সরঞ্জাম দপ্তরের উপসহকারি প্রকৌশলী আঙুল ফুলে কলাগাছ!


২৬ অক্টোবর, ২০২৪ ২:৩৪ : অপরাহ্ণ

আওয়ামীলীগ সরকারের টানা ১৫ বছরে শাসনামলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের পাহাড়তলী সরঞ্জাম দপ্তরের শামীম শাহরিয়ার পাপ্পু হয়েছেন আঙুল ফুলে কলাগাছ। গড়েছেন কাঁড়ি কাঁড়ি সম্পদ। তার এই কার্যকলাপ হার মানায় সিনেমার কাহিনিকেও! ছিলেন সামান্য তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী। কিন্তু প্রভাব কাটাতেন বীরের মত। তার এই প্রভাব ও আধিপত্যই বদলে গেছে তার জীবনের সব দৃশ্যপট বিত্তবৈভব, গত এক যুগে সরঞ্জাম দপ্তরে পাপ্পু হয়ে উঠেছেন বেপরোয়া-অপ্রতিরোধ্য।

জানা যায়—পাপ্পু নামে-বেনামে গড়েছেন কোটি কোটি টাকার সম্পদ, মালিক হয়েছেন বাড়ি-ফ্ল্যাট ও জায়গা-জমির, তা অবশ্যই প্রভাব খাটিয়ে, অবৈধ উপায়ে। তবে বিস্ময়কর বিষয় হলো, গত একযুগে পাপ্পু আওয়ামীলীগ নেতাদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তিনি সরঞ্জাম দপ্তরে অপরাধের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। এমনই দৌরাত্ম্য ছিল তার, মন খারাপ হলেই নিজের খেয়ালখুশিমতো করত অনিয়ম-দুর্নীতি।

সূত্র জানায়—সরঞ্জাম দপ্তরের নানা কাজে কমিশন বাবদ পাপ্পুকে খুশি না করলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভয় দেখান, হুমকি-ধমকি দেন, বিষয়টিকে রীতিমতো রেওয়াজে পরিণত করেছেন তিনি। গত ৫ আগষ্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচার আওয়ামীলীগ সরকারের পতনের পরও পাপ্পুর কার্যকলাপ নিয়ে মুখ খোলার সাহস পাচ্ছেন না ভুক্তভোগীরা। তারা জানান, শাহরিয়ার পাপ্পু খুবেই ভয়ংকর, তার সরঞ্জাম দপ্তরে একটি সন্ত্রাসী বাহিনী রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, শাহরিয়ার পাপ্পু রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের পাহাড়তলি সরঞ্জাম ক্রয় বিভাগের ইনেসপেকশন দপ্তরের উপসহকারি প্রকৌশলী (ষ্টোর) পদে কর্মরত আছেন। কিন্তু তিনি প্রকৌশল বিভাগে কোন রকম পড়ালেখা করেননি। তার নিয়োগও প্রকৌশলী পদে নয়। অফিস সহকারি (কেরানি) পদে নিয়োগ দিয়েই তার চাকরি জীবন শুরু।

অভিযোগে আছে—শাহরিয়ার পাপ্পু রেলওয়ের সরঞ্জাম ক্রয় বিভাগের ইনেসপেকশন দপ্তরের আওতায় বিভিন্ন সরঞ্জাম কেনাকাটায় করেন কমিশন বাণিজ্য। পছন্দের ঠিকাদার ও সাপ্লইয়ারদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে হাতিয়ে নেন লাখ লাখ টাকা। এক্ষেত্রে সুকৌশলে সরঞ্জাম কোনাকাটার ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে টাকা আত্মসাৎ করারও অভিযোগ আছে এই পাপ্পু ও তার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরঞ্জাম দপ্তরের এক কর্মচারী জানান, শাহরিয়ার পাপ্পু সাবেক সরঞ্জাম ক্রয় বিভাগের প্রধান তার মামা সেলিম মোহাম্মদের জোরেই বসে যান উপসহকারি প্রকৌশলী (সাব এসিসটেন্ট ইঞ্জিনিয়ার) পদের চেয়ারে। এই চাকরিতেই পাপ্পু পেয়ে যায় আলাদিনের চেরাগ। এরপর ক্রমেই কিনেছেন একের পর এক ফ্ল্যাট। কিনেছেন প্লট। করেছেন বিলাসবহুল বাড়ি। ছড়েন দামী গাড়িতে। বিভিন্ন ব্যাংকে আছে এফডিআর ও লাখ লাখ টাকা।

