চট্টগ্রাম বিআরটিএ’তে দুর্নীতিবাজ ফ্যাসিস্ট কর্মকর্তারা এখনো সক্রিয়!


২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ ১:৩৭ : অপরাহ্ণ

দুর্নীতির শীর্ষে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) বলে এক প্রতিবেদন উল্লেখ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। ঘুষ না দিলে এখানে কোনো কাজ হয় না। দালাল পরিবেষ্টিত এ অফিসে দীর্ঘদিন ধরে থাকা কিছু অসাধু কর্মকর্তা নিজেদের বিশ্বস্ত দলালচক্র তৈরি করেছেন, যাদের কারণে সেবাগ্রহীতারা জিম্মি হয়ে পড়েছেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামীলীগ সরকারের পতনের পর প্রায় প্রতিটি সরকারি-বেসরকারি অফিস আদালতে পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেলেও এখনো ঠিক পুরনো চিত্রই চোঁখে পড়ে চট্টগ্রাম বিআরটিএ’তে। এ যেন এক দুর্নীতির মহা আতুড়ঘর। প্রতিদিন দালাল চক্রে সরগরম থাকে এই দপ্তর।

এদিকে বিআরটিএ চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক ইঞ্জিনের দায়িত্বে আছেন আলোচিত-সমালোচিত সেই মো: মাসুদ আলম। গত ২৫-শে মার্চ তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০১৭ সালে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে অভিযোগ শুনে সাবেক সেতুমন্ত্রী মাসুদকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, ভালো হয়ে যাও মাসুদ, ভালো হয়ে যাও। তোমাকে আমি অনেক সময় দিয়েছি। তুমি ভালো হয়ে যাও। তুমি কি এখানে আবার পুরনো খেলা শুরু করেছো? তুমি কি কোনোদিনও ভালো হবে না? সেতুমন্ত্রীর এমন বক্তব্যর পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তখন থেকেই তুমুল আলোচনায় আসেন এই কর্মকর্তা। এই মাসুদ চট্টগ্রাম বিআরটিএতে যোগদানের পর দুর্নীতির গতি চলছে ওপেন সিক্রেট, যা দেখার কেউ নেই।

সরেজমিনে নগরীর নতুন পাড়া এলাকায় অবস্থিত মেট্রো সার্কেলে গিয়ে দেখা যায়, প্রকাশ্য দিবালোকে বিআরটিএ’র কমকর্তা-কর্মচারী, গাড়ির শোরুমের প্রতিনিধিসহ দালাল চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন কাজের বিনিময়ে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। কখনো কখনো সপ্তাহ পেরিয়ে মাস শেষ হওয়ার আগেই সেই টাকার অংক গিয়ে দাঁড়ায় কয়েক কোটিতে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা আর দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে চট্টগ্রাম বিআরটিএ। টাকা ছাড়া সেবা অনেকটা ভাগ্যের ব্যাপার। ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে মাঝে মধ্যে দালালদের দৌরাত্ম্য কিছুটা কমলেও কিছুদিন যেতে না যেতেই পুনরায় আগের অবস্থানে চলে আসে। দালাল ছাড়া বিআরটিএতে কাজ করাই দুঃসাধ্য।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, নতুন কেউ সেবার জন্যই গেলেই তাকে গিয়ে ধরছে কয়েকজন দালাল, তারা অল্প সময়ে কাজ করিয়ে দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে আদায় করে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। বিআরটিএ অফিসের আশেপাশের চায়ের দোকান ও ঝুপড়ি তাদের আস্তানা। ঐখানে সেবাগ্রহীতাদের ফুসলিয়ে নিয়ে গিয়ে এইকাজ করেন তারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গাড়ির মালিক জানান, তিনি দালাল দিয়েই কাজ করাচ্ছেন। কারণ, এখানে কোনো কর্মকর্তা তেমন সহযোগিতা করেন না। ঘুষ ছাড়া কাজ করা কখনো সম্ভব না। তার অভিজ্ঞতা হলো দালাল ধরলেই কাজটা আগে হবে। দালালদের সাথে কর্মকর্তাদের যোগসাজশ আছে, তাই দালালরা কর্মকর্তাদের নিয়মিত টাকা দিয়ে এসব কাজ করেন।

বিআরটিএ সূত্র জানায়, কোন কোন ক্ষেত্রে মোটা অংকের ঘুষের বিনিময়ে গাড়ির চেসিস ও ইঞ্জিন নম্বর না দেখেই গাড়ির রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন এখানকার কর্মকর্তারা। গাড়ির ওজন কমিয়েও রেজিস্ট্রেশন দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এই চক্র। এজন্য মালবাহী যানবাহনের পিকআপ, ফ্রিজার ভ্যান, ডেলিভারি ভ্যানগাড়ির ওজন কম দেখিয়ে রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে এসব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। এতে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে, লাভবান হচ্ছেন গাড়ির মালিক।

