বাংলাদেশ রেলওয়ের এক সিন্ডিকেটের নাম আফসার বিশ্বাস। এই আফসার বিশ্বাস যেন রেলের আরেক মিঠু। তার বাইরে এই রেলের বিভিন্ন কাজ কেউই পায় না। বলা চলে একচ্ছত্র আধিপত্য তার। কোনো টেন্ডার হলেই সেখানে নামে ও বেনামে একাই টেন্ডার অংশ নেন আফসার। এরপর কাজের সুবিধার্থে নিজের মতো করে কাজ ভেঙে ভেঙে করেন।
আর এসবের নেপথ্যে রয়েছে রেলের কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারী। তারা কোনো কিছু হলেই মেরামতের জন্য জরুরি চাহিদাপত্র অনুমোদনের তোড়জোড়ও শুরু করেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রেলের ট্রাকশন মোটর ও আর্মেচারের যত কাজ হয় তার সবটাই করেন এই আফসার বিশ্বাস। তবে এই সিন্ডিকেট পরিচালিত হয় চট্টগ্রামের শাহ আলমসহ যশোরের কয়েকজন ঠিকাদারদের দ্বারা। আর এদের নেতৃত্ব দেন এই মাফিয়া ডন আফসার বিশ্বাস। গত ১০ বছরে এই সেন্ডিকেট রেল থেকে হাতিয়ে নিয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা।
বিশেষ করে রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চলের সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রণ দফতর (সিওএস), কেন্দ্রীয় লোকোমেটিভ কারখানা, সৈয়দপুর ক্যারেজ কারখানা, চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ক্যারেজ কারখানায় রয়েছে তার একক দাপট। টানা গত ১০ বছর থেকে অধিকাংশ কাজ করছেন এই আফসার বিশ্বাস।
অভিযোগ আছে, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তিনি রেল অফিসারদের নানাভাবে জিম্মি করেন। এরপর কাজ বাগিয়ে নেন। তবে তার বাইরে যাতে কেউ কাজ না পায় তার জন্য রয়েছে তার বিশাল সিন্ডিকেট। যারা বিভিন্ন সময়ে রেল অফিসারদের বদলির ভয়ভীতি দেখিয়ে কাজ আদায়সহ অন্য ঠিকাদারদেরও ভয়ভীতির সঞ্চার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ে কেন্দ্রীয় লোকোমেটিভ কারখানা কেলোকা যেখানে পুরনো ইঞ্জিন মেরামত করা হয়। এই কারখানার তথ্য উপাত্ত বলছে, গত ১০ বছরে যত ইঞ্জিন মেরামতের কাজ হয়েছে তার সিংহভাগই করেছে আফসার বিশ্বাসের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিশ্বাস কন্সট্রাকশন, বাঁধন এন্টারপ্রাইজ ও তার সহযোগী প্রতিষ্ঠান শ্রীজা মেটাল, রিপন মেটাল, এআর এন্টারপ্রাইজ, থ্রিএস এন্টারপ্রাইজ।
তবে অবাক বিষয় হলো, আফসার বিশ্বাস সিন্ডিকেট ছাড়া এসব কাজ অন্য কেউ পায়নি। তবে এসব কাজের মান ও খরচ নিয়েও বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়গুলো জানার পরও আমলে নেয়নি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
জানা গেছে, রেলওয়ে লোকোমেটিভের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের মধ্যে অন্যতম ট্রাকশন মোটর ও আর্মেচার। বাংলাদেশ রেলওয়ে বৈদেশিক তালিকাভুক্ত সরবরাহকারীদের মাধ্যমে নতুন ট্রাকশন মোটর ও আর্মেচার ক্রয় করে থাকে। অন্যদিকে স্থানীয়ভাবে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রেলের প্রয়োজনীয় মেরামতও করা হয়ে থাকে।
