বিষয় :

শৈত্যপ্রবাহে কাঁপছে সারাদেশ


৬ জানুয়ারি, ২০১৮ ৮:৪১ : পূর্বাহ্ণ

সকালেরসময় নিজস্ব প্রতিবেদক :: শীতের তীব্রতা বাড়ছে। পৌষের শেষার্ধে এসে অনেকটা জোরেশোরে বইছে শীতল হাওয়া। কয়েক দিন ধরেই দেশের বিভিন্ন স্থানের ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে।

এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, শৈত্যপ্রবাহ থাকতে পারে আরও চার থেকে পাঁচ দিন। দেশের উত্তরাঞ্চলে আরও আগেই পৌষের উপস্থিতি টের পাওয়া গেছে। তবে রাজধানী ঢাকায় শীতের উপস্থিতি ছিল কম। পৌষের শুরুতে ঢাকায় রাতের তাপমাত্রা কিছুটা কমলেও দিনের তাপমাত্রা ছিল স্বাভাবিক। তবে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার আগে থেকেই ঢাকায় শীতের তীব্রতা দেখা দেয়।

আবহাওয়ার বিপর্যয় ও পরিবেশ দূষণসহ নানা কারণে শীতে অনেক ধরনের রোগব্যাধি দেখা দিয়েছে। অনেকেই ভুগছেন নাক, কান, গলার বিভিন্ন সমস্যায়। কনকনে বাতাসের কারণে ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে যায়।
আবহাওয়া অধিফতরের আবহাওয়াবিদ হাফিজুর রহমান শুক্রবার (৫ জানুয়ারি) সাংবাদিকদের বলেন, জানুয়ারি মাসে শীত পড়বে, এটা স্বাভাবিক। চট্টগ্রাম বাদে সারা দেশেই শৈত্যপ্রবাহ আছে। এটা আরও ৪ থেকে ৫ দিন থাকবে। তাপমাত্রা ঢাকায় আর কমার আশঙ্কা নেই। তিনি আরও বলেন, দেশের শ্রীমঙ্গল অঞ্চলসহ রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা ও খুলনা বিভাগের ওপর দিয়ে মৃদু অর্থাৎ ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং মাঝারি ধরনের অর্থাৎ ৬ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার খুলনা বিভাগের চুয়াডাঙ্গায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৬.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়। এদিন যশোরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৭.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
শুক্রবার (৫ জানুয়ারি) যশোরে এ তাপমাত্রা আরও কমে দাঁড়ায় ৭.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা দেশের সর্বনিম্ন। যশোরে তিন দিনে ৬ থেকে ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা কমেছে। মঙ্গলবার এ তাপমাত্রা ছিল ১৩.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

আবহাওয়ার দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে আবহাওয়া অধিদপ্তরের উপপরিচালক মাহনাজ খান জানান, চলতি মাসে দেশের উত্তর, উত্তর-পূর্বাঞ্চল, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলে একটি মাঝারি এবং তীব্র অর্থাৎ ৪ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। তবে সার্বিকভাবে এ মাসের গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিক থাকতে পারে। জানুয়ারি মাসে দেশের উত্তর, উত্তর-পূর্বাঞ্চল, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলে এবং নদনদী অববাহিকায় মাঝারি অথবা ঘন কুয়াশা এবং অন্যত্র হালকা অথবা মাঝারি কুয়াশা পড়তে পারে।

মাহনাজ খান আরও জানান, ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথমার্ধে দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের ওপর দিয়ে একটি মৃদু এবং মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহ হতে পারে। ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথমার্ধে দেশের নদনদীর অববাহিকা ও অন্যত্র সকালের দিকে হালকা অথবা মাঝারি ধরনের কুয়াশা থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসের শেষদিকে দিন ও রাতের তাপমাত্রা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাবে।

