চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার কচুয়াইয়ে সড়ক ও জনপদ বিভাগের (সওজ) এক কর্মকর্তার ব্যক্তিগত বাড়ির জন্যে গ্রামীই সড়ক উন্নয়ন খাত থেকে ব্যয় হয়েছে প্রায় অর্ধকোটি টাকা। বাড়িটি জনমানবহীন থাকলেও বাড়িটিকে আলোক জলমল রাখতে সরকারের লাখ লাখ টাকা খরচে বসানো হয়েছে চারটি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন সোলার লাইট।
বাড়িটির জন্যে নির্মাণ করা সড়কের দৈর্ঘ্য মাত্র ৩৫০ মিটার। আবার এরই মধ্যে রয়েছে আরও দুটি সড়ক। আলোচিত বাড়িটির মালিক সওজের চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সুমন সিংহ। সেখানে প্রবেশ করার জন্যে ২০০ মিটার দৈর্ঘ্যের সরকারি সড়কের নামকরণ করা হয়েছে তার দাদা-দাদির নামে। ওই সড়কের পাশে ১৫০ মিটারের অন্য আরেকটি সড়কের নামকরণ করেছেন সেই কর্মকর্তার বাবা-মায়ের নামে।
চট্টগ্রাম কক্সবাজার মহাসড়কের পটিয়ার ভাইয়ার দিঘির প্রায় একশ গজ দক্ষিণে পশ্চিমমুখী গ্রামীণ সড়কের প্রবেশ পথে ও ৩/৪টি সাইনবোর্ডে যে কারও চোখে পড়বে। যেখানে বাংলা ও ইংরেজিতে লেখা রয়েছে যোগেন্দ্র-মাধুরী সিংহ সড়ক। সামান্য এগোলেই সড়কের সংযুক্ত আরেকটি গ্রাম্য রাস্তার নাম দেয়া হয়েছে প্রণব-সুহাসিনী সিংহ সড়ক। নতুন নামকরণকৃত যোগেন্দ্র-মাধুরী সিংহ সড়কের শেষ প্রান্তের ডান পাশে ঝুপড়ির পাশে দেখা যাবে দৃষ্টিনন্দন বিলাসবহুল একটি বাড়ি। যেটিকে স্থানীয়রা রাজপ্রাসাদ বলেই চেনে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সওজের কর্মকর্তা সুমন সিংহ নিজ বাড়ি সংলগ্ন ৩৫০ মিটারের দুটি গ্রামীণ ফুটপাথের মত রাস্তাকে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক হিসেবে দেখানো হয়েছে। প্রায় ৪১ লাখ টাকা ব্যয়ে বাড়িঘাটা রাস্তা দুইটি সেজেছে অত্যাধুনিক ইউনি ব্লকে। যেখানে এখনও সুমন সিংহের বাড়ির পরের অংশসহ পটিয়ার অনেক গুরুত্বপূর্ণ সড়ক কাঁচা রয়েছে। সেখানে এই ৩৫০ মিটার সড়ক ব্যয় বহুল ইউনি ব্লক দ্বারা উন্নয়ন সরকারি অর্থের অপচয় বলে দাবি করেছেন স্থানীয়রা।
এলজিইডির অধীনে ২০০ মিটার দূরত্বের যোগেন্দ্র-মাধুরী সিংহ সড়কের নামে ২৪ লাখ ১৪ হাজার ৮৯৬ টাকা নির্মাই ব্যয় ধরা হয়েছে। পাশাপাশি ওই সড়কের সাথে সংযুক্ত আরেকটি বাড়িঘাটা ১৫০ মিটার দূরত্বের প্রণব-সুহাসিনী সিংহ সড়কের নামে নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬ লাখ ৬ হাজার ৫৩৬ টাকা। স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সংসদের হুইপ সামশুল হক চৌধুরীর সাথে সখ্যতা থাকার সুবাধে এই দুটি সড়কের জন্য ডিও লেটারও নেন সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী সুমন সিংহ। এলজিইডি’র কর্মকর্তাদের ভুল তথ্য দিয়ে ফুটপাথের মত গ্রামীণ সড়ক ও বাড়ীঘাটাকে অতি গুরুত্বপূর্ণ দেখানো ও আত্মীয়দের নামে নামকরণ করিয়ে নেই এই কর্মকর্তা।
