নিজস্ব প্রতিবেদক: বদলির শেষ মুহূর্তেও কমিশন বাণিজ্য চালানোর অভিযোগ উঠেছে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মো. সুবক্তগীনের বিরুদ্ধে। দায়িত্ব ছাড়ার তিন দিনে সাত শতাধিক ফাইলে স্বাক্ষর করে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ঠিকাদাররা। এ নিয়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সিআরবি ভবনে রেল কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের মধ্যে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
ঠিকাদাররা জানান, মো. সুবক্তগীন আড়াই বছর আগে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে প্রধান প্রকৌশলী পদে যোগ দেন। এরপর থেকে নানা কৌশলে অনিয়মের মাধ্যমে কমিশন বাণিজ্য শুরু করেন তিনি। তিন থেকে পাঁচ পারসেন্ট কমিশন ছাড়া কখনও ফাইলে সই করেননি তিনি।
এ ছাড়া—বিভিন্ন ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এক প্রকল্পকে একাধিকবার নতুন প্রকল্প হিসেবে দেখিয়ে পছন্দের ঠিকাদারদের দিয়ে কাজ করিয়েছেন। বিশেষ করে এপিপির আওতায় শত শত ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে সরকারি অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি।
ভুয়া প্রকল্পের কাজ করার জন্য নামে-বেনামে একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছেন সুবক্তগীন। এমনকি প্রকল্পের কাজ ইজিপিতে টেন্ডার দেখালেও ৬ এবং ৭ নম্বর রেটের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিয়ে অর্থ হাতিয়েছেন। এর মধ্যে প্রতিবছর কালুরঘাট সেতুসহ বিভিন্ন ব্রিজ-কালভার্ট মেরামত, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান ভবন সংস্কার, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ২৬টি স্টেশনের ভবনসহ নানা অবকাঠামো সংস্কার ও নির্মাণ, সিআরবি হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পের মত শত শত কোটি টাকার প্রকল্প বানিয়ে অর্থ হাতিয়েছেন তিনি। এভাবে লুট করেছেন চট্টগ্রাম রেলের শত কোটি টাকা।
আমিনুল হক নামে এক ঠিকাদার জানান, সবুক্তগীন বিভিন্ন প্রকল্পে তিন থেকে পাঁচ পারসেন্ট কমিশন নিতেন। কমিশন ছাড়া ফাইল ছাড়তেন না, প্রয়োজনে রি-টেন্ডার করতেন। এভাবে গত ২০২০ থেকে ২০২১ সালের অন্তত সাত শতাধিক ফাইল বদলি হওয়ার শেষ মুহূর্তে দিনে-রাতে স্বাক্ষর করে কমিশন হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি।
ঠিকাদার আমিনুল আরো বলেন, বদলির আদেশপত্র আসার পর প্রধান প্রকৌশলী মো. সুবক্তগীন গত ৯ ফেব্রুয়ারি বুধবার থেকে গণহারে ফাইল স্বাক্ষর শুরু করেন। সেদিন থেকে তিনি গভীর রাত পর্যন্ত অফিস করেন। এমনকি সরকারি ছুটির দিন শুক্র ও শনিবারেও অফিস করেন।
এই সময়ে যেন ঠিকাদারদের হাট বসে প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয়ে। তার সঙ্গে যোগ হয় বদলি বাণিজ্যও। সবুক্তগীনের এসব কাজের সহযোগী ছিলেন প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয়ের আওতাধীন ডিএন-১, ডিএন-২ ও নির্বাহী প্রকৌশলী। আর ফাইলে স্বাক্ষর করায় সহযোগী ছিলেন প্রধান প্রকৌশলীর স্টেনোগ্রাফার হেমায়েত উদ্দিন।
বদলির তিন-চার দিন আগে থেকে সবুক্তগীন অফিসে ব্যস্ত সময় কাটানোর কথা স্বীকার করে হেমায়েত উদ্দিন বলেন, স্যার এ সময় পেইন্ডিং ফাইলগুলো স্বাক্ষর করেন। তবে কতগুলো ফাইল স্বাক্ষর করা হয়েছে তা মনে নেই। এ ছাড়া সব ফাইল তো আমার হাত দিয়ে আসে না। তাই ফাইলের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা বলতে পারছি না আমি।
ডিএন-১-এর প্রকৌশলী মো. আবু হানিফ বলেন, প্রকল্পের বিষয়টি গোপনীয়। এটা বলা যাবে না। আর ডিএন-২-এর প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও কল রিসিভ করনেনি তিনি।
নির্বাহী প্রকৌশলী আবু রাফি মো. ইমিতিয়াজ হোছাইন বলেন, প্রধান প্রকৌশলীর অনুমতি ছাড়া কোনো তথ্য দেওয়া যাবে না।
এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে প্রধান প্রকৌশলী মো. সুবক্তগীন বলেন, বদলির আগে অফিসে ব্যস্ত সময় গেছে। তবে এখানে কোনো রকম অনিয়ম করার সুযোগ নেই। কারণ সবগুলো প্রকল্পের টেন্ডার ইজিপিতে হয়। ইজিপিতে অনিয়ম-কারচুপি করার কোনো সুযোগ নেই।
এ বিষয়ে প্রকল্পের কাজের তথ্যসূচি চাইলে তিনি বলেন, আমার শারীরিক ও মানসিক অবস্থা ভালো নেই। এসব কাগজপত্র কয়েকদিন পরে নিন। নতুন যারা আসছেন তারাও আমার এলাকার মানুষ। আমি তাদের বলে দেব।
রেলওয়ে শ্রমিকদের দেওয়া তথ্যমতে, প্রধান প্রকৌশলী সুবক্তগীন গত ১৩ ফেব্রুয়ারি রোববার দায়িত্ব হস্তান্তর করেন। সোমবার রাতে তিনি রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের কর্মস্থল ত্যাগ করেন। এর আগ পর্যন্ত তিনি ‘ব্যাক ডেটে’ ফাইলে স্বাক্ষর করেন।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের তথ্যমতে, গত ৭ ফেব্রুয়ারি রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব সালমা পারভীন স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে রেলওয়ে পুর্বাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ পাঁচ বিভাগে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বদলি করা হয়। এদের মধ্যে রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আবু জাফর মিয়াকে। এর আগে তিনি ঢাকা রেলভবনের স্ট্যান্ডার্ড ও সংকেত বিভাগের পরিচালক ছিলেন।
প্রকৌশলী মো. সুবক্তগীনকে বদলি করা হলেও বদলির দিন পর্যন্ত তাকে কোনো দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। তবে বুধবার বিকালে মোবাইল ফোনে কথা বলার সময় তিনি জানান, বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেললাইনের পিডি হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন তিনি।
এ ছাড়া সিআরবি হাসপাতাল ইস্যুতে আলোচনায় আসা পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী (সেতু) মো. আহসান জাবিরকে বদলি করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতুর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে। তার স্থলে পদায়ন করা হয়েছে রেল ভবনের বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আব্দুস সালামকে।
সূত্র—এসএ/এসএস/এমএফ