ট্রেনের কনটেইনার জটে আটকে যাচ্ছে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম। চট্টগ্রাম থেকে দিনে প্রায় চারটি ট্রেন পণ্যভর্তি কনটেইনার নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়ার কথা থাকলেও এখন দুই দিনেও একটি ট্রেন যাচ্ছে না। ইঞ্জিন সংকটের কারণে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ পর্যাপ্ত ট্রেন পরিচালনা করতে পারছে না।
বন্দর দিয়ে আসন্ন রমজান উপলক্ষে আসা এসব পণ্য ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহও করা যাচ্ছে না। এতে দেশে পণ্যের কৃত্রিম সংকটের আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। চট্টগ্রাম বন্দরের ভেতর ও বাইরে প্রায় ১৬০০ একক কনটেইনার আটকে রয়েছে এবং জাহাজ থেকে আরও কনটেইনার নামার অপেক্ষায় রয়েছে।
আমদানি বেড়ে যাওয়া এবং সেই অনুযায়ী ডেলিভারি না হলে বন্দরের ভেতরে কনটেইনার জটের চিত্র প্রায়ই হয়ে থাকে। কিন্তু এবার বন্দরের ভেতরে কনটেইনার জটের সৃষ্টি হয়েছে ঢাকামুখী কনটেইনার ডেলিভারি না হওয়ায়।
আর এই জট শুধু বন্দরের ভেতরেই নয়, বন্দরের বাইরের কাস্টমস ওভারব্রিজের নিচ দিয়ে যে রেললাইন সিজিপিওয়াইতে (চিটাগং গুডস পোর্ট ইয়ার্ড) গেছে সেই রেল লাইনের ওপরে ছয়টি ট্রেন পণ্যভর্তি অবস্থায় রয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে সিজিপিওয়াই এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, রেললাইনের ওপরে রেকভর্তি কনটেইনার প্রস্তুত রয়েছে। এ ছাড়া আরও ট্রেন রয়েছে সিজিপিওয়াইর ভেতরে।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কনটেইনারবাহী পণ্য নিয়ে দিনে চারটি ট্রেন ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়ার কথা থাকলেও এখন দুই দিনে একটি ট্রেনও যাচ্ছে না। এতে পণ্যভর্তি প্রায় ১৪০০ একক কনটেইনার পণ্য আটকে আছে চট্টগ্রাম বন্দরে। ছয়টি ট্রেনের রেক পণ্যভর্তি কনটেইনার দিয়ে লোড করা হলেও ইঞ্জিনের অভাবে পণ্যগুলো আটকে রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিজিপিওয়াই ইয়ার্ডের মাস্টার আবদুল মালেক বলেন, আমরা আগে দিনে চারটি ট্রেন চালাতে পারতাম। কিন্তু গত একমাস ধরে দিনে দুটি ট্রেন চালাতে পারছি। এখন কিছুদিন ধরে দিনে দুটিও পারছি না। ইঞ্জিন না থাকায় এসব ট্রেন চলছে না।
এতে কনটেইনার ভর্তি ট্রেন চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যেতে পারছে না বলে বন্দরের ভেতরে ও বাইরে কনটেইনারের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে বলে জানান আবদুল মালেক।
বন্দরে জট আরও বাড়ছে এবং আগামীতে আরও বাড়তে পারে উল্লেখ করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক বলেন, নিয়মিত ট্রেন ছেড়ে না যাওয়ায় চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার জট বাড়ছে। এখন আমরা পানগাঁও টার্মিনালের মাধ্যমে কনটেইনার ঢাকায় পাঠানো যায় কি না তা ভাবছি। এক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অনুমোদনের প্রয়োজন। যদি পানগাঁও পাঠানো যায় তাহলে হয়তো দ্রুত ঢাকায় এসব পণ্যভর্তি কনটেইনার পাঠানো যাবে।
এদিকে চট্টগ্রাম বন্দর সূত্রে জানা যায়, পণ্যভর্তি এসব কনটেইনারের মধ্যে বেশিরভাগ রমজান উপলক্ষে ভোগ্যপণ্য এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল পণ্য। এসব পণ্য সঠিক সময়ে পৌঁছানো না গেলে বাজারে পণ্যের সংকট সৃষ্টি হতে পারে।
পণ্যভর্তি কনটেইনারগুলো আটকে থাকায় আমদানিকারক তথা ভোক্তা পর্যায়ে ক্ষতি হবে বলে জানান বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট খায়রুলর আলম সুজন। তিনি বলেন, পণ্য ডেলিভারি করতে সময় বেশি লাগছে বলে ডেমারেজ চার্জ বাড়ছে। দিনশেষে এসব চার্জ ভোক্তার উপর বর্তাবে।
রেলওয়ের বক্তব্য—পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সবুক্তগীন বলেন, বন্দর দিয়ে আমদানিপণ্য ঢাকা আইসিডিতে পাঠানোর জন্য দিনে চারটি ট্রেন চালানোর কথা থাকলেও ইঞ্জিন সংকটের কারণে পারা যাচ্ছে না। তবে আমরা একটি ক্র্যাশ প্রোগ্রাম নিচ্ছি। এর মাধ্যমে আগামী এক মাসের মধ্যে আটকে থাকা সব পণ্য গন্তব্য স্টেশনে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করব।
তিনি বলেন, বর্তমানে খাদ্যপণ্যবাহী ট্রেন, তেলবাহী ট্রেন ও সারবাহী ট্রেন একই সময়ে চালু হওয়ায় ইঞ্জিন সংকট বেড়ে গেছে। একই সময়ে সবগুলো পণ্যের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি হওয়া কনটেইনারের ৯৬ শতাংশই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ব্যবহার করে আনা- নেওয়া হয়। বাকি ৩ শতাংশ রেলপথে ও ১ শতাংশের কম নৌপথে পরিবহন হয়। বন্দর ও রেলওয়ে সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ট্রেনের মাধ্যমে প্রতিদিন ১৪০ থেকে ১৬০টি কনটেইনার পরিবহন করা হয়। বর্তমানে এসব কনটেইনার নিয়মিত পরিবাহিত না হওয়ায় জটলার সৃষ্টি হয়েছে।
সূত্র—ডিপি/এসএস/এমএফ