বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারী। নানা চেষ্টা করেও তাদের লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। দীর্ঘদিন ধরে সংস্থাটির তালিকাভুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনিয়মে জড়িত থাকার তথ্য মিলছে। রাজনৈতিক পট-পরিবর্তন হওয়ার পর তারা নতুন কৌশলে অপকর্ম চালিয়ে আসছে।
আওয়ামী লীগ ‘ঘরানার লোক’ পরিচয় দিয়ে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ ওঠায় নড়েচড়ে বসে বিমান বাংলাদেশ। এ নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করার পর সত্যতাও মিলেছে। প্রতিবেদনটি সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তির কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।
তদন্তে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রাহকসেবা ও এয়ারপোর্ট সার্ভিসেস উইংয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ, চাঁদাবাজি, অনৈতিক সম্পর্ক, আর্থিক দুর্নীতি, অফিস শৃঙ্খলা ভঙ্গ, দায়িত্বে অবহেলা এবং সহকর্মীদের হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে বিমান কর্মকর্তা মো. ফিরোজ-উজ-জামানের সঙ্গে এক নারী কর্মকর্তার অবৈধ সম্পর্ক এবং ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে দাপ্তরিক কাজে অবহেলা ও নানা ধরনের অনৈতিক কাজে সম্পৃক্ততাও পাওয়া গেছে।
এ প্রসঙ্গে বিমানের উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে কোনো ধরনের দুর্নীতি বা অনিয়ম বরদাশত করা হচ্ছে না। প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ বিমানের অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও এক ধরনের সতর্কতা সৃষ্টি করা হয়েছে। জুনিয়র গ্রাউন্ড সার্ভিস অফিসার ফিরোজ-উজ-জামান ভয়ে চাকরি থেকে ইস্তফা দিতে আবেদন করলেও তা গ্রহণ করা হয়নি। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যে তার ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আমাদের আশ্বস্ত করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ফিরোজ-উজ-জামানের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটির কাছে লিখিত জবানবন্দি দিয়েছেন বিমানের কর্মকর্তা শামাউন সরকার, কাজী মতিউর রহমান, মশিউর রহমান, এয়াছার আরাফাত, মোহাম্মদ আনিসুর রহমান, ইসমাইল ভূঁইয়া, আমিনুল হক ভূঁইয়া, ওসমান গনি, মাহমুদা বেগম, ট্রাফিক হেলপার মো. মহিউদ্দিন, কাজী আজাদ, জাকির হোসেন, ইস্রাফিল হোসেন, সাজু সরকার, মো. শাহজাহান, মতিউর রহমান, শাহিনুর ইসলাম, সহকারী ব্যবস্থাপক এসএইচএম সোহরাওয়ার্দী, গ্রাউন্ড অ্যান্ড সার্ভিসের সহকারী ব্যবস্থাপক মো. মনিরুজ্জামান, জহিরুল ইসলাম, গ্রাউন্ড অ্যান্ড সার্ভিসের ব্যবস্থাপক শামীম হাসানসহ অনেকই।
বিমানসংশ্লিষ্টরা জানায়, অভিযুক্তরা দীর্ঘদিন ধরেই অপকর্ম চালানোর অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত কমিটি তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে নিশ্চিত হয়েছে, পোস্টিং-বাণিজ্য, আর্থিক লেনদেন এবং নিয়মিত দায়িত্বে অবহেলা করেছে। তারা শিফট চলাকালে সহকর্মীদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা তুলতেন, যার মধ্যে কেউ ৩০ লাখ, কেউ ১৭ লাখ, কেউ ১৪ লাখ, কেউ ১২ লাখ আর কেউ ১১ লাখ টাকা পর্যন্ত সংগ্রহ করেছেন।
এসব টাকা বিকাশ ও ব্যাংক লেনদেনের মাধ্যমে ব্যবহার হয়েছে। এ ছাড়া তাদের বিরুদ্ধে ডিউটি এড়িয়ে চলা, ইউনিফর্ম ছাড়া কর্মস্থলে উপস্থিত হওয়া, যাত্রীসেবা বিভাগে বিশৃঙ্খলা তৈরি করা, রোস্টার বাণিজ্যে সরাসরি জড়িত থাকা, সিনিয়র কর্মকর্তার নির্দেশ অমান্য, যাত্রীদের হয়রানি, লাগেজ ও টিকিট সুবিধার বিনিময়ে অর্থ গ্রহণসহ একাধিক অভিযোগ রয়েছে। তদন্তকালে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের লিখিত জবানবন্দি, সিসিটিভি ফুটেজ পর্যবেক্ষণ, রেকর্ড-পত্রাদি ও নথিসমূহ হতে প্রাপ্ত তথ্য নিম্নে উপস্থাপন করা হয়।
কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া তদন্ত প্রতিবদনে বলা হয়েছে, বিমান কর্মকর্তা ফিরোজ-উজ-জামান কর্তৃত্ব এবং প্রভাব খাটিয়ে ডিউটি রোস্টারে হস্তক্ষেপ করে এক নারী সহকর্মীকে নিয়মিতভাবে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেন, অফিস সময়ের মধ্যে বাইরে নিয়ে যান এবং তাকে অনৈতিক কাজে প্রলুব্ধ করেন। কয়েক মাস আগে তারা উত্তরায় একটি হোটেলে মেলামেশা করতে গিয়ে ওই নারী সহকর্মীর স্বামীর হাতে ধরা পড়েন এবং তাদের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটে।
পরে ফিরোজ-উজ-জামান ওই নারী সহকর্মীর স্বামীকে একাধিকবার প্রাণনাশের হুমকি দেন এবং তার স্ত্রীকে চাকরি হারানোর ভয় দেখিয়ে আলাদা বাসায় রাখতে বাধ্য করেন। ফিরোজ তার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে কর্মক্ষেত্রে নারী সহকর্মীদের প্রতি অনৈতিক আচরণ, জুনিয়র কলিগদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ক্ষমতার অপব্যবহার করে আসছেন, যা বিমানের শৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও আন্তর্জাতিকমানের পরিপন্থী এবং রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণœ করেছে। ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্ত ও ফিরোজের বিরুদ্ধে যথাযথ প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য একটি লিখিত অভিযোগ বিমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও কাছে পাঠানো হয়েছে।
তবে ফিরোজ অভিযোগগুলো সঠিক নয় বলে জবানবন্দি দেন তদন্ত কমিটির কাছে। তিনি বলেছেন, জুনিয়র কলিগ হিসেবে নারী সহকর্মী তার ব্যক্তিগত এবং অফিশিয়াল বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কথাবার্তা বলেছেন। তার বেশ কিছু সমস্যা সমাধান করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তাকে ঘায়েল করতে মিথ্যা তথ্য দেওয়া হচ্ছে।
বিষয়টি জানতে চাইলে বিমান বাংলাদেশের ব্যবস্থাপক ও সিইও মো. সাফিকুর রহমানের সঙ্গে কয়েক দফা টেলিফোন করলেও তিনি সাড়া দেননি। তবে সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, বিমানের কতিপয় কিছু কর্মকর্তা বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকা-ে জড়িত। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তারা বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। চাঁদাবাজি ও ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে অর্থ কামিয়েছেন। ‘আওয়ামী লীগ’ ঘরানার হুমকি দিয়ে অর্থ কামিয়েছেন। অভিযোগ আসার পর তদন্ত হয়েছে। তদন্তেও অভিযোগের সত্যতা মিলেছে।
তিনি আরও বলেন, অভিযুক্তরা সহকর্মীদের ওপর অন্যায় প্রভাব খাটিয়েছেন, হজ পোস্টিং ও ডিউটি রোস্টার নিয়ন্ত্রণে ঘুষ নিয়েছেন, নারী সহকর্মীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যমে অফিসের পরিবেশ অশান্ত করেছেন এবং নিজের নেতৃত্বে একটি আর্থিক চাঁদাবাজি চক্র পরিচালনা করেছেন যেখানে সহকর্মীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে নিয়মিত টাকা আদায় করা হতো।
তদন্তের আগে ফিরোজ-উজ-জামানের কাছে বিমানের মহাব্যবস্থাপক প্রশাসন ও মানবসম্পদ (উপসচিব) এবিএম রওশন কবীর স্বাক্ষরিত শোকজের চিঠি পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। তাছাড়া জান্নাতুল জেনান দুই মাসের ব্যবধানে ৩৭ দিন পর্যন্ত অফিসে অনুপস্থিত ছিলেন। বিমানের নিয়োগ প্রক্রিয়ায়ও একটি চক্র নানা কায়দায় দুর্নীতি করে আসছে। সার্বিক বিষয়ে আমরা কঠোর হতে বাধ্য হয়েছি।
সূত্র—ডিআর/এমএফ