সড়কের আইডি নম্বর সৃষ্টি করে সরকারি বিপুল অর্থ খরচে একটি পরিবারের জন্য ইউনি ব্লক দ্বারা উন্নয়ন কাজের বিষয়টি এখন টক অব দ্যা পটিয়া। দৃশ্যমান এ্যারো মার্ক দিয়ে এলজিইডি’র আইডি নম্বর উল্লেখ করে সাড়ে তিনশ মিটারের দুটি সড়কে সাঁটানো হয়েছে সরকারি খরচে ৪টি সাইন বোর্ড। আলোচিত একটি সড়কের পূর্বের নাম ছিল তালতলা টু অলির হাট মফিজ খান সড়ক। যা বর্তমানে যোগেন্দ্র-মাধুরী সিংহ সড়ক নামে নাম করণ করে পটিয়া চট্টগ্রাম কক্সবাজার মহাসড়ক সংলগ্ন গেইট স্থাপন করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সুমন সিংহের অট্টালিকা জনমানব শূন্য সুরম্য ভবনটির সাথে লাগোয়া আরও ১৫০ মিটারের একটি সড়ক যার পূর্বে নাম ছিল সিংহ বাড়ি টু সিতানা পুকুর পাড় সড়ক। যা বর্তমানে সুমন সিংহের পিতা মাতার নামে নামকরণ করে প্রনব-সুহাসিনী সিংহ সড়ক নামে করা হয়েছে। এমনভাবে সড়ক নির্মাণ হয়েছে যেন সেখান থেকে মাটির স্পর্শ ছাড়াই আলোচিত সুমন সিংহের বাড়িতে যাওয়া যায়।
গত ১ জুলাই জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিশাল আকারের দুটি নাম ফলক বসিয়ে সড়ক দুটির শুভ উদ্বোধন করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য সামশুল হক চৌধুরী। তবে ২০০ মিটারের যোগেন্দ্র-মাধুরী সিংহ সড়কটির কাজ শেষ হলেও ১৫০ মিটারে প্রনব-সুহাসিনী সিংহ সড়কটির কাজ এখনও শেষ হয়নি।
এদিকে, এই সড়ক দুটির নামকরণ নিয়ে এলাকার মানুষের মাঝে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। উপজেলার কচুয়াই ইউনিয়নের কথা কচুয়াই লেওয়া-ই আহমদিয়া সুন্নিয়া মাদ্রাসা হেফজখানা ও এতিমখানার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মোহাম্মদ আবদুল আলম ফকির জানান, সড়কটির নাম ছিল কচুয়াই তালতলা মফিজ খান সড়ক। ওই সড়কটির মুখে মাদ্রাসার নামে একটি গেট ছিল। সেটি ভেঙে যোগেন্দ্র মাধুরী সিংহ নামে নতুন করে গেট দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে আমি সুমন সিংহকে আসামি করে ফৌজদারি মামলা দায়ের করেছি।
এ বিষয়ে এলজিইডি চট্টগ্রামের সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী সুমন তালুকদার জানান, ব্যক্তিগত নামে সড়ক নামকরণের কোন সুযোগ নেই। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে সরকারি সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। তারপরও যদি কেউ গায়ের জোরে ব্যক্তিগত নামে সড়কের নামকরণ করে থাকে সেটি তার একান্ত ব্যক্তিগত দায় । তবে এই নাম একদিন মুছে যাবে সরকারি নিয়মে।
দক্ষিণ চট্টগ্রাম সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সুমন সিংহের কাছে জানতে চাইলে তিনি অফিসে আসুন তারপর কথা বলব বলে বিষয়টি এড়িয়ে যান।
সকালের-সময়/ফোরকান