চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে প্রতি বছর ঢাকা থেকে আসা অডিট টিমকে ‘ম্যানেজ’ করার নামে গণহারে চাঁদা আদায় করা হয়। এই ঘটনায় গত বছর আলোড়ন সৃষ্টি হলেও তবে এ টাকা আদায়ের নেপথ্যেদের শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়নি। যার কারণে এইবারও সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।
শিক্ষা বোর্ড সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম বোর্ডের কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রত্যেক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই কাজে জড়িত। তারা হলেন পরীক্ষা শাখার সেকশন অফিসার মোহাম্মদ সরোয়ার কায়সার, কলেজ শাখার স্টেনোগ্রাফার নাসির উদ্দীন, ও হিসাব শাখার উচ্চমান সহকারী ও শিক্ষা বোর্ড কর্মচারী সংসদের সভাপতি জাহিদ হোসেন খোকা ও মোহাম্মদ আইয়ুব আলী, শিক্ষা বোর্ড কর্মচারী পরিষদের সভাপতি জসিম উদ্দীনসহ কয়েকজন জড়িত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সরেজমিনে শিক্ষা বোর্ডে গিয়ে জানা যায়, বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে জনপ্রতি ১০ হাজার টাকা করে চাঁদা আদায়ে তারা সরাসরি যোগাযোগ করেছেন, এবং নেতৃত্ব দিচ্ছেন। অডিট টিমকে ‘ম্যানেজ’ করার কথা বলে চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে করা হচ্ছে এই অভিনব চাঁদাবাজি। তাদের আপ্যায়ন ও অন্যান্য খরচের জন্য জোর পূর্বক আদায় করা হয় এই টাকা, এমনটাই জানালেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুইজন কর্মচারী।
তারা আরও বলেছেন, কেন এই চাঁদা আদায় করা হয় তার কিছুই জানেন না তারা। বলা হয় অডিট কমিটিকে ম্যানেজ করতে চাঁদা লাগবে। গত চার-পাঁচ বছর ধরে তারা এই চাঁদা দিয়ে আসছেন। তবে তাদের দাবী নিজেদের (সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের) অনেক কর্মকান্ড আড়াল করতে এ চাঁদাবাজি করা হচ্ছে।
সংস্থাপন, পরীক্ষা, হিসাব, বিদ্যালয়, কলেজ ও নিরীক্ষা- এই ৬ শাখায় স্থায়ী ২৮ জন কর্মকর্তা ও ৭৯ জন কর্মচারী রয়েছেন। অস্থায়ী কর্মকর্তা আছেন ১৫ জন। মোট কর্মরত ১০৭ জন। সবাইকে এই চাঁদায় ‘শামিল’ হতে হয়। প্রতিবছর এটি বাড়তে থাকে। এবারও চাঁদার পরিমাণ সর্বনিম্ম ১০ হাজার টাকা ও সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানা যায়।
সূত্র জানায়, গত বছরের অক্টোবরে ১০৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর কাছ থেকে মোট ১০ লাখ ৭০ হাজার টাকা চাঁদা আদায় করা হয়েছিল। তখন সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল এ বছরেও তার ব্যর্থয় ঘটেনি। সুইপার থেকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সবাইকে এই চাঁদা দিতে হচ্ছে।
বোর্ড সূত্রে আরও জানা যায়, আগামী ৪ নভেম্বর শিক্ষা অডিট অধিদফতরের ৪ সদস্যর একটি টিম চট্টগ্রাম বোর্ডে অডিটে আসার কথা রয়েছে। এতে নেতৃত্ব দেবেন, উপ-পরিচালক সুনীল কুমার সিংহ, নিরীক্ষা ও হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা (উপদল নেতা) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সি, এসএএস সুপার (সদস্য) মো: মাহমুদুল হাসান ও অডিটর (সদস্য) আপেল মাহমুদ।
অভিযোগ আছে, ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত তারা বোর্ডের বিশ্রামকক্ষেই রাতযাপন করবেন। এ সময় এক প্রকার ‘জামাই আদর’ করা হবে নিরীক্ষা দলকে। প্রতিবেলার খাবার, নাশতার ব্যয় বহন করবে শিক্ষা বোর্ড। এমনকি তাদের চাহিদা পূরণের জন্য সব কিছুর প্রস্তুতি গ্রহন করেছেন সংঘবদ্ধ এই সিন্ডিকেট।
তবে এত কিছুর পরেও প্রায় ১২ লাখ টাকার চাঁদাবাজিকে অন্য ভাবে দেখছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। যদিও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চাপে মুখ খুলতে তারা নারাজ। তবে এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, শুধু অডিট টিমকে খুশি করতে নয়, অডিট টিমের পাশাপাশি নিজেরাও ফায়দা নিতে এই চাঁদাবাজি করা হচ্ছে। তাদের দাবি, সংঘবদ্ধ একটা চক্র অডিট টিমকে খুশি করার পর নিজেরাও পকেট ভরছে বিশাল অংকের এই টাকা।
অভিযুক্তদের সাথে সরাসরি কথা হলে তারা সকালের-সময়কে জানান, ঢাকা থেকে যে অডিট টিম আসবে তাদের জন্য সরকারি টাকা খরচ করা হবে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে যে টাকা উত্তোলনের কথা বলা হচ্ছে সেটা আমরা জানি না। এসব মিথ্যা কথা।
তবে অডিট টিমের পিছনে প্রতিবছর কতটাকা খরচ হয় এই ব্যাপারে কথা হয় হিসাব শাখার উচ্চমান সহকারী ও শিক্ষা বোর্ড কর্মচারী সংসদের সভাপতি জাহিদ হোসেন খোকার সাথে, তখন তিনি বলেন–আমি এই হিসাব দিতে পারবো না, এটা দিলে আমার সমস্যা আছে, আপনি আমাদের চেয়ারম্যানের সাথে কথা বলেন ওনি এই হিসাব দিতে পারবে। কথার এক পর্যায়ে উত্তেজিত হয়ে প্রতিবেদকে ব্ল্যাক মেইলিং করার চেষ্টা করেন। এবং শিক্ষা বোর্ডের কিছু কর্মকর্তা-কর্চারীর ব্যাপারে বাজে মন্তব্য করেন।
জানা যায়, গত কয়েক বছর যাবৎ এই চাঁদাবাজির বিষয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে বোর্ডে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। পত্রিকায় যাদের বরাতে চাঁদার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁদের ডেকে ডেকে হুমকি-দমকিসহ চাকরি খোয়ানোর হুশিয়ারি ও সাবধান করে দেন অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
এদিকে বিষয়টি জানতে চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মুস্তফা কামরুল আখতারের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল রিসিভ করেনি।
সকালের-সময় ডটকম