বায়েজিদে পাহাড় দখলে সংঘবদ্ধ চক্র–ভূমিদস্যুদের দুর্গ ভাঙবে কে?


২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ ১:৫৭ : পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: বায়েজিদ-ফৌজদারহাট সংযোগ সড়কে সরকারি জায়গা দখলের ভয়াবহ প্রতিযোগিতা শুরু করেছে সংঘবদ্ধ বেশ কয়েকটি ভূমিদস্যুচক্র। রাতের আধারে তারা স্থাপনা নির্মাণ ও পাহাড় দখল করলেও দিনের বেলায় তাদের তৎপরতা চোখে পড়ে না।

অভিযোগ আছে, পাহাড়, সড়ক ও পরিত্যক্ত সরকারি জমি দখল করে লুটেপুটে খাচ্ছে জালালাবাদ, উত্তর পাহাড়তলীর এক শ্রেণির ভূমিখেকো। অসহায়, নিরীহদের জমিও সন্ত্রাসী কায়দায় ভোগ-দখল করে দোর্দণ্ড প্রতাপে জমিদারি করছে তারা। যাদের বেশিরভাগই জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ।

সরেজমিনে দেখা যায়, আরেফিন নগর থেকে পশ্চিমে বেঙ্গল ব্রিকস পর্যন্ত প্রায় ৫ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে সড়কের দুপাশে গড়ে উঠেছে শতাধিক অবৈধ দোকান ও বস্তিঘর। সীতাকুণ্ড মৌজায় স্পেক্ট্রা ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডের পাহাড় কেটে গড়া রিসোর্ট-এর অদূরে কালভার্ট ঘেঁষে পাহাড় কেটে টিন দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে একটি দোকান ঘর। এ জায়গা দখল করেছেন ভূমিদস্যু সিরাজ।

আর এ দিকে স্পেক্ট্রার রিসোর্ট থেকে পূর্ব দিকে আরেফিনগর এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইম্যান পর্যন্ত দেখা গেছে সড়কটির দুপাশে পাহাড় কেটে গড়ে তোলা হয়েছে অসংখ্য দোকানপাট। উত্তর পাহাড়তলী এবং জালালাবাদ মৌজার সীমান্তে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইম্যানস-এর জায়গায় পাশাপাশি গড়ে তোলা হয়েছে গাড়ি মেরামতের গ্যারেজ, ইট, কংকর, সিমেন্টের পিলার, কমোড তৈরির স্থাপনা। এ জায়গা দখলে নিয়েছেন ভূমিখেকো মনির হোসেন।

সরেজমিন দেখা গেছে, সড়কের দুপাশে টিন দিয়ে, কোথাও পাহাড়ের পাদদেশে ভ্যানগাড়ি রেখে এর চারপাশে বাঁশ দিয়ে টং দোকান গড়ে তুলেছে। আবার অনেকে ইট, বালি, সিমেন্ট এনে দোকান নির্মাণ করছে।

জানা গেছে ভূমিদস্যুরা— সরকারি জায়গা দখলের পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যাক্তির কেনা জায়গাও ভুয়া দলিলে দখল করে নিচ্ছে। ভুক্তভোগীরা স্থানীয় প্রশাসনের কাছে অভিযোগ দিয়েও ফল পাচ্ছেন না। অবৈধ দখলকারীরা ভুয়া কাগজপত্র সৃজন করে রাস্তার পাশে খালি পড়ে থাকা জায়গাগুলো নিজেদের দাবি করে দোকান ও ঘরবাড়ি গড়ে তুললেও নাকে তৈল দিয়ে ঘুমাচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

সরেজমিনে দেখা গেছে—বায়েজিদ লিংক রোড ঘেঁষে সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল লতীফপুর, জঙ্গল সলিমপুর মৌজার শত শত একর পাহাড়ি ভূমি গ্রাস করছে কয়েকটি ভূমিদস্যু চক্র। আরেফিন নগর থেকে পশ্চিমে বেঙ্গল ব্রিকস পর্যন্ত সড়কটির দুপাশে চোখে আটকে যায় সারি সারি সাইনবোর্ডে।

