জুলাই হত্যা মামলার আসামী চট্টগ্রাম গৃহায়ণের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী!


১৭ জানুয়ারি, ২০২৬ ৪:১৪ : অপরাহ্ণ

জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতা হত্যা মামলায় আসামি করা হয়েছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ১৬ প্রকৌশলীকে। পাশাপাশি একই অভিযোগে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের এক প্রকৌশলীর বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে। মামলার পর থেকে ক্ষমতাচ্যুত আ. লীগ সরকারের সুবিধাভোগী এসব প্রকৌশলী এখনো রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।

অন্যদিকে—এই দপ্তরে ভয়াবহ অনিয়ম-দুর্নীতির দায়েও তারা ফেঁসে যাচ্ছেন। তাদেরকে বিচারের মুখোমুখি করা হতে পারে। ফলে এসব প্রকৌশলী কাজে নিয়মিত নন, দেশ ছেড়ে যে কোনো মূহুর্তে পালিয়ে যেতে পারেন। এরই মধ্যে ঘাড়ে মামলা নিয়ে কয়েকজন প্রকৌশলীকে ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো প্রকৌশলী সতী নাথ বসাক। মামলার ফিরিস্তি অনুযায়ী এই প্রকৌশলী ছাত্র-জনতা হত্যায় আর্থিক সহায়তা দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

জানা গেছে, ছাত্র-জনতা হত্যায় সহায়তাকারী এই কর্মকর্তা মামলা খাওয়ার পর গণপূর্ত অধিদপ্তরে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে গণপূর্ত উন্নয়ন উইং এ রিজার্ভে ছিলেন। এরপর এই আসামীকে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ চট্টগ্রাম সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সিভিল) হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি  তার দায়িত্ব পালনে এখনো স্বৈরাচারী মনোভাব ছাড়তে পারেনি বলে জানান গৃহায়ণের একাধিক প্রকৌশলী। তারা জানান, এই প্রকৌশলী একজন স্বৈরাচারের দোসর। তিনি দিনাজপুর বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের প্রভাবশালী সদস্য।

জানা যায়, ক্ষমতাচ্যুত বিগত সরকারের আমলে গণপূর্তের বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতি করে শত শত কোটি টাকার মালিক হওয়া প্রকৌশলীদের একজন এই সতী নাথ বসাক। জুলাই-আগস্টে আন্দোলন দমনে কোটি কোটি টাকা জোগান দেওয়া প্রকৌশলীদেরও একজন তিনি। হত্যা মামলার আসামী সতী নাথ বসাকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন দুদকেও অভিযোগ জমা পড়েছে এবং তা তদন্ত চলছে…।

এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দুর্নীতিতে সামনের সারিতে থাকা এই প্রকৌশলীর দাপট আর আধিপত্যের কাছে সবাই হার মেনে ছিল। তখন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া তো দূরের কথা, কেউ তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতেও সাহস করত না। জুলাই অভ্যুত্থানের পর গণপূর্তের রিজার্ভ প্রকৌশলী থেকে চট্টগ্রাম সার্কেলের গৃহায়ণের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী করায় ক্ষোভে ফুঁসছে খোদ গৃহায়ণের কর্মকর্তারা।

তথ্য সূত্রে জানা গেছে, ছাত্র-জনতাকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করতে যারা পলাতক সরকারকে অর্থ জোগান দিয়ে সহায়তা করেছিল তাদের মধ্যে সতী নাথ বসাক মূখ্য ভূমিকা রেখেছিলেন। এখন তিনি ভোল পাল্টে রাষ্ট্র সংস্কারের কান্ডারি হতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীসহ ১৫ জন প্রকৌশলী ও জাতীর গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের আরও ১ জন প্রকৌশলী হত্যা মামলার আসামী, যারা বর্তমানে গৃহায়ণ ও গণপূর্তের বিভিন্ন প্রকল্পে দায়িত্বে আছেন।

গণপূর্তের এক নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানান, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর ছাত্র-জনতা হত্যাকারী স্বৈরাচারের দোসর এই সতী নাথ বসাককে এখনো বিচারের মুখোমুখি করা হয়নি। এবং অন্য আসামীদের ও অবস্থা একেই রকম।

এদিকে অভিযুক্ত প্রকৌশলীদের বিচারের মুখোমুখি করার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানান গণপূর্তের একাধিক সূত্র। তারা যেকোনো মূহুর্তে গ্রেপ্তার হতে পারেন। তাদের বিরুদ্ধে রাজধানীর পল্টন, রামপুরা ও সাভার থানায় পৃথক হত্যা মামলা হয়েছে। পাশাপাশি ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতেও মামলা হয়েছে। এদের মধ্যে অনেকেই বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সক্রিয় সদস্য। এবং আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে।