এদিকে, শিশুরোগ বিশেষজ্ঞরা জানান, শীতে সাধারণত শিশু ও নবজাতকরা ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হয় বেশি। তবে শিশুদের বেলায় তিনটি বিষয়ে খেয়াল রাখার প্রয়োজন রয়েছে। এগুলো হলো- যদি কোনো শিশুর সর্দি, জ্বরের সঙ্গে কাশি, বুকে ঘ্যাড় ঘ্যাড় শব্দ হয় আর যদি দেখা যায় শিশুর শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তবে অবশ্যই ওই শিশুকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে। কারণ ঠান্ডা-জ্বরের সঙ্গে বুকে ঘ্যাড় ঘ্যাড় ও শ্বাসকষ্ট হওয়াটা নিউমোনিয়ার লক্ষণ। ভাইরাল ইনফেকশন ও ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ থেকে নিউমোনিয়া হওয়ার প্রবণতা বেশি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের মেডিসিন অনুষদের ডিন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ বলেন, শীতের সময় দেখা দেয় ‘কমন কোল্ড’ জনিত রোগ। এগুলো হচ্ছে- সর্দি, হাঁচি, কাশি, জ্বর, মাথাব্যথা, গা মেজমেজ করা ইত্যাদি। এতে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। দুই-তিন দিন পর এসব এমনিতেই ভালো হয়ে যায়। তিনি আরও বলেন, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যাদের কম তাদের চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। তবে এ সময় হাঁপানি রোগীদের কষ্ট অনেক বেড়ে যায়। তাদের ক্ষেত্রেও কমন কোল্ড দেখা দিতে পারে। এক্ষেত্রে দেরি না করে রোগীকে দ্রুত চিকিৎসক দেখাতে হবে।

স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালের নাক-কান-গলা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মনিলাল আইচ লিটু বলেন, আমাদের দেশে শীতে সাধারণত সাইনোসাইটিস, অ্যালার্জিক রাইনাইটিস (নাক দিয়ে পানি পড়া), অ্যালার্জির সমস্যা, টনসিলাইটিস, গলা বসে যাওয়া, নাক দিয়ে রক্ত পড়া, কানের প্রদাহের মতো সমস্যা বেড়ে যায়। যখনই ঋতু পরিবর্তন হয় অর্থাৎ গরম থেকে শীত আসতে শুরু করে তখনই অনেকের সমস্যা হয়।

এদিকে শীতের আগমনকে কেন্দ্র করে ব্যাহত হচ্ছে জনজীবন। শীতের প্রকোপে নিম্ন আয়ের মানুষকে পোহাতে হচ্ছে দুর্বিষহ পরিস্থিতি। ঠান্ডার কারণে কাজে যেতে পারছেন না অনেকে, আগুন জ্বালিয়ে কিছুটা উষ্ণতার ছোঁয়া পেতে মরিয়া এসব মানুষ।

রংপুর জেলায় বইছে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ। শীত মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসন এখনও তেমন প্রস্তুতি নেয়নি। পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র না থাকায় খেটে খাওয়া ও দরিদ্র মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। বিশেষ করে চরাঞ্চল ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ বেশি। এছাড়া শীতজনিত রোগবালাইও বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। রাস্তাঘাটে যানবাহন চলাচল করছে ধীরগতিতে। দুর্ঘটনার আশঙ্কা নিয়ে দিনের বেলায়ও দূরপাল্লার যানবাহনগুলো চলছে হেডলাইট জ্বালিয়ে।

রংপুরের আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ মোহাম্মদ আলী জানান, বর্তমানে এ অঞ্চলে মাঝারি শৈতপ্রবাহ বইছে- এটা বলা যেতে পারে। দুই-একদিনের মধ্যে এ অঞ্চলের তাপমাত্রা আরও কমবে। পশ্চিমা বাতাসের ফলে বিরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।

