থৈ থৈ পানিতে চট্টগ্রাম, বিপাকে নগরবাসী!


১৩ জুলাই, ২০১৯ ১০:৪৭ : অপরাহ্ণ

দু’চোখ যেদিকে যায় সেদিকে পানি আর পানি। কোথাও গলা, কোথাও কোমর, আবার কোথাও হাঁটু সমান পানিতে তলিয়ে গেছে চট্টগ্রাম। শুধু নিচু এলাকা নয়। সড়ক-মহাসড়কও খোঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। যানবাহন তো চলছেই না। দোকানপাটও বন্ধ। মিলছে না নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসও।

গতকাল শক্রুবার রাত থেকে এমনি অচল হয়ে পড়ে দেশের ব্যস্ততম বাণিজ্যনগরী চট্টগ্রাম। পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস জানায়, মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে মাত্র এক রাতের মাঝারি বৃষ্টিতে এমন অবস্থা এই বাণিজ্যনগরী চট্টগ্রামের। পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় বৃষ্টির পানিতে থই থই করছে বলে স্বীকার করেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শামসুদ্দোহা।

তিনি জানান, চট্টগ্রাম মহানগরীতে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে নগরজুড়ে সড়ক-মহাসড়ক খোঁড়াখুঁড়ি করছে ওয়াসা। এ কারণে নগরীর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। ফলে সিটি করপোরেশন জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করলেও তা কাজে আসেনি। অন্যদিকে জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার ৩টি মেগা প্রকল্প তিন বছর ধরে হাতে নিয়ে বসে আছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ।

নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে কোনো কাজ করেনি তারা। ফলে নগরবাসীকে প্রতি বছরের মতো এবারও জলাবদ্ধতার শিকার হতে হলো। এ বিষয়ে জানতে চাইলে চউক চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষ বলেন, প্রকল্প হাতে নিয়ে বসে নেই চউক। গত বছর বর্ষা থেকে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। সেই থেকে ১১ খালের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন কাজ করেছে চউক। প্রকল্প কাজ অব্যাহত রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

চট্টগ্রাম ওয়াসার উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (প্রশাসন) গোলাম হোসেন বলেন, নগরীর কথা বলব কী? ওয়াসা ভবনের নিচতলায়ও পানি ওঠে গেছে। ফলে ব্যাংকসহ সব অফিসের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। পামপ বসিয়ে পানি নিষ্কাশন করা হচ্ছে।

সূত্র জানায়, মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে গত শনিবার দুপুর থেকে চট্টগ্রাম মহানগরীতে টিপটিপ বৃষ্টি শুরু হয়। যা রোববার দিনভর চলে। কিন্তু রোববার রাত থেকে মাঝারি বৃষ্টিপাতে নগরীর নিচু এলাকা ডুবে এখন সড়ক-মহাসড়কও খোঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে নগরীতে যানবাহন চলাচল প্রায় বন্ধ।

অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত নগরীর ৫টি ফ্লাইওভারেও পানি জমে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে পড়েছে। এতে অফিস-আদালত ও গার্মেন্ট কারখানাসহ বিভিন্ন কারখানার শ্রমিক এবং স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের যাওয়া-আসায় অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বৃষ্টিপাতের ফলে নগরীর বহদ্দারহাট, চকবাজার, মুরাদপুর, কাপাসগোলা, চন্দনপুরা, কোতোয়ালি, অক্সিজেন, ষোলশহর ২নং গেট, ওয়াসা মোড়, হামজারবাগ, মোহাম্মদপুর, শুলকবহর, হালিশহর, আগ্রাবাদ কে ব্লক, প্রবর্তক, বাকলিয়া, মোহরা, পতেঙ্গা, অলঙ্কার, পাহাড়তলিসহ নগরীর দুই তৃতীয়াংশ এলাকা বৃষ্টির পানিতে থই থই করছে।