সূত্র জানায়, সতী নাথ বসাক হত্যা মামলা থেকে নিজের নাম প্রত্যাহার করতে ভারতীয় ‘র’ এজেন্টের মাধ্যমে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে তদবির চালিয়ে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। তিনি ছিলেন আলোচিত ঠিকাদার জিকে শামীম সিণ্ডিকেটের অন্যতম সদস্য।
আলোচিত জিকে শামীম গণপূর্তের হাজার হাজার কোটি টাকার কাজে কমিশন বাণিজ্য ও সরাসরি ব্যবসায়ী পার্টনার হিসেবে জড়িত ছিলেন এই সতী নাথ বসাক। এত অভিযোগের পরও হত্যা মামলার এই আসামীকে পদোন্নতি দিয়ে গৃহায়ণ চট্টগ্রাম সার্কেলের তত্ত্ববধায়ক প্রকৌশলী করা হয়েছে।

মামলার কাগজপত্র অনুযায়ী, ছাত্র-জনতা হত্যা মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতার, গণপূর্তের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ঢাকা জোন) শামছুদ্দোহা, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (সংস্থাপন) শহিদুল আলম, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ই/এম) আলমগীর হোসেন, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোসলেহ উদ্দিন আহাম্মাদ, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ইলিয়াস আহম্মেদ, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মনিরুল ইসলাম, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সতী নাথ বসাক ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জাকির হোসেন।

এদিকে আছেন— গণপূর্তে নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবীব, নির্বাহী প্রকৌশলী মাহাবুব রহমান, নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ, নির্বাহী প্রকৌশলী সমিরন মিস্ত্রি, নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান, নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুজ্জামান চুন্নু এবং নির্বাহী প্রকৌশলী আমানউল্লাহ আমান।

জানা গেছে , রাজধানীর ঝিগাতলার বাসিন্দা কে এম শাহরিয়ার শুভ বাদী হয়ে হত্যা মামলাটি করেন। তবে গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্ভরযোগ্য সূত্র দাবি করছেন, মামলার আসামী প্রকৌশলীগণ যতটা না সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন তার চেয়ে বেশি আওয়ামী লীগার ছিলেন। ভাব ভঙ্গিতে তারা ছিলেন শেখ হাসিনার চেয়ে বড় আওয়ামী লীগার। মূলত—রাজনৈতিক প্রভাব বলয়ে থেকে প্রতিষ্ঠানে আধিপত্য বিস্তার করেছেন তারা।

রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অনিয়ম-দুর্নীতি করে অঢেল বিত্ত বৈভবের মালিক হয়েছেন বসাকসহ অন্যরা। আর প্রভাব প্রতিপত্তি ধরে রেখে অনিয়ম-দুর্নীতি অব্যাহত রাখার জন্যে স্বৈরাচার সরকারকে টিকিয়ে রাখতে যথেষ্ট চেষ্টা করেছেন। সতী নাথ বসাকরা সরকারি কর্মকর্তা হয়েও রাজনৈতিক কর্মীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। যে কারণে তারা রাজনৈতিক হত্যা মামলার আসামী হয়েছেন বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

মামলা সূত্রে জানা যায়, কে.এম শাহরিয়ার শুভ বাদী হয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে গত ৩১ অক্টোবর এই হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার ফিরিস্তিতে বিস্তারিতভাবে সরকারি এই ১৬ জন কর্মকর্তার রাজনৈতিক পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। তারা প্রত্যেকেই আওয়ামী লীগ সরকারের খুবই আস্থাভাজন ও ঘনিষ্ট লোক ছিলেন বলে মামলার এজহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

জুলাই হত্যা মামলার আসামী প্রসঙ্গে ও অনিয়ম দুর্নীতির বিষয়ে জানার জন্য প্রকৌশলী সতী নাথ বসাকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল রিসিভ করেনি, এবং হোয়াটসঅ্যাপেও ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়ে তার সাড়া পাওয়া যায়নি।

এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গণপূর্ত অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, একটা বড় গণঅভ্যুত্থানে দেশটা স্বাধীন হয়েছে। দেশ সংস্কারের দায়িত্ব ছাত্র-জনতা হাতে নিয়েছে। এখনো যদি চিহ্নিত আওয়ামী লীগের লোকের হাতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের মত সংস্থার দায়িত্ব থাকে তাহলে দেশ সংস্কার কিভাবে হবে? এরা তো এই সুযোগে দেশের যে বাকি কিছু অর্থ আছে তা লুট করে পাচার করে দিবে। এদেরকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা জরুরি।

এসএস/এমএফ

0Shares

আরো সংবাদ