চট্টগ্রামজুড়ে প্রায় সব কোম্পানির এলপিজি সিলিণ্ডার গ্যাসের হঠাৎ দাম বৃদ্ধি আর সংকটের দোহাই দিয়ে সাধারণ মানুষের পকেট কাটছে খুচরা ব্যবসায়ী ও ডিলাররা, এমন অভিযোগ গত কয়েকদিন ধরেই সাধারণ মানুষের। দেশের জ্বালানি খাতে অব্যবস্থাপনা ও গ্যাস সিন্ডিকেটের দিন দিন দৌরাত্ম্য বন্ধ করা যাচ্ছে না।
তবে—বর্তমানে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বেশি দাম নিয়ে যা হচ্ছে, তাকে এককথায় ‘নৈরাজ্য’ বললেও কম বলা হবে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ৪ জানুয়ারি ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৩০৬ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু খুচরা বাজারে তা ২ হাজার টাকার ওপরে বিক্রি হচ্ছে। চট্টগ্রাম শহরের অনেক জায়গায় এরও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ফলে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপের বোঝা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় ভোক্তাদের অভিযোগ, এটি কোনো স্বাভাবিক সংকট নয়, বরং পরিকল্পিতভাবে গ্যাস ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে। এমন হঠাৎ দামবৃদ্ধি আর লুটপাটে খুচরা বিক্রেতারা ডিলারদের দুষছেন। আবার ডিলাররা সংকট আর পরিবহণে অতিরিক্ত খরচের দোহাই দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছেন।
পুরো চট্টগ্রাম নগর-মহানগর, জেলা-উপজেলা জুড়েই এমন বিস্তর অভিযোগ সাধারণ মানুষদের। বর্তমানে এলপিজি গ্যাসের হঠাৎ দাম বৃদ্ধিতে কার্যত সাধারণ মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। সরকার ও কোম্পানি নির্ধারিত মূল্যকে তোয়াক্কা না করে অসাধু ব্যবসায়ীরা ইচ্ছেমতো দাম বাড়িয়ে একপ্রকার নৈরাজ্যের সৃষ্টি করেছে।
মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে ১২ কেজির একটি গ্যাস সিলিন্ডারের দাম ১২৫০ টাকা থেকে লাফিয়ে বেড়ে ১৮০০ থেকে ২০০০ টাকা, আবার কোথাও কোথাও ২১০০ টাকায় ঠেকেছে। বর্তমানে সিলিন্ডার গ্যাসের সংকট চলছে দোকানগুলোতে। কয়েকটি বড় কোম্পানির গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না কোথাও। বেক্সিমকো, ফ্রেশ, ডেলটা, পেট্রোম্যাক্স ও আইগ্যাসের সিলিন্ডার কিছু এলাকায় মিললেও সেগুলো ১৭৫০ থেকে ১৮০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
গ্যাসের কৃত্রিম সংকটের কারণে রান্নার মতো অতি প্রয়োজনীয় জ্বালানির এই লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ। সব এলাকায় প্রায় একই সময়ে দাম বৃদ্ধি, সরবরাহ কমে যাওয়া এবং ‘গ্যাস নেই’ বলে কৌশলে ভোক্তাদের মন জয় করে- সব মিলিয়ে শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেটের কারসাজির দিকেই ইঙ্গিত করছে সাধারণ মানুষ।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত দামের বাইরে গ্যাস বিক্রি দণ্ডনীয় অপরাধ হলেও হরিরামপুর উপজেলা এবং জেলা শহরে কোনো কার্যকর প্রয়োগ চোখে পড়ছে না। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর কিংবা স্থানীয় প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান না থাকায় ব্যবসায়ীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
চট্টগ্রামের অধিকাংশ ভোক্তা অভিযোগ করে বলেন,
চট্টগ্রাম জুড়েই বাসায় ব্যবহার করেন বসুন্ধরা কোম্পানির গ্যাস সিলিন্ডার। এই কোম্পানির সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। গত কয়েকদিন আগে ১৩৫০ টাকা দিয়ে কিনেছি। এখন দাম চায় ১৮৫০ টাকা, এমন হঠাৎ দামবৃদ্ধিতে আমরা স্তম্ভিত।
তারা আরও জানান, টোটাল গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করতেন, সেটি বাজারে নেই, তাই বাধ্য হয়ে অন্য কোম্পানির সিলিন্ডারসহ গ্যাস নিতে হচ্ছে তাঁকে। দাম ১৯০০ টাকা, সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি। ক্যাশ মেমো দেয় না ব্যবসায়ীরা।
চকবাজারের এক ব্যবসায়ী বলেন, অধিকাংশ কোম্পানির গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। যেগুলো পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোও ডিলারদের কাছ থেকে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। কিন্তু বেশি দাম নিলেও ডিলাররা ক্যাশ মেমো দিচ্ছে না। আমরা সর্বোচ্চ ৫০ থেকে ১০০ টাকা লাভে গ্যাস বিক্রি করছি।
অন্যদিকে কয়েকজন ডিলারের সঙ্গে কথা বলার সময় তাঁরাও গ্যাসের সংকটের কথা স্বীকার করেন। পাইকারি ১৬৫০ থেকে ১৭০০ টাকা ডিলাররা রাখেন, এখন আমরা বাধ্য হয়ে বিক্রি করি। কয়েকদিন আগে প্রতিদিন ১২–১৩টি করে বিক্রি করতাম। এখন দুই-তিনটি বিক্রি করি। বিক্রিও কমে গেছে।
ক্যাশ মেমো ছাড়া পণ্য বিক্রির কোনো সুযোগ নেই জানিয়ে জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আসাদুজ্জামান রুমেল বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। অতিরিক্ত দামে এলপিজি গ্যাস বিক্রির প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
উল্লেখ্য—২০২১ সালের এপ্রিল থেকে প্রতি মাসে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে আসছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। সর্বশেষ গত বছরের ডিসেম্বরে সরকারি ঘোষণায় ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের মূল্য নির্ধারণ করা হয় ১ হাজার ২৫৩ টাকা। চলতি মাসে এখন পর্যন্ত নতুন করে দাম পুনর্নির্ধারণ হয়নি। দু-এক দিনের মধ্যে নতুন দাম নির্ধারণ করবে বলেও জানা গেছে।
এসএস/এমএফ