আরও জানা যায়, রেজিস্ট্রেশনে নয়ছয়, রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে আমদানি করা ট্রাক, মিনিট্রাক ও পিকআপ প্রতিবছর বিআরটিএতে রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হয়। আর্থিক সুবিধা নিয়ে গাড়িগুলো রেজিস্ট্রেশন দেন দায়িত্বশীল অসাধু কর্মকর্তারা। এসব গাড়ির আমদানির কাগজপত্র এবং গাড়ির মালিকের নাম-ঠিকানা, টিআইএন সনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র, মালিকের ছবি, গাড়ি রেজিস্ট্রেশনের টাকা জমার রসিদসহ কোনো কাগজপত্র চট্টগ্রাম বিআরটিএ অফিসে সংরক্ষিত নেই বলে জানিয়েছেন একাধিক সূত্র।

তারা জানায়, প্রতিটি যানবাহন থেকে এক লাখ থেকে দুই লাখ টাকা নিয়ে অবৈধভাবে রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া বদলি হওয়া কর্মকর্তাদের সাথেও যোগসাজশে হরদম চলছে দুর্নীতি। চট্টগ্রাম জেলা ও মেট্রো সার্কেলে কর্মরত কর্মকর্তারা অসংখ্য গাড়ি জালিয়াতি করে রেজিস্ট্রেশন দিয়েছেন। যা এখনো পর্যন্ত বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ জানে না। দুদক তদন্ত করলে থলের বিড়াল বেড়িয়ে আসবে বলে জানান তারা।

আর এদিকে বিআরটিএর চট্টগ্রাম সার্কেলের উপপরিচালক (ইঞ্জি:) সৈয়দ আইনুল হুদা চৌধুরীর বিরুদ্ধেও জাল-জালিয়াতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের, তার বিরুদ্ধে ঘুষের বিনিময়ে বিভিন্ন যানবাহন রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তিনিও কয়েক কোটি টাকার মালিক। আছে এফডিআর, স্ত্রী ও নিকট আত্মীয় নামে ব্যাংকে আছে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা। তার গ্রামের বাড়িতে কিনেছেন বিপুল জায়গা-জমি, কিনেছেন শহরে ফ্ল্যাট ।

চট্টগ্রাম জেলা সার্কেলের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) রায়হানা আক্তার উর্থী একাধারে সাত বছরের বেশি সময় খুঁটি গেড়ে বসেছেন চট্টগ্রাম বিআরটিএতে। তিনি মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে বদলি ঠেকিয়ে এই চেয়ার আঁকড়ে আছেন। তিনি তার গ্রামের বাড়িতে কিনেছেন জায়গা-জমি, নামে বেনামে বিভিন্ন একাউন্টে আছে মোটা অংকের টাকা, আছে ফ্ল্যাট-প্লট।

এদিকে চট্ট মেট্রো সার্কেল-২-এর সহকারী পরিচালক (ইঞ্জি:) ওমর ফারুকও গেড়ে বসেছেন অনেক বছর। তিনি আওয়ামিলীগ নেতা ড. হাসান মাহমুদের বিশ্বস্ত একজন কর্মকর্তা। তার বাড়ী রাঙ্গুনিয়ায়। তবে তিনিও অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে চট্টগ্রাম শহরের খুলশী ও কুমিল্লায় গড়েছেন আলিশান বাড়ী, রাঙ্গুনিয়ায় কিনেছেন জায়গা-জমি। আত্মীয় স্বজনের নামে ব্যাংকে আছে কয়েক কোটি টাকা।

ওমর ফারুকের একান্ত সহযোগী হিসেবে কাজ করেন মাইক্রো চালক ইমরান, তাকে দিয়ে মুলত ওমর ফারক নানা অপকর্ম করেন, তাদের সহযোগী হিসেবে আরও আছেন ইমরানের ছোট ভাই রাশেদ, সাবেক মুদি দোকানি সুন্দরী আকবর, রাশেদ, রাজু ডাব ব্যবসায়ী, চৌধুরী হাটের বাবু, কানা আকবর, মহসিন ও রবিউল হোসেন, আরমান, লালিয়ার হাটের খুরশেদসহ এরা বিআরটিএর ডন হিসেবে পরিচিত, তারাও এখন হাটহাজারী এলাকার কোটিপতি। দুদকের হাতে সম্প্রতি আটকও হয়েছেন ইমরানসহ বেশ কয়েকজন।