জানা যায়, এই সিন্ডিকেটের প্রভাবে গত ২০১৪ সাল থেকে আজ অবধি যতগুলো টেন্ডার হয়েছে তার সবটাই ঘুরেফিরে নিয়ম নীতির তোয়াক্তা না করে পেয়েছে কেবল একটি মাত্র প্রতিষ্ঠান শ্রীজা মেটাল। তবে কাজগুলোর প্রতিটি উন্মুক্ত দরপত্রে তার সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে অংশগ্রহণ করে বিশ্বাস কন্সট্রাকশন ও বাঁধন এন্টারপ্রাইজ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সবকটাই আফসার বিশ্বাসের করা নামে-বেনামের প্রতিষ্ঠান। প্রতিবছর তার প্রতিষ্ঠানের বাইরে কেউ টেন্ডারে অংশগ্রহণ করে না। ফলে তিনি এককভাবে সব কাজ পেয়ে থাকেন। কাগজপত্রে আলাদা প্রতিষ্ঠান দেখানো হলেও আসলে সেগুলো তারই প্রতিষ্ঠান।
বাংলাদেশ রেলওয়ের ক্রয় নীতিমালা অনুযায়ী অতিরিক্ত মহাপরিচালক রোলিং স্টকের (এডিজি) ক্রয়সীমা অনুমোদনের ক্ষমতা ৫০ লাখ, অন্যদিকে মহাপরিচালক (ডিজি) ক্রয়সীমা অনুমোদনের ক্ষমতা ২ কোটি। চাহিদামতো একসঙ্গে কাজ শেষ করতে গেলে অর্থের পরিমাণ তাদের ক্রয়সীমার ঊর্ধ্বে চলে যায়।
তাই একই কাজকে বহুসংখ্যক চাহিদাপত্রের ভিত্তিতে কয়েকবারে ভেঙে ভেঙে ডিজি ও এডিজি ক্রয়সীমার মধ্যে রেখে সেই কাজ বাগিয়ে নেন আফসার বিশ্বাস এমন অভিযোগ রেলের প্রতিটি কর্মকর্তার মুখে মুখে।
এ বিষয়ে রেলওয়ের সীমিত ঠিকাদারদের মধ্যে দরপত্রের মাধ্যমে কেনাকাটা (এলটিএম) নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে সংসদীয় কমিটি। রেলের টেন্ডার প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি খতিয়ে দেখতে একটি উপ-কমিটি গঠন করেছে সংসদীয় কমিটি। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ কমিটি গঠন করা হয়।
বৈঠক সূত্র জানায়, বৈঠকে একজন সদস্য বলেন, এলটিএম পদ্ধতিতে কেনাকাটায় একটি চক্র সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে বলে তাদের কাছে তথ্য এসেছে। ৩৮টি লাইসেন্সধারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এই কাজ করছে। নামে ৩৮টি প্রতিষ্ঠান হলেও প্রকৃতপক্ষে ৫ থেকে ৭ জনই এসব প্রতিষ্ঠানের মালিক। তাদের নিকটাত্মীয়দের নামে লাইসেন্স করা হয়েছে।
আরেক সদস্য বৈঠকে বলেন, আফসার বিশ্বাস নামে একজন ঠিকাদার সেখানে সব নিয়ন্ত্রণ করেন। তাকে অনেকে রেলওয়ের জি কে শামীম হিসেবে ডেকে থাকেন। এছাড়া রেলওয়ের স্ক্র্যাপ নিলামের ক্ষেত্রেও অনেক অনিয়ম হচ্ছে বলে অভিযোগ আছে। এসব খতিয়ে দেখতে একটি কমিটি গঠন করা হয়।
সংসদ সচিবালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৈঠকে ক্রয় নীতিমালা সঠিকভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কিনা ও টেন্ডার প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি খতিয়ে দেখতে একটি উপ-কমিটি গঠন করা হয়। বৈঠকে বাংলাদেশ রেলওয়ের ক্রয় পদ্ধতি, রেলওয়ের দুটি জোনকে চারটি জোনে রূপান্তর, চট্টগ্রামে রেলওয়ের জমিতে পেট্রোল পাম্প ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার জন্য লিজ দেওয়া নিয়েও আলোচনা হয়।
কমিটির সভাপতি এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর সভাপতিত্বে কমিটির সদস্য রেলপথ মন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন, আসাদুজ্জামান নূর, শফিকুল ইসলাম, শফিকুল আজম খান, সাইফুজ্জামান, গাজী মোহাম্মদ শাহ নওয়াজ ও বেগম নাদিরা ইয়াসমিন বৈঠকে অংশ নেন।
সকালের-সময়/ফোরকান