বাপাউবো’র অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ


২৬ ডিসেম্বর, ২০২৫ ৩:৪১ : অপরাহ্ণ

ঘুষ লেনদেন, অনিয়ম আর দুর্নীতিতে বেপরোয়া চট্টগ্রাম অঞ্চলের পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো) অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পুর) স্বপন কুমার বড়ুয়া। জানা গেছে, এই স্বপনের হাত দিয়েই জলে ভাসছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের শত শত কোটি টাকার প্রকল্প। সরকারি টাকা জলে ভাসিয়ে তা আবার নিজের পকেটে ভরে স্বপন বড়ুয়া এখন আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ। অনিয়ম-দুর্নীতিতে এতটাই বেপরোয়া এই প্রকৌশলী চাকুরির অবসরকালীন সময় (এলপিআর) যাওয়ার আগ মূহুর্তেও তার অপকর্ম থেমে নেই। এই বিষয়ে সরাসরি টাকা হাতে ঘুষ নেওয়ার ছবিও সকালের-সময়ের হাতে সংরক্ষিত আছে।

বাপাউবো সূত্রে জানা গেছে, অতীতে যেখানেই ছিলেন, সেখান থেকেই অনিয়ম-দুর্নীতির দায়ে বিতাড়িত হয়েছেন। তিনি বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেনের আড়ালে কালো তালিকাভুক্ত ঠিকাদারদের কাজ দিয়ে নিম্নমানের কাজ করিয়েছেন। তিনি চট্টগ্রাম অঞ্চলের
অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পুর) হিসেবে যোগদানের পর থেকে বিভিন্ন প্রকল্পে হরিলুটে মেতেছেন।

বিশেষ করে—স্বপন কুমার বড়ুয়া চট্টগ্রাম ও কুমিল্লার বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের দায়িত্ব পালন করেছেন। বাপাউবো দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জোনের চট্টগ্রাম উন্নয়নমূলক কাজের পর্যালোচনা সভার সভাপতির দায়িত্বেও আছেন। তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পুর) পদ থেকে পদোন্নতি পেয়ে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে দায়িত্ব নিয়েছেন।

বাপাউবোর একাধিক সূত্র জানান, চট্টগ্রাম-কুমিল্লার অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ উপকূলীয় বেড়িবাঁধ প্রকল্প থেকে ৮-১০% কমিশন হাতিয়ে নিয়েছে এই প্রকৌশলী। এসব প্রকল্প শত কোটি থেকে হাজার কোটি টাকার কাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। যেখান থেকে কমিশন বাণিজ্য করে কোটি-কোটি টাকা হাতিয়েছেন বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদাররা।

সূত্র জানান, চট্টগ্রাম দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে ছোট-বড় প্রায় শত প্রকল্প চলমান আছে, বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকার পোল্ডার নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ, বাঁধ পুনরাকৃতিকরণ, তীর প্রতিরক্ষা, খাল খনন, জলসম্পদ উন্নয়ন এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নসহ স্থানীয় জনগণের জানমাল ও সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে। কিন্তু এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে বড়-ছোট প্রকৌশলীরা সরকারের শত শত কোটি টাকা লুটপাট করেন সংঘবদ্ধ ঠিকাদার সিণ্ডিকেটের মাধ্যমে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাপাউবোর কর্মচারী জানান, প্রধান প্রকৌশলী কয়েকটি প্রকল্প পরিদর্শনের পরও কাজের দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় বিভিন্ন এলাকার স্থানীয় জনগণ ব্যাপক ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা ঘুষখেকো প্রকৌশলী স্বপন ও তার দলবলের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন দুদকের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

জানা গেছে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার চরম অবহেলায় চলমান প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি হচ্ছে না। চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের কাজগুলোর অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়। এ কারণে বৃদ্ধি পায় প্রকল্পের ব্যয়, সঙ্গে বাড়ে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের ভোগান্তি। প্রতিটি কাজে এ প্রকৌশলীর পদে পদে অনিয়ম আর নেতিবাচক ভূমিকায় চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে। এসব নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারী, ঠিকাদার এবং প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের মধ্যে চলছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা।

জানা গেছে, প্রকৌশলী স্বপন কুমার বড়ুয়া একজন স্বৈরাচারের দোসর, তিনি বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে বিভিন্ন রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন। এবং ২০১২ সালে তিনি বঙ্গবন্ধু পরিষদ চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন।

তিনি অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে কর্মস্থলে যোগদানের পর নিজ অফিসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি, অফিসে নিজের বলয় তৈরি ও কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর বাসা বরাদ্দ না দেওয়াসহ নানা অভিযোগ উঠেছে। এসব কারণে কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দানা বাঁধছে।

