধরা পড়ে এবং এ নিয়ে অডিট আপত্তি উত্থাপন করা হয়। কিন্তু প্রভাব খাটিয়ে এসব অভিযোগ গোড়াতেই থামিয়ে দেন আজাদ।

২০২১ সালের ৫ ডিসেম্বর বিপিসির বিপণন প্রতিষ্ঠান যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের মোংলা অয়েল ইন্সটলেশনের তখনকার ব্যবস্থাপক (পরিচালন) একেএম জাহিদ বিপিসির ডিজিএম মোরশেদ হোসাইন আজাদের বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে দুদকে একটি চিঠি দেন। দুদক নিজে তদন্ত না করে বিপিসির সচিবকে তদন্তভার দেয়। কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদন আর আলোর মুখ দেখেনি।

কিছু দিন আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জ্বালানি উপদেষ্টার কাছে মোরশেদ হোসাইন আজাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে আরও একটি অভিযোগ জমা পড়ে। এতে বলা হয়, বিপিসির আওতাধীন এসএওসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে থাকাকালীন আমদানিকৃত লুব বেইস অয়েলের কাঁচামাল বিপিসি নির্ধারিতের চেয়ে কমমূল্যে বিক্রি করে দিয়ে লাভবান হন তিনি।

লুব বেইস অয়েলের বিপিসি নির্ধারিত মূল্য লিটার ১১৭ টাকা ৮০ পয়সা হলেও তিনি তা বিক্রি করেন ১০৯ টাকায়। অর্থাৎ প্রতি লিটারে ৮ টাকা ৮০ পয়সা কম দামে তিনি এই জ্বালানি তেল বিক্রি করে দেন। এভাবে প্রায় দুই হাজার টন লুব অয়েল বিক্রির ফলে কোম্পানির ক্ষতি হয় প্রায় দুই কোটি টাকা।

এ ছাড়া প্রতি ড্রাম বিটুমিনের বাজারমূল্য সাত হাজার ৫০০ টাকা। কিন্তু ছয় হাজার ৮৬৩ ড্রাম বিটুমিন তিনি বিক্রি করেন এক হাজার ৮০০ টাকা দরে। দুই দফায় পানির দরে বিটুমিন বিক্রি করে দেওয়ায় কোম্পানির প্রায় অর্ধশত কোটি টাকার লোকসান হয়।

অনিয়ম-দুর্নীতি ও জাল-জালিয়াতির বিষয়ে জানার বিপিসির মহাব্যবস্থাপক (অর্থ) মোরশেদ হোসাইন আজাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল রিসিভ করেনি, এবং হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।

এসএস/ফোরকান

0Shares

আরো সংবাদ