এখনো চলছে ভবন নির্মাণের কাজ, বহালতবিয়তে কর্ণফুলীর অবৈধ মৎস্য আড়ত!


১ এপ্রিল, ২০১৯ ১:৩৫ : অপরাহ্ণ

সকালেরসময় রিপোর্ট:: কর্ণফুলীর তীরে অবৈধভাবে গড়েউঠা নির্মিত মৎস্য আড়তের পাশেই গড়ে তোলা হচ্ছে নতুন করে আরো একটি স্থাপনা। ২১ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই স্থাপনার কাজ এখন প্রায় শেষের দিকে। দিন-রাত তারাহুরা করে শ্রমিক লাগিয়ে এটা নির্মাণ করছেন সোনালী যান্ত্রিক মৎস্য সমবায় সমিতি লিমিটেড। একই জায়গায় আগে ১৮৮টি কক্ষ তৈরি করে বাংলাদেশ মৎস্যজীবি সমবায় সমিতি লিমিটেড। তাদের দাবি, বন্দর থেকে জায়গা লিজ নিয়ে স্থাপনা করছে তারা।

এদিকে, আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে কর্ণফুলী নদীর তীর কেউ লিজ দিতে পারে না, এমন দাবী পরিবেশবাদীদের, কেউ তাতে স্থাপনাও নির্মাণ করতে পারবে না। তালিকা করে কর্ণফুলী নদীতীরের অবৈধ সব স্থাপনা উচ্ছেদ করতে এর আগে নির্দেশও দিয়েছেন আদালত। কিন্তু সেটি আমলে না নিয়ে প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় স্থাপনা হচ্ছে একের পর এক।

নদীতীরে সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত চার একর জায়গা প্রথমে দখল করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। বছরে ২৮ লাখ ১৫ হাজার টাকা দর ধরে ১৫ বছরের জন্য এ জায়গা বাংলাদেশ জাতীয় মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেডের কাছে ইজারা দেয় তারা। এরপর এ জায়গায় মৎস্য আড়ত করে তা ক্রমে সম্প্রসারণ করে যাচ্ছে সোনালী যান্ত্রিক মৎস্য সমবায় সমিতি লিমিটেড। প্রথমে ১৮৮টি কক্ষের মৎস্য আড়ত করলেও পরে আরো ২৮টি পিলার বাড়িয়ে আটটি নতুন কক্ষ করা হয়েছে। এ স্থাপনার পাশে নদীতীরে খালি থাকা জায়গায়ও স্থাপনা করছেন তারা। অথচ নদীতীর দখল করে গড়ে ওঠা এ মৎস্য আড়ত উচ্ছেদ করতে আন্দোলন করে যাচ্ছেন পরিবেশবাদীরা।

বন্দর, সিটি কর্পোরেশন, জেলা প্রশাসন, ও সিডিএর কিছু প্রভাবশালী মহল এই স্থাপনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে বলে সূত্রে জানা যায়। এটি নিয়ে কোল্ড মাইন্ডে কাজ করছেন তারা। কিন্তু কর্ণফুলী উচ্ছেদ অভিযান চমক দিয়ে শুরু হলেও দমক পেয়ে নিরব ভুমিকা পালন করছেন প্রশাসন। এর পরও আন্দোলন অব্যাহত রেখেছেন বিভিন্ন সংগঠন।

কর্ণফুলী তীরের বাংলাদেশ মৎসজীবি সমবায় সমিতি লিমিটেড ও সোনালী যান্ত্রিক মৎস্য সমবায় সমিতি লিমিটেডের এই অবৈধ স্থাপনা সহ বাকী সব স্থাপনা উচ্ছেদের দাবীতে ১০টি সংগঠনের উদ্দ্যোগে গত ৩০শে মার্চ মানব বন্ধন ও করা হয়। এতে বক্তারা বলেছেন, আগামি সাতদিনের মধ্যে নির্দেশনা অনুযায়ী কর্ণফুলী তীরের ২১৮১ টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা না হলে উচ্চ আদালতে আদালত অবমাননার অভিযোগ আনা হবে।

সমাবেশে বক্তরা বলেন, দেশের ৯২ শতাংশ আমদানি রপ্তানি যে নদী দিয়ে সম্পন্ম হয় সেই নদী রক্ষায় এতো নাটকীয়তা কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না। গত ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাত্র ৬ দিন উচ্ছেদ অভিযান শেষে কি কারনে জেলা প্রশাসন নিরব হয়ে গেল তা জনগন জানতে চায়। জনগনকে অন্ধকারে রেখে অতীতে কোন ষড়যন্ত্র সফল হয়নি এখনো তা হতে দেয়া যাবে না।

