চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানের মধ্যেই টেন্ডার ছাড়াই চতুর্থ শ্রেণির ক্যান্টিন ও একটি গ্রোসারি শপ ইজারা দেওয়া হয়েছে। এর পেছনে হাত রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালের ভেতরে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। তারাই নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে দোকান দুটি ইজারা দিয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
জানা যায়, কোনো ঘোষণা ছাড়াই চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণি কর্মচারী সমিতির ক্যান্টিন ও একটি গ্রোসারি শপ ইজারা দেওয়া হয় মেসার্স মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে। এই প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা নগরীর আগ্রাবাদের বিসিক মার্কেটে।
এর আগেও ইজারা নেওয়া প্রতিষ্ঠান এসপি এন্টারপ্রাইজের পক্ষে তাজুল ইসলামই ওই ক্যান্টিন ও গ্রোসারি শপ পরিচালনা করেছেন। এসপি এন্টারপ্রাইজের মালিক সেলিম আহমেদ তাজুলের ভগ্নিপতি বলে জানা যায়।
সেলিম আহমদ মারা যাওয়ার পরও তার স্বাক্ষর জাল-জালিয়াতি করে বিভিন্ন কাগজপত্র তাজুল ইসলাম নিজের নামে করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এর আগে গত বৃহস্পতিবার হাসপাতালের পক্ষ থেকে দেওয়া এক চিঠিতে এক বছরের জন্য দোকান দুটির কার্যাদেশ দেওয়া হয় ওই প্রতিষ্ঠানকে।
চিঠিতে স্বাক্ষর করেন হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এসএম হুমায়ুন কবীর এবং উপপরিচালক ডা. মুহাম্মদ আফতাবুল ইসলাম। অথচ এর আগে এসপি ইন্টারপ্রাইজ, পিরানি হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট, মেসার্স হোটেল আলিফ, আবদুল লতিফ হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্টসহ ৬টি প্রতিষ্ঠান ক্যান্টিন ও গ্রোসারি শপ ইজারা নেওয়ার জন্য নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করেন।
কিন্তু চমেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ টেন্ডার ছাড়াই ক্যান্টিন ও গ্রোসারি শপ তুলে দেন মেসার্স তাজুল ইসলামের ভূয়া প্রতিষ্ঠান এসপি এন্টারপ্রাইজকে।
জানা যায়, তাজুল ইসলাম দীর্ঘদিন নিজেকে এসপি এন্টারপ্রাইজেরর মালিক দাবী করে ভাড়া অাদায় করত। যখন প্রকৃত মালিক সেলিম আহমদ ১৫ জানুয়ারী ২০২০ সালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কলকাতায় মৃত্যু বরণ করেন তখন তিনি জাল-জালিয়াতি করে ক্যান্টিন হাতিয়ে নিজেকে বাচাঁনোর জন্য আইনের আশ্রয় নেয়, এবং তিনি এ বিষয়ে মামলাও করেন পরে তা প্রত্যাহার করে নেন।
জানা যায়, সেলিম আহমদের এই দোকান তাজুল ইসলাম প্রায় অর্ধ কোটি টাকার আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে হাতিয়ে নেয়। এবং ২৪ বছরে মাত্র ১৬শ টাকা ব্যাট দিয়েছে বলে জানান একাদিক কর্মচারী।
আরও জানা যায়, মেসার্স মোহাম্মদ তাজুল ইসলামকে লেখা ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ‘চতুর্থ শ্রেণির ক্যান্টিন ও গ্রোসারি শপ’ ইজারার লক্ষ্যে আপনার দাখিলকৃত দরপত্র অত্র হাসপাতালের দরপত্র মূল্যায়ন ও ক্রয় কমিটি কর্তৃক গৃহীত হওয়ায় শর্তসাপেক্ষে এই কার্যাদেশ জারি করা হলো। সাত কর্মদিবসের মধ্যে স্ট্যাম্পে চুক্তিপত্র সম্পাদনের কথা বলা হয়। আর তিন মাসের অগ্রিম ভাড়া ৯০ হাজার টাকা নিরাপত্তা জামানত হিসেবে জমা দিতে হবে।
এ বিষয়ে জানার জন্য মোহাম্মদ তাজুল ইসলামকে মোঠোফোনে কল দেয়া হলে তিনি সকালের-সময়কে বলেন, আপনি মেডিকেলে এসে খোজখবর নেন, আমি বেশি কিছু বলতে পারবো না, এবং সেলিম আহমদের ডকুমেন্টস কেনো জাল-জালিয়াতি করেছেন এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি লাইন কেটে দেন।
এছাড়া প্রায় তিন মাস আগে দোকান ভাড়া নেওয়া নিয়ে এক দ্বন্দ্বে তাজুল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মামলাও করেন, পরে আবার সেই মামলা প্রত্যাহারও করে নেন তিনি।
হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের অভিযোগে জানা যায়, অনিয়মে দেওয়া এই কার্যাদেশের নেপথ্যে জড়িত ছিলেন চমেক হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণি কর্মচারী সমিতির সভাপতি আব্দুল মতিন মানিক, প্রশাসন শাখার প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তাসহ আরও বেশ কয়েকজন।
এই বিষয়ে আব্দুল মতিন মানিকের সাথে মোঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সকালের-সময়কে জানান, আপনি মেডিকেলে আসেন এখানে বসে বিস্তারিত বলব বলে লাইন কেটে দেন।
চমেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, উন্মুক্ত টেন্ডারে সংঘাতের ঝুঁকি এড়াতে পিপিআর পদ্ধতিতে কোটেশনের মাধ্যমে দোকান দুটি ইজারা দেওয়া হয়েছে। চমেক হাসপাতালের পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল হুমায়ুন কবির বলেন, সরকারি নিয়ম মেনে কোটেশনের মাধ্যমে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। কোটেশনের মাধ্যমে চুক্তি ভিত্তিক এক বছরের জন্য কার্যাদেশ দিতে পারেন পরিচালক।
সকালের-সময়/এমএফ