নোয়াখালীর ছেলে হওয়ায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সুপারিশে ২০২২ সালে চট্টগ্রাম জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসাবে যোগ দেন পলাশ চন্দ্র দাস। এই দপ্তরে যোগদানের পর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি এই প্রকৌশলীকে। বিভিন্ন ভুয়া প্রকল্প, দরপত্রে কারসাজি, বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতি, টিকাদারদের নিয়ে সিন্ডিকেট, ঘুষ ছাড়া ফাইল না ছাড়ার মত বিস্তর অভিযোগ উঠেছে এই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে।
সম্প্রতি—দুর্নীতি দমন কমিশন দদকেও পড়েছে লিখিত অভিযোগ। দুদকে দেওয়া অভিযোগে বলা হয়-চট্টগ্রাম জনস্বাস্থ্যের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ চন্দ্র দাস সরকারি কর্মকর্তা হয়েও তিনি ‘মেসার্স আরণ্যক’ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। প্রতিষ্ঠানটি মালিক কাগজে-কলমে তার আত্মীয়ের নাম দেখানো হলেও মূলত মালিক পলাশ।
পলাশ নির্বাহী প্রকৌশলী হিসাবে চট্টগ্রামে পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসাবে খাগড়াছড়ির দায়িত্বে থাকার সময় ‘মেসার্স আরণ্যক’ নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান একচেটিয়া কাজ পেয়েছে। কাজ না করে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। যা তদন্ত করলে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে বলে জানান এই অভিযোগে।
জানা যায়, চট্টগ্রাম জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে (ডিপিএইচই) অর্ধশত কোটি টাকার ১৬টি দরপত্রে (টেন্ডার) ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সুপেয় পানি সরবরাহ প্রকল্পের আওতায় ‘ডাবল ভেসেল আয়রন রিমুভাল সরবরাহ ও সংযোজন’ কাজের ১৬টি দরপত্রের মধ্যে ১৬টিই ‘মেসার্স শামীম ট্রেডার্স’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান হাতিয়ে নিয়েছে।
ডিপিএইচইর কর্মকর্তারা যোগসাজশ করে ‘রেট কোড’ সরবরাহ করায় একটি মাত্র ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হাতিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে। এ ঘটনাকে যা নজিরবিহীন অনিয়ম বলছেন বলছেন স্থানীয় ঠিকাদাররা। একজন মাত্র ঠিকাদারকে কাজ দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন খোদ নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ চন্দ্র দাস।

চট্টগ্রাম জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল ঘিরে পলাশ সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন এসব অনিয়ম দুর্নীতিতে জড়িত। তার সিন্ডিকেটে রয়েছেন প্রাক্কলনিক মারজান বেগম, হিসাব রক্ষক খগেন্দ্র চন্দ্র নাথ, ক্যাশিয়ার শুভ নন্দী, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক এসএম ইকবাল। অফিস সহায়ক মো. আবদুল খালেক হাওলাদার, ও অফিস সহায়ক মো. মিজানুর রহমানসহ দুর্নীতিবাজ ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান বরাবরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন রুম্মান শিকদার নামের এক ঠিকাদার।
চট্টগ্রাম জনস্বাস্থ্যে প্রকৌশলের কর্মকর্তারা জানান, সারা দেশে সুপেয় পানি সরবরাহ প্রকল্পের আওতায় চলছে আয়রন দূরীকরণ ডবল ভ্যাসেল চোঙা সরবরাহের কাজ। ১৬ জুন ৫২ কোটি টাকার কাজকে ১৬টি প্যাকেজে ভাগ করে ওপেন টেন্ডারিং পদ্ধতিতে (ওটিএম) দরপত্র আহ্বান করা হয়। দরপত্রের অংশগ্রহণের শেষ তারিখ ছিল ১৫ জুলাই।
দরপত্র আহ্বান করার সময় বিশেষ কৌশলের আশ্রয় নেওয়া হয়। শর্ত দেওয়া হয়-গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ কাজে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ঠিকাদার অংশ নিতে পারবেন। এতে আরও বেশকিছু জটিল শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়। ফলে এতে বেশির ভাগ ঠিকাদার অংশ নিতে পারেননি। চট্টগ্রাম জেলায় যেসব গভীর নলকূপে মাত্রাতিরিক্ত আয়রন রয়েছে ওখানে বসানো হবে।
জানা যায়, সবকটি দরপত্র মের্সাস শামীম ট্রেডার্স নামে একটি প্রতিষ্ঠান পেয়েছে। এবং প্রতিষ্ঠানকে শিগগিরই কার্যাদেশ দেবে চট্টগ্রাম জনস্বাস্থ্যে প্রকৌশল।
সূত্র জানায়, এই প্রতিষ্ঠানটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। ঘুস ছাড়া কোনো কাজই হয় না এখানে। টেবিল থেকে ফাইল নড়ে না। আর ভুয়া প্রকল্প তৈরি করে ও অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প হাতে নিয়ে সরকারের অর্থ তছরুপ করায় নানা কৌশল তারা ভুয়া প্রকল্প তৈরি করে। কর্মকর্তারা বিভিন্ন উপজেলায় গভীর নলকূপ বসানোর নামে একদফা লুটপাট চালিয়েছে।
আবার বসানোর পর গভীর নলকূপ প্রকল্পের সঙ্গে পানির ট্যাংকি বসানোর নামে আবার দ্বিতীয় দফায় লুটপাট করে। এখন তৃতীয় দফায় পানির ট্যাংকির পানির আয়রন অপসারণের নামে আরেক দফা লুটপাটের আয়োজন করেছে। সেখানে আবার জড়িত আছেন পিডিও।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, এই প্রকৌশলী তার নিজ বাড়ি নোয়াখালীতে করেছেন ৩ কোটি টাকার আলিশান বাড়ি, গুঞ্জন রয়েছে ভারতেও কিনেছেন বাড়ি, নিজ আত্নীয়-স্বজনের নামে আছে ব্যাংকে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা, নোয়াখালীতে কিনেছেন জায়গা-জমি। ঢাকায় আছে ফ্ল্যাট, নিজের বাবা-শ্বশুর-শ্বাশুরি-স্ত্রীর নামে কিনেছেন জায়গা। করেন ঠিকাদারি, শেয়ার মার্কেটে ও আছে শেয়ার। বিদেশেও টাকা পাচারের অভিযোগ আছে এই নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে।
অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে চট্টগ্রাম জনস্বাস্থ্যে প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ চন্দ্র দাসের সঙ্গে মুঠোফোনে কল দেওয়া হলে তিনি কল রিসিভ করে বলেন আমি ঢাকায় আছি, পরে কল দিব বলে লাইন কেটে দেন। এর পর আবার হোয়াটসঅ্যাপে কল দেওয়া হলে তিনি কল রিসিভ করেনি।
প্রিয় পাঠক—পলাশ চন্দ্র দাস ও তার সিন্ডিকেটের অনিয়ম-দুর্নীতির আরও এক্সক্লুসিভ খবর আগামী পর্বে দেখুন…।
এসএস/এমএফ