এসব এলাকার কোথাও গলা, কোথাও কোমর, কোথাও হাঁটু পানি জমে রয়েছে। সড়ক থেকে হাটবাজার, স্কুল কলেজ, সরকারি অফিস, দোকানপাট, মার্কেট, বসতঘর ও বস্তিগুলো ডুবে রয়েছে। দালান ছাড়া কোনো চিহ্নই এখন মিলছে না। ফলে যাতায়াতে মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

সকালে বহদ্দার-হাট এলাকায় কোমর সমান পানিতে দাঁড়িয়ে মো: রাসেল নামে এক পথচারী বলেন, সামান্য বৃষ্টিতেই পানি উঠে নগরীর সড়কগুলো ডুবে রয়েছে। সড়ক খোঁজে না পাওয়ায় যানবাহন চলাচল করতে পারছে না। এতে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রাম মহানগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে দায়িত্ব দিয়েছেন। কিন্তু সংস্থাটি কোনো কাজই করছে না। শুধু জলাবদ্ধতার নিরসনের নামে ইটিং, মিটিং ও সিটিং করে যাচ্ছে।

মুরাদপুর এলাকার বাসিন্দা নাসরিন সুলতানা বলেন, সকাল সাড়ে ৮টা থেকে অফিসে যাওয়ার জন্য বৃষ্টির মধ্যে কোমর সমান পানিতে দাঁড়িয়ে ছিলাম একটি রিকশার জন্য। অনেক কষ্টে রিকশা পেলেও মাঝ পথে রিকশাটা গর্তের মধ্য পড়ে আমি একে বারেই ভিজে যায়।

নগরীর চকবাজার এলাকার কলেজ ছাত্রী ফারুকী আলম জানান, রাতেই তাঁর ঘরের ভেতরে পানি ঢুকেছে। এতে খাটের ওপর বসে ঘরের সবাইকে রাত কাটাতে হয়েছে। রান্নাবান্না করতে পারছি না হোটেলে খাবারের জন্য গেলাম তাও বন্ধ।

কালামিয়া বাজারে নগরীর সিএনজি অটোরিকশা চালক আবুল কালাম বলেন, এলাকার সবক’টি সড়ক তলিয়ে গেছে। গাড়ি চালানোর সড়ক খোঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এ অবস্থায়, একটি গর্তে পড়ে তাঁর অটোরিকশা নষ্ট হয়ে গেছে। পরে অনেক কষ্টে গর্ত থেকে অটোরিকশাটি উদ্ধার করে মিস্ত্রির কাছে দিয়েছেন।

পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ প্রদীপ কান্তি নাথ জানান, গতকাল শক্রুবার রাত ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ১৩৬ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস। পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় আরো বৃষ্টিপাত হতে পারে। সমুদ্র বন্দরগুলোকে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।

তিনি জানান, বিকালের দিকে বঙ্গোপসাগরে প্রবল জোয়ার সৃষ্টি হতে পারে। এতে চট্টগ্রাম মহানগরীর আরো নতুন এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যেতে পারে। ফলে ওইসব এলাকায় পানির উচ্চতা আরো বাড়তে পারে। এতে যানবাহন ও মানুষের চলাচলে সাবধানতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া পাহাড় ধসের সতর্কবার্তার কথাও বলেন তিনি।

এদিকে, পাহাড় ধস ঠেকাতে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি সরিয়ে নিতে মাইকিং করা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের আশপাশে ৯টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলার কথা জানিয়েছেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াছ হোসেন। তিনি বলেন, বর্ষণে পাহাড় ধসের শঙ্কায় জেলা প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশ থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নিচ্ছে। রেড ক্রিসেন্ট নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু করেছে। মেডিকেল টিম গঠন করেছে জেলা সিভিল সার্জন অফিস।

চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (পরিবহন) এনামুল করিম জানান, মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বৃষ্টিপাত হলেও দেশের চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে। নির্দিষ্ট সময়মত জাহাজ জেটিতে নোঙর করছে। পণ্য ওাঠানামা সচল রয়েছে।

0Shares

আরো সংবাদ