আমার হাত অনেক লম্বা, রেলে কে দুর্নীতি করে না!


মোহাম্মদ ফোরকান ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ৩:০৬ : অপরাহ্ণ

কম খরচে নিরাপদ ভ্রমণের জন্য পরিচিত বাংলাদেশ রেল। কিন্তু রেলের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঘাটে ঘাটে দুর্নীতির কারণে অনেকটাই পঙ্গু হয়ে আছে রেল। রাষ্ট্রীয় এ পরিবহন যাত্রী চাহিদার শীর্ষে থাকা সত্ত্বেও সেবার মান নিয়ে নানা প্রশ্ন যেন লেগেই থাকে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এ বিষয়ে পর্যবেক্ষণ করলে রেলের দুর্নীতির চিত্র ফুঁসে উঠে।

দুদক পরিচালকের নেতৃত্বে গঠিত টিম রেলওয়ের আইন, বিধি, পরিচালনা পদ্ধতি, সরকারি অর্থ অপচয়ের নানা দিক পর্যবেক্ষণের পর সেগুলো বিশ্লেষণ করে অনিয়মের উৎস শনাক্তসহ দুর্নীতি প্রতিরোধে একটি সুপারিশমালা দিয়েছে রেলমন্ত্রী মো. নুরুল ইসলাম সুজনের কাছে।

প্রতিবেদনে দুর্নীতির উৎস হিসেবে বলা হয়, পূর্বাঞ্চল রেলে বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি লিজ-হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হচ্ছে, রেলওয়ের ওয়াগন, কোচ, লোকোমোটিভ, ডিজেল ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট (ডিএমইউ) ক্রয়ে বড় ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়ম হচ্ছে। বিভিন্ন সেকশন স্টেশনের সিগন্যালিং ব্যবস্থা পুনর্বাসন ও আধুনিকীকরণ কাজে অনিয়ম ও দুর্নীতি হচ্ছে। ডাবল লাইন, সিঙ্গল লাইন, ডুয়েল গেজ ট্র্যাক নির্মাণ, ভূমি অধিগ্রহণেও দুর্নীতি হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ থাকলেও সিন্ডিকেট করে রেলের তেল চুরি করা, বরাদ্দকৃত বাসা অন্যকে ভাড়া দেওয়া, রেলের জায়গা দখল, বস্তি নির্মাণ, অবৈধ পানি, বিদ্যুৎ গ্যাস সংযোগ এ অসঙ্গতিপূর্ণ উৎস বরাবরের মতই থেকেই যাচ্ছে।

যার কারণে রেলের কিছু অসাধু কর্মচারীর কারণে বেহাল দশায় রেল। চট্টগ্রামের পাহাড়তলী পূর্বাঞ্চল রেলের ট্রেন কন্ট্রোলার (টিএনএল) রেল শ্রমিক লীগ নেতা মহিউদ্দিন মকুল পাটওয়ারী (৪০)। তিনি ট্রেন কন্ট্রোল অফিসে চাকরি করছেন প্রায় ৮-৯ বছর ধরে। তার এই চাকুরী জীবনে হয়েছেন অঢেল সম্পদের মালিক। তার আয়েশি জীবনযাপন যেন চমক লাগানোর মতো। থাকেন দামি ফ্ল্যাটে। করেন ট্রেন কন্ট্রোল, এই কন্ট্রোলিং ফাঁকে তিনি গড়ে তুলেছেন তেল চুরির বিশাল সেন্ডিকেট, রাত হলেই শুরু হয় মহিউদ্দীন সেন্ডিকেটের তেল চুরির মহোৎসব। তার এ বিষয়টি জানাজানি হলে হৈছৈ শুরু হয় পূর্বাঞ্চল রেল ভবনে, শরু হয় তদন্ত, তার এ কাজের জন্য রেল মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গঠিত দুর্নীতির দুটি তদন্তের প্রায় ১ বছর অতিবাহিত হলেও এখনও রিপোর্ট জমা হয়নি।

জানা যায়, মহিউদ্দীন পাটওয়ারীর মাসিক বেতন ২৩ হাজার ১৫০টাকা। মাসে জিপিএফ ফান্ডে ১৬ হাজার টাকা, বাসা ভাড়া-গ্যাস-বিদ্যুৎখাতে ৩ হাজার ৮৪২ টাকা কাটার পর অবশিষ্ট ৩ হাজার ৩০৫ টাকা উত্তোলন করেন। এই অল্প টাকায় মহিউদ্দীন মকুল পাটুয়ারীর সংসার চলে কিভাবে! খোদ সে প্রশ্ন রেল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের..?

