দুই মেয়ে বর-কনেসহ নিহত ১৪, সঙ্গে মা-শাশুড়িকে হারিয়েছেন আবদুস সালাম


১৩ মার্চ, ২০২৬ ১:২৮ : পূর্বাহ্ণ

বাগেরহাটের রামপালে নৌবাহিনীর বাস ও বরযাত্রীবাহী মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে এক পরিবারের বর-কনেসহ নিহত ১৪ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাতটায় ভিড়ের মধ্যেই দাঁড়িয়ে ছিলেন কয়রা উপজেলার আমাদী ইউনিয়নের নাকসা গ্রামের বাসিন্দা আবদুস সালাম মোড়ল। চোখে অশ্রু, মুখে অসহায় নীরবতা। এক দিনেই তিনি হারিয়েছেন তাঁর দুই মেয়ে, মা ও শাশুড়িকে।

ক্ষীণ ও জড়ানো কণ্ঠে আবদুস সালাম বলছিলেন, ‘গাড়িতে আমার দুই মেয়ে ছিল, আমার জামাই ছিল, আমার বড় মেয়েটার গতকাল (বুধবার) বিয়ে হয়েছে। ওর নাম মার্জিয়া, আর ছোটটার নাম।’ কথা শেষ করতে পারছিলেন না তিনি। একটু থেমে মাথা নেড়ে আবার বললেন, ছোট মেয়েটার নাম লামিয়া।

বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বিকাল ৪টার দিকে রামপাল উপজেলার খুলনা-মোংলা মহাসড়কের বেলাইব্রিজের কাছে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতদের সবাই মাইক্রোবাসের যাত্রী বলে নিশ্চিত করেন বাগেরহাটের কাটাখালী হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাফর আহমেদ।

বুধবার রাতে মার্জিয়া আক্তারের (মিতু) বিয়ে হয়। তাঁর শ্বশুরবাড়ি বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার শেলাবুনিয়ায়। বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বরপক্ষ মাইক্রোবাসে করে নববধূকে নিয়ে মোংলার উদ্দেশে রওনা হয়। বিকেলে দুর্ঘটনার খবর পান আবদুস সালাম। চারটার দিকে রামপাল উপজেলার বেলাইব্রিজ এলাকায় খুলনা-মোংলা মহাসড়কে ওই মাইক্রোবাসের সঙ্গে নৌবাহিনীর একটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে মাইক্রোবাসের আরোহী বর-কনেসহ ১৪ জন নিহত হয়েছেন।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ওই দুর্ঘটনায় মার্জিয়া আক্তার, তাঁর ছোট বোন লামিয়া আক্তার, দাদি রাশিদা বেগম ও নানি আনোয়ারা বেগম নিহত হয়েছেন। মিতু নাকসা আলিম মাদ্রাসার আলিম প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।

মার্জিয়া আক্তারের মামা আবু তাহের বলেন, কয়রার নাকসা গ্রামে বুধবার রাতে মার্জিয়ার বিয়ে হয়। বৃহস্পতিবার নববধূকে নিয়ে বরযাত্রীদের মাইক্রোবাসটি মোংলার শেলাবুনিয়া এলাকায় শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশে রওনা দেয়। রামপালের কাছে পৌঁছালে দুর্ঘটনা ঘটে।

নিহতরা হলেন— বর সাব্বির (৩০), নববধূ মারজিয়া আক্তার মিতু (২৫), মিতুর নানী আনোয়ারা (৭০), দাদি রাশিদা বেগম (৭৫), বোন লামিয়া (১২), বরের পিতা আব্দুর রাজ্জাক (৭০), মা আঞ্জুমান বেগম (৬০), বরের ভাবি পুতুল (৩৫), পুতুলের ছেলে আলিফ (১২), বরের বোন ঐশি (৩০), ঐশির স্বামী সামিউল, আব্দুল্লাহ সানি (১২) দেড় বছরের শিশু ইরাম ও মাইক্রোবাসের চালক নাঈম (৪০)।

নিহতদের মধ্যে ১০জনের লাশ খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রয়েছে বলে নিশ্চিত করেন হাসপাতালের ইমারজেন্সি মেডিক্যাল অফিসার ডা. মেহনাজ মোশাররফ। এছাড়া নিহত বাকি চারজনের লাশ রামপাল উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রয়েছে। এদের মধ্যে দুজন পুরুষ ও দুজন নারী। গুরুতর আহত আরেকজন খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

জানা গেছে, বরযাত্রীরা বিয়ের পর মাইক্রোসে খুলনার কয়রা উপজেলার নাকশা গ্রাম থেকে নববধূ মারজিয়া আক্তার মিতুকে নিয়ে বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার শ্যাওলাবুনিয়া গ্রামে বরের বাড়িতে ফিরছিলেন। পথিমধ্যে রামপাল উপজেলার খুলনা-মোংলা মহাসড়কের বেলাইব্রিজের কাছে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে।

প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন জানান, বিকাল ৪টার দিকে মোংলা থেকে ছেড়ে আসা নৌবাহিনীর বাসটি বেলাইব্রিজ এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা মোংলাগামী মাইক্রোবাসটির সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই তিনজন নারীসহ চারজনের মৃত্যু হয়। দুর্ঘটনায় উভয় গাড়ির সামনের অংশ দুমড়ে-মুচড়ে যায়।

খুলনা হাইওয়ে পুলিশ সুপার মো. জাকারিয়া বলেন, দুর্ঘটনায় মোট ১৪ জন নিহত হয়েছে। এরমধ্যে ১০ জনের লাশ খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ও বাকি চারজনের লাশ রামপাল উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রয়েছে। এছাড়া একজন খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তার অবস্থাও আশঙ্কাজনক।

এসএস/এমএফ

0Shares

আরো সংবাদ