দেখা যায় পাহাড়ের পাদদেশে—এম এ সালাম বৃক্ষরোপণ প্রকল্প’ ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া লিমিটেড’ ‘জিন্নুরাইন প্রপার্টিজ (প্রা:) লিমিটেড’ ‘মিছম্যাক ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লি:’ এস এম আল মামুনসহ ব্যক্তি মালিকানাধীন অসংখ্য সাইনবোর্ড। শুধু আরেফিন নগর থেকে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইম্যান পর্যন্ত রাস্তার দুপাশে গড়ে উঠেছে শত শত দোকান ও বস্তি।

আরেফিন নগরে বিএস ৮০৪ দাগে জায়গায় ঝুলছে সরকারি একটি সাইনবোর্ড। সেটিতেই লেখা আছে ‘এই জায়গার মালিক গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার’৷ অথচ জায়গাটি দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে গাড়ি মেরামতের গ্যারেজ।

জঙ্গল লতীফপুর মৌজার বিএস ৪৪ দাগের জায়গায় ঝুলছে এস এম আল মামুন নামের একাধিক সাইনবোর্ড। সাইনবোর্ডে লেখা মোবাইল নম্বর ধরে ফোন করলে মোহাম্মদ মুছা নামের এক ব্যক্তি ফোন ধরেন। তখন তিনি বলেন, সাইনবোর্ড ঝুলানো জায়গাগুলোর মালিক সীতাকুণ্ড উপজেলা চেয়ারম্যান এস এম আল মামুনের৷ ওই দাগে জায়গার পরিমাণ চার একর। বায়েজিদ লিংক রোড হওয়ার আগেই তিনি জায়গাটি দোভাষ গং থেকে নিয়েছেন বলে শুনেছি।

স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, রোকন নামে কথিত এক বিএনপি নেতা (পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী) বায়েজিদ লিংক রোডের দুপাশে বিপুল পরিমাণ সরকারি খাস জমি দখলে নিয়েছেন। তার শক্তিশালী একটি চক্র আছে। তিনি ছিন্নমূল বস্তি এলাকায় থাকেন।

জিন্নুরাইন প্রপাটিজ (প্রা:) লিমিটেড ও বিপুল পরিমাণ পাহাড়ি খাস জায়গা দখল করে সাইনবোর্ড গেড়ে দিয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আদালতে মামলাও চলছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক এক মেয়েরের ছেলের সাথে এ প্রতিষ্ঠানের মালিক জমির উদ্দিনের মামলা চলছে বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলের দুদক এর দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা জানান, ভূমিদস্যু চক্রে চসিকের কয়েকজন ওয়ার্ড কাউন্সিলর রয়েছেন। তারা রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছেন। কয়েকজন কাউন্সিলর স্ত্রী-সন্তানের নামেও গড়েছেন অঢেল সম্পদ। তাদের সরকারি জায়গা দখল ও অবৈধ সম্পদ অর্জনসহ নানা তথ্যপ্রমাণ দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। ভূমিদস্যু চক্রগুলোর বিরুদ্ধে শিগগির অভিযান শুরু হবে।

দুদকের তথ্য মতে—বায়েজিদ লিংক রোডে পাহাড় দখল, পাহাড় কেটে নির্মাণ করা হয়েছে ঘরবাড়ি, দোকানপাট এবং ব্রিকফিল্ড। দখলের তালিকায় আছেন সরকার দলের একাধিক জনপ্রতিনিধি ছাড়াও আওয়ামী লীগ-বিএনপির নেতৃস্থানীয় একাধিক নেতা, আছেন ব্যবসায়ী। বায়েজিদ-ফৌজদারহাট সড়কটি সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর, নগরের জালালাবাদ ও উত্তর পাহাড়তলী মৌজায় অবস্থিত।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের এক উপ-পরিচালক বলেন—পাহাড় দখলে যত বড় প্রভাবশালী হোক না কেন তাদের ছাড় দেয়া হবে না। আমরা অতি দ্রুত পাহাড়খেকোদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিব।

এসএস/এমএফ

0Shares

আরো সংবাদ