সুত্র জানায়, মহিউদ্দীন মকুল তার টাইগারপাস মাজার কলোনির ৭/এ রেলের বরাদ্দকৃত বাসাটি তিনি ভাড়া দিয়েছেন অন্যত্র। বাসার পাশে খালি জায়গায় তিনি গড়ে তুলেছেন ভাড়াঘর। সেখানে অবৈধভাবে সংযোগ দেওয়া আছে পানি-বিদ্যুৎ-গ্যাসলাইনের। তিনি ডবলমুড়িং ডেবারপাড়ে মিন্টু নামের এক ব্যক্তির ৪ তলা ফ্ল্যাটে বসবাস করেন পরিবার নিয়ে। অল্প বেতন পাওয়া মহিউদ্দীন মকুল কিভাবে ফ্ল্যাটবাড়ির ভাড়া, সন্তানদের লেখাপড়া, সংসারের খরচ ইত্যাদি বহন করেন! কিভাবে এতো আরাম-আয়েশে জীবন কাটান! সেসব প্রশ্ন শুধু রেল ভবন ঘিরে ঘুরপাক খাচ্ছে।

এ বিষয়ে পূর্ব রেলের অতিরিক্ত মহাব্যবস্থাপক সকালের-সময়কে বলেন, আমি এ বিষয়ে কিছু জানিনা। মহিউদ্দীন মকুল পাটওয়ারীর বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ অনেক আগে থেকেই আছে। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ তদন্ত কমিটি তদন্ত করছে, অপরাধী হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ ব্যাপারে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল।

সিন্ডিকেটের সাথে সখ্যতা গড়ে বিভিন্ন স্টেশনে তেল চুরির সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ, বরাদ্দকৃত বাসা ভাড়া, রেলওয়ের জায়গায় দালান নির্মাণ, অবৈধভাবে রেলের জায়গাদখলসহ নানা অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মহিউদ্দিন মকুল পাটুয়ারী সকালের-সময়কে বলেন, আমার বিরুদ্ধে একটি কুচক্রী মহল কাজ করছে, আমি লোকমান গ্রুপ করি বলে সিরাজ গ্রুপ আমায় মেনে নিতে পারছে না, তাই তারা আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। আমি নামাজ কালাম পড়ি এসবে আমি নাই।

কিন্তু তার বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি প্রতিবেদককে বলেন, আমার বিরুদ্ধে অনেক সাংবাদিক নিউজ করেছে, জাহাঙ্গীর আলম নামক এক সাংবাদিক নিউজ করে পরে আমার অফিসে এসে ক্ষমা চেয়েছে। এমন কি সাংবাদিক সাইদুল, সুজিতসহ অনেকে আমার ব্যাপারে ভাল করে জানে আপনি ওদেরকে জিজ্ঞেস করলে জানতে পারবেন আমি কেমন? তবে তদন্ত কমিটি আমার কিছু করতে পারেনি, তারা পিছু হটেছে। আপনি নিউজ করলে করতে পারেন, আমার হাত অনেক লম্বা।

জানা যায়, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে অনিয়ম-দুর্নীতি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল পূর্ব রেলের ডিভিশনাল অফিসার (ডিআরএম) বোরহান উদ্দিনকে। তিনি চট্টগ্রাম থেকে বদলী হয়ে রেল ভবনে চলে যাওয়ায় তদন্ত রিপোর্ট এখনো জমা পড়েনি।

এ বিষয়ে বর্তমান (ডিআরএম) সাদেকুর রহমান সকালের-সময়কে বলেন, আমি মাত্র নতুন আসলাম মহিউদ্দীন পাটুয়ারীর বিষয়ে আমার জানা নেই, তবে ফাইল পত্র দেখে বলতে পারব বলে লাইন কেটে দেয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক শ্রমিক লীগ নেতা বলেন, মহিউদ্দীন মকুল পাটুয়ারী রেল শ্রমিক লীগ নেতা লোকমানের অনুসারী। গত বছরের ৩ সেপ্টেম্বর প্রতিনিধি সম্মেলনে সিরাজপন্থীদের কেউ নেতৃত্বে না আসায় লোকমানপন্থীরা আধিপত্য বিস্তার করে চলছে রেল ভবনে। মহিউদ্দীন মকুলের দুর্নীতির তদন্তে ধীরগতির কারণ একটাই তিনি লোকমান গ্রুপ। তাকে বাঁচাতে শুরু থেকেই লবিং শুরু করেছে এই গ্রুপ। যার কারণে তদন্ত রিপোর্ট এখনো জমা হয়নি।

প্রিয় পাঠক.. মহিউদ্দীন মকুল পাটুয়ারীর আরো দুর্নীতির তথ্য জানতে আগামী পর্বে চোঁখ রাখুন।

Print Friendly, PDF & Email

আরো সংবাদ