রেলের ১৫ কোটি টাকার এক প্রকল্পে পরামর্শক ব্যয় ১৪ কোটি টাকা!


৩১ অক্টোবর, ২০২৪ ২:০৯ : পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রামের হালিশহরে ১৯৮৪ সালে ৯১ দশমিক ৩৯ একর জমির ওপর এ ট্রেনিং একাডেমি প্রতিষ্ঠা করা হয়। শুরু থেকে যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে রেলের জনবল প্রশিক্ষিত করার কাজে ট্রেনিং একাডেমি কাজ করছে। একাডেমিতে বর্তমানে বিদ্যমান প্রশাসনিক ভবন, শ্রেণিকক্ষ, লাইব্রেরি, প্রশিক্ষণার্থী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হোস্টেল, মডেল রুম, স্টাফ কোয়ার্টার, অভ্যন্তরীণ রাস্তা ইত্যাদি অত্যন্ত জরাজীর্ণ অবস্থায় আছে।

সেখানে প্রশিক্ষণার্থী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হোস্টেলে সিটের সংখ্যাও কম। মোট কথা কম সরঞ্জামাদি, আধুনিক সুযোগ-সুবিধার অভাব, জনবল ঘাটতি এবং যথাযথ লজিস্টিক সাপোর্ট না থাকায় রেলওয়ে ট্রেনিং একাডেমি বর্তমানে অকার্যকর হওয়ার উপক্রম হয়েছে। বর্তমানে ৩০ বছর মেয়াদি রেলওয়ে মাস্টারপ্ল্যানে ট্রেনিং একাডেমি আধুনিকায়নের বিষয়টি উল্লিখিত আছে।

এ পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ রেলওয়ের একাডেমি আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে নকশা প্রণয়নে প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা। প্রকল্পটিতে শুধু পরামর্শক খাতেই ব্যয় প্রাক্কলন করেছে রেলওয়ে ১৩ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। প্রকল্পের আওতায় বড় অংকের ব্যয় পরামর্শক খাতে রাখার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। বাংলাদেশ রেলওয়ের একাডেমি আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে নকশা প্রণয়ন প্রকল্পের আওতায় এ প্রস্তাব করা হয়েছে।

তবে রেলওয়ের দাবি—প্রকল্প বাস্তবায়নে ট্রেনিং ম্যানুয়াল, ট্রেনিং মডিউলের উন্নত সংস্করণ, ডিজিটালাইজেশন, কর্মশালা প্রশিক্ষণ ইউনিট তৈরি, সব অবকাঠামোর আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন ডিটেইল ডিজাইন করা ও প্রাক্কলিত ব্যয় প্রস্তুত করতে পরামর্শক নিয়োগ করা হবে। বর্তমান বাজারদর বিশ্লেষণ করে পরামর্শক সেবার ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত পরামর্শক ব্যয় পুনঃপর্যালোচনা করে যৌক্তিকভাবে নির্ধারণ করা হবে।

জানা যায়, কর্মচারীদের প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে রেলওয়ে ট্রেনিং একাডেমি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ে রেলপথ ও অন্য অবকাঠামো নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। কিন্তু রেলওয়ে ট্রেনিং একাডেমি আধুনিকীকরণে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ কারণে এখানে আধুনিক প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ সম্ভব হচ্ছে না। রেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে রেলওয়ে ট্রেনিং একাডেমি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

পরিকল্পনা কমিশন ট্রেনিং একাডেমির প্রকল্পের কিছু ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন করেছে। তার মধ্যে অন্যতম প্রকল্পে ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে ডাবল কেবিন পিকআপ কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় এ প্রকল্পে যানবাহন কেনা যাবে না। পরামর্শক সেবা খাত ছাড়াও রাজস্ব ও মূলধন খাতের সব ব্যয় পুনঃপর্যালোচনা করে যৌক্তিকভাবে নির্ধারণ করতে হবে। প্রকল্পের প্রস্তাবিত পরামর্শক সেবা খাতের পরিমাণ ও ব্যয়সহ রাজস্ব, মূলধন খাতের ব্যয়ও পুনঃপর্যালোচনা করতে বলা হয়েছে। ডাবল কেবিন পিকআপ কেনার খাতটিও বাদ দিতে হবে।

রেলওয়ে প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. বেলাল হোসেন সরকার বলেন, পরিকল্পনা কমিশনে বাংলাদেশ রেলওয়ে একাডেমি আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে নকশা প্রণয়ন প্রকল্পের আওতায় প্রস্তাব করা হয়েছে। এ প্রস্তাবের ওপর একটি পিইসি (প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি) সভা করেছি। সভা শেষে পরিকল্পনা কমিশন কিছু নির্দেশনা দিয়েছে। সেটার আলোকেই কাজ করা হবে। এখনো ফাইনাল বা চূড়ান্ত হয়নি। আমরা প্রকল্পটি পুনরায় সংশোধন করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠাবো।

পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (রেল পরিবহন উইং) কবির আহামদ বলেন, আমরা প্রকল্পটি নিয়ে একটা সভা করেছি। এখানে দেখেছি পরামর্শক খাতে বাড়তি ব্যয় চাওয়া হয়েছে, যেটা আমাদের কাছে অযৌক্তিক মনে হয়েছে। রেলওয়ের কাছে একটা ব্যাখ্যা চেয়েছি। তারা কী কারণে বা কেন এত টাকা পরামর্শক খাতে ব্যয় চেয়েছে তা জানতে চাওয়া হয়েছে। এই ব্যাখ্যা হাতে পাওয়ার পরেই আমরা পরবর্তী পদক্ষেপ নেবো।

বেলাল হোসেন সরকার বরখাস্ত হওয়ার ফিরিস্তি

২০১৮-১৯ অর্থবছরে রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন স্টেশনের মালপত্র কেনাকাটায় প্রায় ২০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (সিওএস) বেলাল হোসেন সরকার। তদন্তের মাধ্যমের তার দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়ায় ২০২০ সালের ২৯ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে বাংলাদেশ রেলওয়ের সচিব সেলিম রেজার স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেন সরকারকে বহিষ্কার করে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেন সরকার সিওএস-কন্ট্রোলার অব স্টোরস অফিস (পূর্ব) বাংলাদেশ রেলওয়ের সিওএস (পশ্চিম) হিসেবে রাজশাহীতে থাকাকালে রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের পণ্য ক্রয়ে আর্থিক অনিয়মের বিষয়ে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (অডিট ও আইসিটি) ড. ভুবন চন্দ্র বিশ্বাসের তদন্ত টিম সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র, ক্রয় করা পণ্য এবং বাজার থেকে সরেজমিন সংগৃহীত পণ্যের নমুনার বাজারদর যাচাই এবং পারিপার্শ্বিক বিষয়াদি বিবেচনাপূর্বক তদন্ত করে বেলাল হোসেন সরকারের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য-প্রমাণ পায়।

দায়িত্বশীল কর্মকর্তার এমন ঘটনা সরকারি (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ২০১৮-এর ৩(খ) ও ৩(ঘ) বিধি মোতাবেক অসদাচরণ ও দুর্নীতির পর্যায়ভুক্ত এবং গুরুদ-যোগ্য অপরাধ। তাই একই আইনের ১২(১) বিধি মোতাবেক তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

সূত্র জানায়, অনিয়ম-দুর্নীতি ও রাজস্বের অর্থ হরিলুটের তথ্য প্রকাশ্যে এলে ২০২০ সালের নভেম্বর মাসের শেষদিক থেকে অফিসে আসা ছেড়ে দেন প্রকৌশলী বেলাল হোসেন সরকার। পরে ১৫ দিনের ছুটি দেখিয়ে কাজে যোগদান করলেও বাকি ১৫ দিন তিনি অফিস করেননি। এ অবস্থায় ২৯ ডিসেম্বর বরখাস্ত হন তিনি।

সূত্র জানিয়েছে, বরখাস্তের পর বেলাল উদ্দিন সরকার ২০২১ সালের ৭ জানুয়ারি বাংলাদেশ থেকে কানাডায় পাড়ি জমিয়েছেন। তবে এ বিষয়ে রেলওয়ের কোনো কর্মকর্তা সরাসরি মন্তব্য করতে রাজি নন।

সূত্র জানায়, বরখাস্তের পর বেলাল উদ্দিন সরকার ২০২০ সালের নভেম্বর মাসে কানাডায় পালিয়ে যাওয়ার চিন্তা করেন। তবে ডিসেম্বর মাসে বরখাস্ত আদেশ হলে এ সিদ্ধান্ত নিতে সময়ক্ষেপণ করেননি। তবে অন্য একটি সূত্র বলছে, বেলাল কানাডায় নয় জনগণের রাজস্বের টাকা হরিলুট করায় ফৌজদারি মামলা ও গ্রেফতার এড়াতে দেশেই লুকিয়ে ছিলেন তিনি।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে মালামালের বাজার যাচাই, প্রাক্কলন প্রণয়নকারী, টেন্ডার আহ্বান ও পণ্যের মূল্য নির্ধারণসহ সব কার্যক্রম সিওএস বেলাল হোসেন সরকারের দফতরে হয়। এ ছাড়া ক্রয় প্রক্রিয়ায় কর্তব্যে অবহেলা, অদক্ষতা এবং আর্থিক অনিয়ম-দুর্নীতিতে সরাসরি সহায়তাকারী হিসেবে আরও ১৩ কর্মকর্তার নাম এসেছে।

রেলের মালামাল ক্রয়ে দুর্নীতিতে জড়িত থাকার পরও অদৃশ্য ক্ষমতার বলয় ব্যবহার করে স্বপদে বহাল তবিয়তে ছিলেন তৎকালীন পূর্বাঞ্চল রেলের সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (সিওএস) বেলাল হোসেন সরকার, তৎকালিন এসিওএস কন্ট্রোলার অব স্টোরস অফিস (পশ্চিম) মো. জাহিদ কাওছার ও বেলালের দুর্নীতির সাম্রাজ্যের অঘোষিত ক্যাশিয়ার-কাম উচ্চমান সহকারী নুরুল আমিন তালুকদার। পরে ২০২০ সালের ২৯ ডিসেম্বর তাদের সাময়িক বরখাস্ত করে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।

এসএস/এমএফ

0Shares

আরো সংবাদ