বাপাউবোর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান, স্বপন কুমার বড়ুয়া বাপাউবো চট্টগ্রাম দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পান চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের দিকে। দায়িত্ব পেয়ে তিনি প্রকল্প কাজের বরাদ্দ থেকে কমিশন হাতিয়ে নেওয়া শুরু করেন। অভিযোগ রয়েছে, কমিশন ছাড়া তিনি কোনো ফান্ড ছাড় দেন না।

বাপাউবো’র এক কর্মচারী বলেন, আমাদের বড় স্যারের বাড়ি পটিয়ায়, চট্টগ্রাম হেমসেন লেনের বাড়িটি স্যারের নিজের তৈরী। ওই জমিও তিনি কিনেছেন। এই বাড়ি ও জমির বর্তমান বাজার মূল্য ১০ কোটি টাকার বেশি। সাম্প্রতি সময়ে কোটি টাকা খরচ করে সেখানে ছেলেকে বিয়ে করিয়েছেন। স্যার ঘুষ ও কমিশন বাণিজ্য করে এখন শতকোটি টাকার মালিক। স্যারের স্ত্রী পরলোক গমণ করেছেন।

এছাড়া—চট্টগ্রাম নগরের খুলশী এলাকায় স্যার প্লট কিনেছেন ১০ কোটি টাকায়। পটিয়ায় করেছেন বাড়ি। কিনেছেন বিপুল জায়গা-জমি। নগরীর বিভিন্ন ব্যাংকে স্যারের কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা জমা রয়েছে। আত্মীয় স্বজনের নামেও কিনেছেন বহু ফ্ল্যাট ও জমি। বিদেশেও টাকা পাচার করেছেন, যা তদন্ত করলে বেরিয়ে আসবে স্যারের সম্পদের পাহাড়।

জানা যায়, শুধু ঘুষ বা কমিশন বাণিজ্য নয়, অফিসের কর্মচারীদের বদলি বাণিজ্যও করছেন প্রকৌশলী স্বপন কুমার বড়ুয়া। অনৈতিক বদলি বাণিজ্য করতে গিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা ঘুষ না দেওয়ায় বাপাউবো চট্টগ্রাম পওর-২ কার্যালয়ের এক কর্মচারীকে চাকুরি থেকে বরখাস্ত করেছেন তিনি।

বাপাউবো সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিভিন্ন প্রকল্পে ধীরগতি ও দৃশ্যমান অগ্রগতির অভাব, ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশে কমিশন বাণিজ্য, নকশা পরিবর্তন করে অর্থ আত্মসাৎ, এবং প্রকৌশলীদের তদারকির অভাবে নিম্নমানের কাজ ও কোটি কোটি টাকার লোপাট করেছন এই প্রকৌশলী। বিশেষ করে, বাঁধ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ, এবং অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে, যা এখন চট্টগ্রাম জেলা-উপজেলার স্থানীয় জনগণের ক্ষোভের কারণ হয়েছে দাঁড়িয়েছে।

জানা গেছে, বাপাউবোর অনেক কর্মকর্তা সম্প্রতি জার্মান সফরে গেছেন, সেখানে এই অতিরিক্ত প্রকৌশলী স্বপন কুমার বড়ুয়াসহ বাপাউবো চট্টগ্রাম পওর বিভাগের দুই নির্বাহী প্রকৌশলীও গেছেন। চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পে প্রয়োজনীয় মেশিনারিজ ক্রয়ে জার্মান সফর গেছে জানা গেলেও, বিদেশ সফর নিয়ে ব্যাপক কৌতূহল সৃষ্টি হয় বাপাউবোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে।

অনিয়ম-দুর্নীতি, ঘুষ-কমিশন বাণিজ্যের বিষয়ে জানতে বাপাউবো চট্টগ্রাম অঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পুর) স্বপন কুমার বড়ুয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল রিসিভ করেনি। এবং হোয়াটসঅ্যাপেও বার্তা পাঠালেও তার সাড়াশব্দ পাওয়া যায়নি।

উল্লেখ্য—বিস্তীর্ণ জনপদের জলাবদ্ধতা নিরসন এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপকূলীয় পরিবেশ বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষার জন্য নদ-নদী খনন প্রকল্প শুরু হলেও খনন প্রকল্পে শুরু থেকে যে অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে, দিন দিন তা আরও জোরালো হচ্ছে। প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছেন উপকূলীয় জনপদের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ। এসব দুর্নীতি, অনিয়ম ও লুটপাট বন্ধে দুদকের হস্তক্ষেপ চান স্থানীয়রা।

এসএস/এমএফ

0Shares

আরো সংবাদ