এ ব্যাপারে, ইউজে সভাপতি নাজিমুদ্দিন শ্যামল বলেন, উচ্ছেদ অভিযান সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত কর্ণফুলী রক্ষার এই আন্দোলন থামবে না। কর্ণফুলী রক্ষায় চট্টগ্রামের সকল মানুষ আজ এক হয়েছে আমরা আদালতের নির্দেশনার বাস্তবায়ন চাই।

অধ্যাপক ইদ্রিচ আলী বলেন, আদালতের নির্দেশনা নিয়ে লুকোচুরি চলবে না। আমরা প্রশাসনকে সতর্ক করছি আগামিতে আপনাদের কাটগড়ায় দাড়াতে হবে। আদালত এবং জনগনের কাঠগড়ায় দোষী হওয়ার আগে উচ্ছেদ অভিযান সম্পন্ন করুন। অন্যথায় আপনাদের বাধ্য করা হবে।

চট্টগ্রাম রিপোর্টার্স ফোরামের সাধারণ সম্পাদক আলীউর রহমান বলেন, বন্দর কতৃপক্ষ ও জেলা প্রশাসন কর্ণফুলী তীরের জমি ইজারা ও ব্যবহার করে অর্থ উর্পাজন করছেন। কিন্তু কর্ণফুলী রক্ষা ক্ষেত্রে বিমাতাশুলভ আচরণ করবে তা মেনে নেয়া যায়না। কর্ণফুলী তীরের অবৈধ স্থাপনা আগামি ৭ দিনের মধ্যে শুরু না হলে আমরা রাস্তায় নামবো, উচ্চ আদালতে যাবো। তিনি বলেন, গুটিকয়েক মানুষের স্বার্থ রক্ষায় জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দেয়ার কাজ কিছুতেই মেনে নিবে না জনগন।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, বর্তমান মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের পেছনেই হয়েছে নতুন এ স্থাপনা তৈরি করা হচ্ছে। ২৮টি পিলার দিয়ে নতুন করে বড় বড় আটটি কক্ষ তৈরি করা হয়েছে। বরফকল কিংবা স্টোর হিসেবে এ ঘরগুলো তৈরি করা হচ্ছে।

শতাধিক আড়তের (গদি) একটির মালিক জাফর আলম। তার মালিকানায় আছে ১২ ফুট বাই ১৪ ফুট আয়তনের একটি আড়ত। তিনি জানান, সোনালী যান্ত্রিক মৎস্য সমবায় সমিতির কাছ থেকে ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা দিয়ে এসব আড়ত কিনতে হয়েছে তাদের। জায়গা নিয়ে ঝামেলা থাকায় তারা কোনো ডকুমেন্ট ছাড়াই এ টাকা পরিশোধ করে ব্যবসা করছেন।

নতুন করে এখন আরও স্থাপনা তৈরি করা হবে এখানে। কর্ণফুলী নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে আগে পাঁচটি একতলা ভবন ও একটি দোতলা ভবন তৈরি করা হয়েছে। ‘ইউ’ আকৃতিতে তৈরি হওয়া একতলা ভবনের দোকানগুলোতে করা হয়েছে মাছের আড়ত। আর দোতলা ভবনটি শৌচাগার ও পোশাক পরিবর্তনের কক্ষ হিসেবে ব্যবহারর করা হচ্ছে।

সোনালী যান্ত্রিক মৎস্য শিল্প সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল হক ওরফে বাবুল সরকারের সাথে মুটোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বাংলাদেশ জাতীয় মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি চট্টগ্রাম বন্দর থেকে জায়গাটি আমরা ১৫ বছরের জন্য লিজ নিয়েছি। আমরা তাদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে কিছু মাছের আড়ত তৈরি করে ভাড়া দিয়েছি। এটি অবৈধ কি-না, তা দেখবে প্রশাসন। নতুন করে স্থাপনা করার বিষয়টি প্রথমে অস্বীকার করেন তিনি। পরে বলেন, ‘মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র পরিচালনার সুবিধার্থে নতুন করে কিছু কক্ষ বাড়ানো হচ্ছে। এতে কারও কোনো আপত্তি নেই।

স্থানীয়রা জানান, যে জায়গা নিয়ে কোটি টাকার এ বাণিজ্য হচ্ছে, সেটির প্রকৃত মালিক চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। ২০১৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসককে একটি প্রতিবেদন দেন সদর সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) আছিয়া খাতুন। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘চাক্তাই ও রাজাখালী খালের মধ্যবর্তী স্থানের যে জায়গায় স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে, তা ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত নদীশ্রেণির জমি।

