বিষয় :

ভয়াল ২৯ এপ্রিল আজ


সকালের-সময় রিপোর্ট  ২৯ এপ্রিল, ২০২১ ৩:২৪ : পূর্বাহ্ণ

আজ ভয়াল ২৯ এপ্রিল। এই দিনে স্বজনহারা মানুষেরা বুকে মাটি চাপা দিয়ে পার করল দীর্ঘ ৩১টি বছর। উপকূলীয় দ্বীপ উপজেলা মহেশখালীর লোকজন এখনো শিউরে উঠে ১৯৯১ সালের ভয়াল ২৯ এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড়ে বিধ্বস্ত জনজীবনের কথা মনে পড়লে।

এই দিনে দ্বীপ-উপজেলা মহেশখালীর ওপর বয়ে যায় স্মরণকালের এক ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়। প্রায় ৮ ঘণ্টা স্থায়ী ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবে দ্বীপের নারী-পুরুষ ও অসংখ্য শিশুসহ প্রাণ হারান ১০ হাজারের অধিক মানুষ। সে সাথে গৃহপালিত পশু মহিষ, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি ও জীবজন্তুর মৃত্যুসহ বিধ্বস্ত হয় সমস্ত কাঁচা ও পাকা ঘরবাড়ি, অফিস-আদালত, রাস্তাঘাট ও দ্বীপরক্ষার বেড়িবাঁধ। মুহূর্তেই লণ্ডভণ্ড করে দেয় দ্বীপবাসীর স্বপ্ন।

এই মহাদুর্যোগের ৩১টি বছর অতিবাহিত হলেও দ্বীপবাসীর মধ্যে এখনো কাটেনি শোকের ছায়া। ১৯৯১ সালের আগের প্রজন্মের কাছে বিভীষিকাময় একটি রাত, এই প্রজন্ম বয়সকাল শেষ হয়ে গেলে এটি রূপকথার গল্প হিসেবেও পরবর্তী প্রজন্মকে জানতে শেখাবে।

বাংলা সনের চৈত্র-বৈশাখ মাসের তীব্র গরমে মাঠঘাট ফেটে চৌচির ছিল ওই ঘূর্ণিঝড়ের সময়। শুকনো ছিল খাল, বিল, নদীনালা ও পুকুর। সারা দিন আকাশে মেঘ জমাছিল, গুঁড়িগুঁড়ি হালকা বৃষ্টিও পড়ছিল সারা দিন। সপ্তাহের সোমবার দিন ফুরিয়ে সন্ধ্যা যতই ঘনিয়ে আসছে, বাতাসের একটানা গতিবেগ ততই বাড়তে থাকে।

রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির স্বেচ্ছাসেবিরা প্রচার করতে থাকে দুর্যোগের খবর। কিন্তু ভুক্তভোগীরা কেউ পাত্তাই দিলো না- করল অবহেলা। ওই অবহেলাই কাল হলো অনেকের। দীর্ঘ প্রায় ৩১ বছর পর এত ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড়/তুফান হতে পারে তা মানুষ বুঝতে পারেনি। এলাকার বয়োবৃদ্ধরা বলতে শুনেছি ১৯৯১ সালের আগে ঘূর্ণিঝড়টি হয়েছিল ১৯৬০ সালে। সে কারণে তেমন আত্মরক্ষার চেষ্টা করেনি মানুষ।

সন্ধ্যা ৭টার দিকে শুরু হয় বাতাসের প্রচণ্ড ধমকা হাওয়া। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে বৃষ্টি ও তীব্র ধমকা হাওয়া শুরু হয়ে গেলে; কোথাও বেরুবার কায়দা ছিল না মানুষের। ঠিক রাত সাড়ে ৯টার দিকে হঠাৎ দ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ থেকে তীব্র গতিতে লোকালয়ে ওঠে আসে বঙ্গোপসাগরের লোনাপানি।

সাগর আর তীর একাকার হয়ে যায় ওই ঘূর্ণিঝড়ে। তখন ঘরের ছাদ ও গাছপালাসহ যে যেখানে পায় আশ্রয় নেয় মানুষ। ঝড় আর বাতাসের তীব্রগতিতে মানুষ ও পশুপাখিদের আশ্রয়স্থল থেকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় ঘূর্ণিঝড়ের পানি। এভাবে সলিল সমাধি ঘটে দ্বীপের কয়েক হাজার মানুষের।

সূত্রে জানা যায়, ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে মহেশখালী উপজেলার ধলঘাট, মাতারবাড়ি ও কুতুবজোম ইউনিয়ন লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় এবং প্রায় ১০ হাজারের অধিক মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়।

এ সময় বসতবাড়ি ভেঙে গিয়ে গৃহহারা হয়ে পড়েন কুতুবজোম, মাতারবাড়ি ও ধলঘাটা ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষ। পরে ১৯৯৭ ও ৯৮ সালে আরো দু’টি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে কক্সবাজারের এই উপকূলে। এরপর সিডর, বিজলী ও আইলা, রোয়ানু, মোরা আঘাত হানে।

এতে অন্তত ১০ থেকে ১৫ হাজার কাঁচা ঘরবাড়ি ভেঙে যায়। এরপর অনেকেই পুনরায় বসতবাড়ি তৈরি করে বসবাস শুরু করলেও যাদের সম্বল নেই, তারা বেড়িবাঁধের বাইরের ঢালু ও চর এলাকায় বাঁশের তৈরি ছোট্ট ছোট্ট ঝুপড়ি ঘরে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে। বর্তমান সরকার গৃহহারা ওই সব মানুষকে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে আশ্রয়ণ প্রকল্প তৈরি করে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করছে।

প্রতি বছর ঘুরে ফিরে ২৯ এপ্রিল আসলে বিভীষিকাময় কালরাত্রির কথা মনে পড়ে এবং দীর্ঘ ৩১টি বছর বুকে ঘূর্ণিঝড়ের দুঃসহ স্মৃতি লালন করছে স্বজন হারা মানুষ।

এসএস

Print Friendly, PDF & Email

আরো সংবাদ