আবহাওয়া অফিস সূত্র জানায়, শুক্রবার (৫ জানুয়ারি) রংপুরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১০ ডিগ্রি ও সর্বোচ্চ ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। একটু দেরিতে হলেও এ অঞ্চলে শীত পুরোপুরি শুরু হয়েছে। এবার অন্য যে কোনো বছরের তুলনায় শীতের তীব্রতা একটু বেশি হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা। অনেক স্থানে দুপুর পর্যন্ত সূর্যের মুখ দেখা যাচ্ছে না। কোথাও দেখা গেলে, তা ছিল খুব অল্প সময়ের জন্য।

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, শীতের কারণে আগের চেয়ে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। শীতজনিত রোগে আক্রান্ত সবচেয়ে বেশি রোগী শিশু ও বৃদ্ধরা। বৃদ্ধরা হাঁপানিসহ বিভিন্ন রোগে এবং শিশুরা নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে।
রংপুর জেলা সিভিল সার্জন আবু মোহাম্মদ জহিরুল হাসান জানান, প্রতি বছরই শীত মৌসুম এলে রোগবালাই কিছুটা বাড়ে। এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। শীতজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দিতে বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

বরিশালসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলে বৃহস্পতিবার থেকে কনকনে শীত বিরাজ করছে। স্থানীয় আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, কয়েক দিন ধরে বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলে তাপমাত্রা ক্রমেই কমছে। শুক্রবার সকালে সর্বনিম্ন ৯.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। আগের দিন বৃহস্পতিবার বরিশালে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১০.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

কুড়িগ্রামে তিন দিনের টানা শৈত্যপ্রবাহে ছিন্নমূল মানুষসহ জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ঘন কুয়াশা আর শীতের তীব্রতায় মানুষের দৈনন্দিন কাজকর্ম স্থবির হয়ে পড়েছে। নিতান্তই প্রয়োজন ছাড়া কর্মজীবী মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। গরম কাপড়ের অভাবে শীতকষ্টে ভুগছেন অনেক হতদরিদ্র পরিবারের শিশু, বৃদ্ধসহ নিম্ন আয়ের কর্মজীবী মানুষ। শীতে উষ্ণতা নিতে শিশু-বৃদ্ধসহ সবাই খড়কুটা জ্বালিয়ে শীতকষ্ট নিবারণের চেষ্টা করছেন। সদর হাসপাতালসহ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডায়রিয়া, জ্বর ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত রোগীরা চিকিৎসা নিচ্ছেন। জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মোহাম্মদ ফেরদৌস খান জানান, এরই মধ্যে জেলার ৯ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে শীতবস্ত্র পাঠানো হয়েছে।

উপকূলীয় দ্বীপ জেলা ভোলার মানুষ কয়েক দিন ধরে তীব্র শীতে কাঁপছেন। প্রচণ্ড শীতে নিম্ন আয়ের সাধারণ মানুষ রয়েছেন চরম বিপাকে। শীতের প্রকোপে ঘর থেকে বের হতে পারছেন না দিনমজুর আর খেটে খাওয়া মানুষ। জেলার হাসপাতালগুলোয়ও শীতজনিত রোগীদের ভিড় বাড়ছে। এদিকে জেলায় শুক্রবার মৌসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৭.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ভোলার জেলা প্রশাসক মোঃ সেলিম উদ্দিন জানান, শীতার্ত মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে এরই মধ্যে শীতবস্ত্র বিতরণ শুরু হয়েছে। জেলা প্রশাসন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের সমন্বয়ে প্রতিটি এলাকায় শীতবস্ত্র পৌঁছানো হবে।

ঘন কুয়াশা আর হিমেল হাওয়ায় স্থবির হয়ে পড়েছে চুয়াডাঙ্গার জনজীবনও। কয়েক দিন থেকেই ঘন কুয়াশা আর হিমেল হাওয়ার কারণে এ অঞ্চলে জেঁকে বসেছে শীত। রাতে বৃষ্টির মতো গুঁড়ি গুঁড়ি কুয়াশা, দিনে দেখা নেই সূর্যের।

ট্যাগ :

আরো সংবাদ