জানা যায়, ড্রাইভিং লাইসেন্স, যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন ও রুট পারমিটসহ সংশ্লিষ্ট কাজ করিয়ে দেয়ার নামে এ অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে যোগসাজশে চিহ্নিত দালাল সিন্ডিকেট বেশ তৎপর রয়েছে। বিনিময়ে গ্রাহক হয়রানি এবং নির্ধারিত ফি’র বাইরেও নেয়া হচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা। সিএনজি স্ক্রেপিংয়েও দালাল চক্রের মাধ্যমে কর্মকর্তারা শত শত কোটি টাকার বাণিজ্যে করে থাকেন।

বিশেষ করে স্পর্শকাতর চট্টগ্রাম বিআরটিএ কার্যালয়ে দুর্নীতি ও ঘুষ-বাণিজ্য এখন ‘ওপেন সিক্রেট’। দীর্ঘদিন ধরে এ অফিসটি অসাধু কর্মকর্তা আর দালালে ভরা। ড্রাইভিং লাইসেন্স, রেজিস্ট্রেশন নম্বর নবায়নহ যেকোনো কাজ করতে গেলেই তাদের খপ্পরে পড়তে হয়।

আর এদিকে প্রকৌশলী আতিকুর রহমান সহকারী পরিচালক (ইঞ্জি:), মো: আমীর খসরু ভূঁঞা সহকারী পরিচালক (সাধারণ), জেলার মোটরযান পরিদর্শক ইকবাল, মেট্রো সার্কেল-২ এর পলাশ খীসা মোটরযান পরিদর্শক, শাহাদাৎ হোসেন চৌধুরী মোটরযান পরিদর্শকরা দালালের যোগসাজশে মোটা অংকের বিনিময়ে অচল গাড়ির মালিককে ট্যাক্সটোকেন ও ফিটনেস সার্টিফিকেট ও গাড়ি রেজিষ্ট্রেশন করে দেন। এসব গাড়ি পরিবেশ দুষণ করছে এবং দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। অসাধু এসবকর্মকর্তাদের নিয়োজিত দালাল চক্র সেবা গ্রহীতাদের সাথে চুক্তি করতে বাধ্য করে। এরাই টাকার বিনিময়ে পরীক্ষামূলক ও স্থায়ী ড্রাইভিং লাইসেন্স করে দেন।

নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক বিআরটিএর এক কর্মচারী বলেন, এসব দালাল মূল্যবান ফাইলপত্রে অবাধে হাত দিয়ে থাকে। সেবাগ্রহীতারা কোনো কাজে অফিসে এলে তারা তাদের সাথে চুক্তি করতে বাধ্য করে। তাদের খুশি করতে পারলেই ড্রাইভিং না জানা ব্যক্তিও লাইসেন্স পেয়ে থাকেন। আবার টাকা দিলেই চলাচলের অযোগ্য গাড়ির মালিককেও ফিটনেস সার্টিফিকেট দেয়া হয়। এ অফিসে ভালো নম্বর বিক্রির ব্যবসাও জমজমাট। একজনের নম্বর অন্যজনকে দেয়ার রেকর্ড রয়েছে।

দালালদের আদায় করা টাকা ঘুষখোর অসাধু কর্মকর্তাদের মাঝে ভাগবাটোয়ারা হয়। ইদানীং দুর্নীতিবিরোধী অভিযান একটু কম হওয়ায় কর্মকর্তারা সরিসরি টাকা গ্রহণ করছেন বলেও জানা যায়। আবার দালালরাও গাড়ির রেজিস্ট্রেশন ও ড্রাইভিং লাইসেন্স করে দিচ্ছে মোটা অংকের টাকার বিনিময়। এভাবে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা ও নিদিষ্ট দালালরা আঙুল ফুলে কলাগাছ হলেও সরকারের তদারকি সংস্থা দুদকসহ সবাই নিরব ভূমিকা পালন করছেন।

অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে জানার জন্য—চট্টগ্রাম বিআরটিএ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে কেউ কল রিসিভ করেনি।

এবিষয়ে জানার বিআরটিএ চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইয়াসীনের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হলে সংযোগ পাওয়া যায়নি।

প্রিয় পাঠক—বিআরটিএ চট্টগ্রাম অফিসের আরও অনিয়ম-দুর্নীতি ও নিদিষ্ট দালালদের নামসহ দ্বিতীয় পর্বে আসছে এক্সক্লুসিভ প্রতিবেদন, সঙ্গে থাকুন।

সকালের-সময় ডটকম

0Shares

আরো সংবাদ