দুর্নীতি—দুদকের জালে ফেঁসে গেলেন টিআই মীর নজরুল!


সকালের-সময় রিপোর্ট  ১৯ নভেম্বর, ২০২১ ১:৪২ : পূর্বাহ্ণ

চাকরিরত অবস্থায় নগরীর হালিশহর এলাকায় ৩৫ লাখ ৫৭ হাজার ৮১৬ টাকা মূল্যে ফ্ল্যাট স্ত্রীর নামে ক্রয় করেন জেলা পুলিশের ট্রাফিক পরিদর্শক(টিআই) মীর নজরুল ইসলাম। কিন্তু দুদককে জমা দেয়া সম্পদ বিবরণীতে অর্থের এই উৎস দেখাতে পারেননি তিনি।

একই স্থানে ২৬ লাখ ২২ হাজার ৯৫৭ টাকা দিয়ে আরেকটি ফ্ল্যাট ক্রয় করলেও তার জ্ঞাত আয়ের তথ্য দেয়নি দুদকের কাছে। চট্টগ্রাম-ঢাকা ও নিজ জেলা টাঙ্গাইলে কোটি টাকারও বেশি সম্পদ অর্জন করলেও তার বৈধ আয় নেই পুলিশ পরিদর্শক নজরুলের।

শুধু তাই নয়—কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন করলেও তা দুদকের কাছে গোপন করেন পুলিশের একসময়ের দাপুটে এ কর্মকর্তা। যদিও দুদকের অনুসন্ধানে ওঠে আসে, জেলা পুলিশের টিআই থাকাকালেই এসব অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন টিআই নজরুল।

তবে—শেষ পর্যন্ত রক্ষাই হয়নি তার। দুদকের দীর্ঘ অনুসন্ধানে দালিলিক প্রমাণ পাওয়ায় সাবেক জেলা ট্রাফিক পুলিশ পরির্দশক ও সীতাকুণ্ডের বার আউলিয়া হাইওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মীর নজরুল ইসলাম ও তার স্ত্রী শাহানা সুলতানার বিরুদ্ধে দুটি মামলা করেছে দুদক।

গতকাল বুধবার দুপুরে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সমন্বিত জেলা কার্যালয় চট্টগ্রাম ১কে মামলা দুটি দায়ের করা হয়। একই কার্যালয়ের উপ পরিচালক লুৎফুল কবীর চন্দন বাদী হয়ে পৃথকভাবে মামলা দুটি দায়ের করেন। একটিতে শুধুমাত্র টিআই নজরুল ইসলামকে আসামি করা হয়। অন্যটিতে নজরুল ও তার স্ত্রী শাহানা সুলতানাকে আসামি করা হয়।

দুটি মামলায় নজরুল দম্পত্তির বিরুদ্ধে ১ কোটি ১৭ লাখ ৯২ হাজার ১৮ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের দালিলিক প্রমাণ পাওয়া যায়। এছাড়া দুদকের কাছে দেয়া সম্পদ বিবরণীতে ৯৯ লাখ ৮৫ হাজার ১১৯ টাকার অর্থ গোপন করেন স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই।

দুদক সূত্রে জানা যায়—২০১৮ সালের শেষ দিকে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের সাবেক পুলিশ পরিদর্শক (শহর ও যানবাহন) মীর নজরুল ইসালামের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে অনুসন্ধানে নামে দুদক। অভিযোগে বলা হয়, চট্টগ্রাম জেলা ট্রাফিক বিভাগ নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন নজরুল। দীর্ঘদিন চট্টগ্রামে থাকার কারণে ট্রাফিক বিভাগে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটও গড়ে তোলেন তিনি।

সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মাসিক স্লিপ বাণিজ্য, গাড়ি মালিকদের মাসিক ও বাৎসরিক স্লিপ দিয়ে টাকা আদায়, বিভিন্ন গাড়ি মালিক-শ্রমিক সংগঠনের কাছ থেকে নামে বেনামে অর্থ আদায় করতেন এ সিন্ডিকেটটি। যাদের প্রতিমাসে আয় হতো কোটি টাকার উপর। দীর্ঘ এক বছরের অনুসন্ধান শেষে প্রাথমিক সম্পদের তথ্য পাওয়ায় নজরুল ও তার স্ত্রীর সম্পদ বিবরণী দাখিলের নির্দেশ দেন দুদক।

দুদক জানায়, ২০১৯ সালের ২৮ ও ২৯ এপ্রিল মাসে দুই জনেই তাদের সম্পদ বিবরণীতে তাদের সম্পদ থাকার ঘোষণা দেন। যাতে দুই জনের কয়েক কোটি টাকার সম্পদ পাওয়া যায়। এরমধ্যে কয়েকটি সম্পদ গোপন করেন নজরুল দম্পত্তি। তাছাড়া যে সম্পদ গুলো ঘোষণা দিয়েছেন, তার বৈধ কোন আয় দেখাতে পারেননি কেউই।

দুদকের মতে—এসব অর্থই ট্রাফিক বিভাগে থাকাকালে অবৈধ অর্থ দিয়েই অর্জন করেন নজরুল। যা দিয়ে নিজ স্ত্রীর নামেও ক্রয় করা হয় সম্পদ।

একটি মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, মীর নজরুল ইসলাম ৩০ লাখ ৬৭ হাজার ৩৪৩ টাকার জ্ঞাত আয়ের সাথে অসংগতিপূর্ণ সম্পদের মালিকানা অর্জন করে নিজ দখলে রেখে এবং ৩৮ লাখ ৪ হাজার ৩৭৬ টাকার মূল্যের সম্পদের তথ্য গোপন করে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করার দায়ে তার বিরুদ্ধে দুদক আইনের ২০০৪ সালের ২৬ (২), ২৭ (১) ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা রুজু করা হল।

অপর মামলার এজাহারে বলা হয়, শাহানা সুলতানা ও মীর নজরুল ইসলাম পরস্পর যোগসাজসে ৮৭ লাখ ২৮ হাজার ৬৭৫ টাকার জ্ঞাত আয়ের সাথে অসংগতিপূর্ণ সম্পদের মালিকানা অর্জন করে নিজ দখলে রেখে স্বামী ট্রাফিক ইন্সপেক্টর মীর নজরুল ইসলাম কর্তৃক অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ বৈধ করার অপচেষ্টা করে। এবং ৬১ লাখ ৮০ হাজার ৭৭৩ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন করে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করার দায়ে তাদের বিরুদ্ধে দদুদক আইন ২০০৪ সালের ২৬ (২) ও ২৭ (১) ধারায় মামলা রুজু করা হল।

দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম-১ এর উপ-পরিচালক লুৎফুল কবির চন্দন জানান, অনুসন্ধানে দালিলিক প্রমাণ পাওয়ায় কমিশনের অনুমতিক্রমেই দুই জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

সকালের-সময়/এমএফ

Print Friendly, PDF & Email

আরো সংবাদ