খাস খতিয়ানভুক্ত জায়গা কী বিবেচনায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ইজারা বা ব্যবহারের অনুমতি প্রদান করেছে, তা বোধগম্য নয়। এ প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বর জাতীয় মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে কর্ণফুলী নদীর পাশের জমিতে স্থাপনা নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন। কাজ অব্যাহত রাখলে উচ্ছেদ কার্যক্রম গ্রহণ করে ফৌজদারি মামলা করারও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন তিনি।

পাশাপাশি ইজারা প্রদানের বিষয়ে মতামত প্রদানের জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকেও চিঠি দেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক। জেলা প্রশাসনের চিঠিতে কর্ণফুলী নদী নিয়ে হাইকোর্টের নির্দেশনা থাকার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়। বলা হয়, কর্ণফুলী তীরবর্তী স্থানে সব ধরনের কাজ বন্ধ রাখতে হাইকোর্ট বিভাগ ২০১৬ সালের ৬ জুন নির্দেশনা দিয়েছেন। এরপরও নদীতীর লিজ দিলে কিংবা স্থাপনা তৈরি করা হলে তা হবে আদালতের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আদালতের এ নির্দেশনা বলে যে কোনো সময় এ স্থাপনা উচ্ছেদের ক্ষমতাও রাখে জেলা প্রশাসন।

এদিকে, কর্ণফুলী নদী দখলমুক্ত করতে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরশেদ। তার এ রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ২০১৬ সালে জেলা প্রশাসন, বন্দর কর্তৃপক্ষসহ সংশ্নিষ্ট সব পক্ষকে তিন মাসের মধ্যে অবৈধ সব স্থাপনা উচ্ছেদ করতে সময়সীমা বেঁধে দেন। কিন্তু এ নির্দেশনা অমান্য করে বন্দর কর্তৃপক্ষ ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে ভরাটকৃত জায়গা ১৫ বছরের জন্য লিজ দেয়। জেলা প্রশাসনও সতর্কতামূলক চিঠি দিয়ে দায় সেরেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াছ হোসেন বলেন, কর্ণফুলীর তীরে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের এই মহুর্তে আমাদের তেমন বাজেট নেই। দ্বিতীয়ত নির্বাচন ও পরিক্ষার কারণে ম্যাজিস্ট্রেট হাতে নেই। সীমানা পিলার না থাকার কারণে ও অফিসার পরিবর্তনের কারণে আমরা তা করতে পারছি না। আর উচ্ছেদ অভিযান চাইলে বন্দর কতৃপক্ষ যে কোন মহুর্তে করতে পারে। কারণ তাদের নিজস্ব লোকবল আছে তারা যদি আমাদের সহযোগিতা চাই আমরা অবশ্যই করব। তবে বাংলাদেশ মৎসজীবি সমবায় সমিতি লিমিটেড ও সোনালি যান্ত্রিক মৎস সমবায় সমিতির এই স্থাপনা
বন্দর কতৃপক্ষ তাদের জায়গা দাবী করে তাদের ইজারা দিয়েছে।

এদিকে বন্দরের সচিব ওমর ফারুক সকালেরসময়কে বলেন, বন্দরের জায়গা হওয়ায় আমরা তাদের লিজ দিয়েছি। তা ছাড়া নদীকেন্দ্রিক যেসব প্রতিষ্ঠান ব্যবসা পরিচালনা করে, তাদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করাও বন্দরের কাজ। এ চিন্তা থেকে তাদের জায়গাটি লিজ দেওয়া হয়েছে। তবে দেশের সার্থে প্রয়োজন হলে অভিযান চলবে।

অথচ জরিপ করে বন্দর ভূমি অফিস সদর সার্কেলের সহকারী কর্মকর্তা খোরশেদুল আলম মৎস্য আড়তের জায়গাটি নদীর তীর দখল করে নির্মিত হয়েছে বলে প্রতিবেদন দিয়েছেন। আবার ২০১৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসককে একটি প্রতিবেদন দেন সদর সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) আছিয়া খাতুন। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, চাক্তাই ও রাজাখালী খালের মধ্যবর্তী স্থানের যে জায়গায় স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে, তা ১নং খাস খতিয়ানভুক্ত নদী শ্রেণির জমি। খাস খতিয়ানভুক্ত জায়গা কী বিবেচনায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ইজারা বা ব্যবহারের অনুমতি প্রদান করেছে, তা বোধগম্য নয়।

0Shares

আরো সংবাদ