তিনি আরও জানান, শামীম শাহরিয়ার পাপ্পু সদ্য ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামীলীগ সরকারের রেলওয়ে শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক। তিনি রাজনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সে হিসেবে আওয়ামীলীগ সমর্থিত ঠিকাদার ও সাপ্লাইয়ারদের নিয়েই তার মিশন। এ নিয়ে কেউ কোন রকম মুখ খুললে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও সাপ্লাইয়ার তার পক্ষ নিয়ে মারধর ও প্রাণনাশের হুমকি দেন।

পরিদর্শন দপ্তরের কয়েকজন কর্মচারী অভিযোগ করে বলেন, কোন ঠিকাদার চা-নাস্তার জন্য টাকা দিয়ে গেলে সেটাতেও ভাগ বসান পাপ্পু, মাঝে মধ্যে পুরোটাই নিজের কাছে রেখে দেন। কেউ টের না পেলে স্বয়ং ডিসিওএস এবং এসিওএসের ভাগও নিজের করে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে পাপ্পুর বিরুদ্ধে।

এছাড়া—বিগত সময়ে রেলের বিভিন্ন পদে নিয়োগ বাণিজ্যের সাথেও জড়িত তিনি। কারণ তার মামা সেলিম মোহাম্মদ ছিলেন এই সরঞ্জাম ক্রয় বিভাগের প্রধান সরঞ্জাম ক্রয় কর্মকর্তা। সেটি ২০১৮-১৯ সালের কথা। এই সময়ে রেলে বিভিন্ন পদে নিয়োগে তিনি চাকরি প্রার্থীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলেও অভিযোগ আছে। জাল-জালিয়াতি করে অফিস সহকারি থেকে উপসহকারি প্রকৌশলী (ষ্টোর) পদটিও বাগিয়ে নেন শাহরিয়ার পাপ্পু।

এছাড়া ক্ষমতাচ্যুত সরকারের দলীয় লোকজনের সঙ্গে মিলেমিশে দপ্তরের বহু মূল্যবান সরঞ্জাম ও স্ক্র্যাপ চুরি করে বাইরে বিক্রি করে দেন তিনি। এ ধরণের অনেক সরঞ্জাম ও স্ক্র্যাপ চুরির ঘটনা রয়েছে সরঞ্জাম ক্রয় বিভাগে। যার পরোটায় নেতৃত্ব দেন শাহরিয়ার পাপ্পু এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বর্তমানে চট্টগ্রাম শহরের ডিটি রোডে ডায়মন্ড টাচ কমিউনিটি সেন্টারের পাশে রেলওয়ে হাউজিং সোসাইটিতে একটি ফ্ল্যাট ছাড়াও আরও দুটি ফ্ল্যাট আছে তার। যেগুলোর প্রতিটির মূল্য ৮০ থেকে এক কোটি টাকার উপরে। এছাড়া রাজধানি ঢাকায়ও রয়েছে একটি ফ্ল্যাট। সাভারে কিনেছেন ৪ কাঠার একটি প্লটও। যাহার মূল্য দুই কোটি টাকার বেশি।

এছাড়া নিজ জন্মস্থান খুলনা ও পৈত্রিক বাড়ি চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার মাদার্শা এলাকায়ও কিনেছেন জমি, করেছেন বিলাসবহুল বাড়ি। এরপরও তিনি পরিবার নিয়ে চট্টগ্রাম শহরে ভাড়ায় থাকেন বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে। চলেন দামি গাড়িতে। যদিও এই গাড়ি নিয়ে তিনি কখনো অফিসে আসেননি ধরা পড়ার ভয়ে।

অনিয়ম-দুর্নীতি ও জায়গা-জমি, ফ্ল্যাট-প্লট এর ব্যাপারে জানতে পাহাড়তলী সরঞ্জাম দপ্তরের উপসহকারি প্রকৌশলী শাহরিয়ার পাপ্পু সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি তার সঙ্গে অফিসে গিয়ে দেখা করার কথা বলে লাইন কেটে দেন।

এবিষয়ে জানতে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান সরঞ্জাম কর্মকর্তা ফরিদ আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তার মোবাইল সংযোগ পাওয়া যায়নি।

এসএস/এমএফ

0Shares

আরো সংবাদ