রোগীর জীবন নিয়ে খেলছে এলবিয়ন গ্রুপের ক্যাপসুল ট্যাবলেট, ঝুঁকির মুখে জনস্বাস্থ্য!


নিজস্ব প্রতিবেদক ৯ এপ্রিল, ২০২৬ ১:৫৪ : অপরাহ্ণ

জাতীয় পরীক্ষাগারের পরীক্ষা রিপোর্টে বলছে এলবিয়ন গ্রুপের একটি অ্যান্টিবায়োটিক ক্যাপসুলে মূল উপাদান অ্যামোক্সিসিলিনের অস্তিত্বই নেই। সেখানে পাওয়া গেছে অজানা সাদা দানাদার পাউডার, যা ল্যাব প্রতিবেদনে সরাসরি “মানবহির্ভূত” বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (আইপিএইচ)-এর ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরির বিশ্লেষণে এই তথ্য উঠে আসে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মিমক্স ৫০০ এমজি (অ্যামোক্সিসিলিন) ক্যাপসুলের ব্যাচ নম্বর ০১১২১২ পরীক্ষায় দেখা গেছে, ক্যাপসুলে অ্যামোক্সিসিলিন নেই, বরং রয়েছে অজানা সাদা পাউডার। ক্যাপসুলের গড় ওজন পাওয়া গেছে ৩৯০.২ মি.গ্রা।

ল্যাব প্রতিবেদনের ভাষায় “ইহা মানবহির্ভূত অ্যামোসিলিন শনাক্ত হয়নি” এই তথ্য প্রকাশের পর জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। চিকিৎসকরা যে ওষুধ রোগীদের দিচ্ছেন, সেখানে যদি মূল অ্যান্টিবায়োটিকই না থাকে, তাহলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ তো দূরের কথা, রোগীর জীবনই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে?

ইনডোমেথাসিনেও গুরুতর ঘাটতি

শুধু অ্যান্টিবায়োটিক নয়, এই গ্রুপের ব্যথানাশক ওষুধেও ধরা পড়েছে বড় ধরনের অমিল। পরীক্ষায় ইনডোমেথাসিন ক্যাপসুলে ঘোষিত মাত্রা ২৫ মি.গ্রা হলেও পাওয়া গেছে ২৪.১১ মি.গ্রা ও ২২.৫৯ মি.গ্রা, যা আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ১০-১৫ শতাংশ পর্যন্ত ঘাটতি।

এবিষয়ে নথি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নাঈম গোলদার বলেন, এলবিয়ন গ্রুপের বিরুদ্ধে যথাযথ প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) আশরাফ হোসেন জানান, নমুনা সংগ্রহ করে নতুন করে আবার পরীক্ষা করা হচ্ছে।

এদিকে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, জাতীয় পরীক্ষাগারে অ্যান্টিবায়োটিকে অ্যামোক্সিসিলিন নেই এটাই কি এলবিয়নের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়?

নিষিদ্ধ ডিসপ্রিনের ছায়ায় ‘এসপ্রিন’

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত মাথাব্যথার ওষুধ ডিসপ্রিন বন্ধ হলেও এলবিয়ন গ্রুপ বাজারে এনেছে প্রায় একই ধরনের একটি ওষুধ যার নাম—‘এসপ্রিন’ ট্যাবলেট। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, এই ট্যাবলেট পানিতে দ্রবীভূতই হয় না, যা এর কার্যকারিতা ও মান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে স্বাস্থ্য সেবায়।

তথ্য সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রামের রহমতনগর, সীতাকুণ্ডে অবস্থিত এলবিয়ন ল্যাবরেটরীজ লিমিটেড (উৎপাদন লাইসেন্স নম্বর—জৈব-১০৯ ও অজৈব-১৯১) দীর্ঘদিন ধরে নিম্নমানের ও আন্ডাররেট ওষুধ বাজারজাত করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। জানা গেছে লেবেলে মুদ্রিত মূল্যের তুলনায় অস্বাভাবিক কম দামে ওষুধ বিক্রি করা হচ্ছে পাইকারি বাজারে। যা দেখেও কেউ দেখছে না।

এলবিয়ন গ্রুপের ঔষধ গুলো হলো:

ডমপ (ডমপেরিডোন ১০ মি.গ্রা) ২০০ টাকার বক্স বিক্রি করে ৬৫ টাকায়, প্যানটোপ্রাজল-২০—২১০ টাকার বক্স বিক্রি ৭০ টাকায়, ডাইক্লোফেনাক SR ৩০০ টাকার বক্স বিক্রি করে ৯০ টাকায়, সেটিরিজিন ২৫০ টাকার বক্স বিক্রি করে ৭০ টাকায়, ডেসলোরাটাডিন ৪০০ টাকার বক্স বিক্রি করে ৯৫ টাকায়, ডেক্সামেথাসন ২০০ টাকার বক্স বিক্রি করে ৬৫ টাকায়, ক্যালসিয়াম-ডি ৩৬০ টাকার বক্স বিক্রি করে ৯৫ টাকায়, লটিল-২০— ৪০০ টাকার বক্স বিক্রি করে ১০০-১১০ টাকায়, লটিল-৪০ — ২৪০ টাকার বক্স বিক্রি করে ৯০ টাকায়, নাইট্রাম — ১০০ টাকার বক্স বিক্রি করে ৩০ টাকায়, টলসিড — ২৪০ টাকার বক্স বিক্রি হয় ১১০-১২০ টাকায়, ন্যাপ্রোক্সেন প্লাস — ৩৬০ টাকার বক্স বিক্রি করে ১৪০-১৫০ টাকায়।

মুলত এসব ওষুধ চট্টগ্রামের হাজারীগলি ও রাজধানীর মিটফোর্ড এলাকার হাজী রানী পাইকারি মেডিসিন মার্কেট সহ আশেপাশের মার্কেটগুলোতে অহরহ বিক্রি হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া একই এমএ নম্বর দুই ওষুধে ব্যবহারেরও অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে । যেমন সেটিরিজিন ১০ মি.গ্রা এবং ডেসলোরাটাডিন ৫ মি.গ্রা—এই দুই ভিন্ন ওষুধে একই এমএ নম্বর ব্যবহার করা হচ্ছে।

অতীতেও ছিল নিষেধাজ্ঞা 

২০০৮ সালে ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরি এলবিয়নের চারটি ওষুধের উৎপাদন ও বাজারজাত সাময়িক স্থগিত করা হয়েছিল। সেগুলো হলো— ডাইক্লোফেনাক টিআর ক্যাপসুল, ডি-ক্যাপসুল (ডক্সিসাইক্লিন), গ্লাইসোফুলভিন ট্যাবলেট, এলফ্লাম (আইবুপ্রোফেন)।

এদিকে ২০০৯ সালে আবারও পলিভিট সিরাপ (ভিটামিন বি কমপ্লেক্স) নিম্নমানের হওয়ায় উৎপাদন ও বাজারজাত বন্ধ করা হয়। এছাড়া একবার চট্টগ্রামের চাঁদগাঁও ভ্রাম্যমাণ আদালত কারখানাটি সিলগালা করেছিল। পরে (ডিজিডিএ)-এর অনুমতি নিয়ে সীতাকুণ্ডে নতুন করে স্থাপন করা হয় কারখানাটি। তবুও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে মানবহির্ভূত অ্যান্টিবায়োটিক (জিএমপি) লঙ্ঘন, নিম্নমানের ওষুধ তৈরি করে মানবদেহের চরম ক্ষতি করছে এলিবিয়ন গ্রুপ।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, এসব ঘটনার পরও এলবিয়ন গ্রুপ কীভাবে নিয়মিত ঔষধ উৎপাদন ও বিপণন করে যাচ্ছে? এতদিন কী করছিল ঔষধ প্রশাসন? স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে (ডিজিডিএ) আরও আগেই ব্যবস্থা নিলে বাজারে নিম্নমানের ওষুধের বিস্তার ঘটাতে পারত না এলবিয়ন গ্রুপের রাইসুল উদ্দীন সৈকত।

অভিযোগ ও ভেজাল ঔষধ তৈরির বিষয়ে জানার জন্য এলবিয়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান রাইসুল উদ্দীন সৈকতের সঙ্গে যোগাযোগ করে হলে তিনি কল রিসিভ করেনি, এবং হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।

এসএস/ফোরকান

0Shares

আরো সংবাদ