ইরানের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানে ওয়াশিংটনের খরচের পাহাড় জমেছে। নতুন এক গবেষণা অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম ১০০ ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্রের আনুমানিক ৩.৭ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৪৩ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা) ব্যয় হয়েছে। অর্থাৎ, প্রতিদিন গড়ে ৯০০ মিলিয়ন ডলার খরচ করছে পেন্টাগন। মূলত বিপুল পরিমাণ অত্যাধুনিক গোলাবারুদ ব্যবহারের কারণেই এই বিশাল ব্যয় হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস)-এর বিশ্লেষণে এই আকাশচুম্বী ব্যয়ের তথ্য উঠে এসেছে। শুক্রবার (৬ মার্চ) যুদ্ধ সপ্তম দিনে গড়ালেও যুক্তরাষ্ট্র এখনও স্টিলথ বোমারু বিমান এবং অত্যাধুনিক অস্ত্র ব্যবস্থার মাধ্যমে ইরানে হামলা অব্যাহত রেখেছে।
গবেষক মার্ক কানসিয়ান এবং ক্রিস পার্ক জানিয়েছেন, প্রথম ১০০ ঘণ্টার ৩.৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের মধ্যে মাত্র সামান্য অংশ বাজেটে বরাদ্দ ছিল। বাকি ৩.৫ বিলিয়ন ডলারই ছিল অননুমোদিত বা বাজেটের বাইরের খরচ। এর ফলে, পেন্টাগনকে খুব শিগগির অতিরিক্ত তহবিলের জন্য আবেদন করতে হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই অতিরিক্ত অর্থায়ন ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এটি যুদ্ধবিরোধীদের জন্য একটি বড় হাতিয়ার হতে যাচ্ছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি এবং যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের সমর্থন কমতে শুরু করেছে। এমনকি ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সমর্থক বা মূল ভোটারদের মধ্যেও বিভক্তি দেখা দিচ্ছে, কারণ ট্রাম্প বিদেশি যুদ্ধে না জড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, যুদ্ধের প্রথম ১০০ ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন ধরনের ২ হাজারের বেশি গোলাবারুদ ব্যবহার করেছে। এই ব্যবহৃত গোলাবারুদ আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে বা নতুন করে মজুদ করতে ৩.১ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হবে।
এদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, ইরানে বোমাবর্ষণ আরও নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি করা হবে। এজন্য আরও বেশি ফাইটার স্কোয়াড্রন এবং শক্তিশালী বোমারু বিমান মোতায়েন করা হচ্ছে।
তবে গবেষকরা বলছেন, ভেনেজুয়েলার নিকোলাস মাদুরোকে আটকের অভিযানে খরচ বাজেটের ভেতরে থাকলেও, ইরানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। পেন্টাগনকে জরুরি ভিত্তিতে অতিরিক্ত তহবিল জোগাড় করতে হবে, যা রাজনৈতিকভাবে বেশ কঠিন হবে।
জানা গেছে, পেন্টাগন ইতোমধ্যে ৫০ বিলিয়ন ডলারের একটি সম্পূরক বাজেট প্রস্তাব তৈরি করছে। প্রথম সপ্তাহে ব্যবহৃত টমাহক, প্যাট্রিয়ট মিসাইল এবং থাড ইন্টারসেপ্টর প্রতিস্থাপনের জন্য এই অর্থ চাওয়া হবে। বাজেট ঘাটতি নিয়ে উদ্বিগ্ন আইনপ্রণেতারা এই বিশাল অংকের চাহিদাপত্র দেখে থমকে যেতে পারেন।
অর্থনৈতিক ব্যয়ের পাশাপাশি যুদ্ধে প্রাণহানির সংখ্যাও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। ইরানি রেড ক্রিসেন্টের তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবার থেকে শুরু হওয়া মার্কিন ও ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে ইরানে এ পর্যন্ত ১ হাজার ৩৩২ জন নিহত হয়েছেন। ইউনিসেফ জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে অন্তত ১৮১ জন শিশু রয়েছে।
লেবাননেও ইসরায়েলি হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১২৩ জনে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত অন্তত ৬ জন মার্কিন সেনাসদস্য এবং ১১ জন ইসরায়েলি নাগরিক নিহত হয়েছেন। এছাড়া উপসাগরীয় আরব দেশগুলোতেও এ পর্যন্ত ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।
সূত্র—আল-জাজিরা