ভুয়া চাকরি বাণিজ্যে কোটিপতি রেল কর্মচারী!


১২ মে, ২০২৩ ১২:৩৪ : পূর্বাহ্ণ

হাতের নাগালে বাংলাদেশ রেলওয়েতে সরকারি চাকরি। পূর্বে আবেদন না করলেও সমস্যা নেই। চুক্তিবব্ধ হলেই সরাসরি নিয়োগপত্রসহ চাকরিতে যোগদানের ব্যবস্থা। তবে এরজন্য পদে ভিন্নতায় চট্টগ্রাম রেলওয়ের মো. হোসাইন নামে এক তৃতীয় শ্রেনীর কর্মচারিকে গুনতে হচ্ছে মোটা অংকের ঘুষ। আর এই ঘুষের টাকায় আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে হোসাইন। আর নিঃশ্ব হয়েছেন চাকরি প্রত্যাশি বেশকিছু বেকার যুবক।

অভিযোগ রয়েছে–প্রকাশ্যে এমন প্রতারণা করেও রয়েছেন বহাল তবিয়তে। রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের জেলা সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক শিপিং এর কার্যালয়ে ‘ম্যাটারিয়াল চেকার’ (এমসি) হিসেবে কর্মরত আছেন তিনি। এছাড়াও চট্টগ্রামের বিভিন্নস্থান ও নামীদামি শপিংমলে গড়ে তুলেছেন কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। নিজের ও স্ত্রী-সন্তানের নামে গড়েছেন স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি।

সংশ্লিষ্টরা জানান– তিনি ‘অফিস সহকারী’ পদের জন্য গ্রহণ করেন ৯ লক্ষ টাকা। ‘পোর্টার’ ৭ লক্ষ, আর ৩ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা নেন ‘গেইট কিপার’ পদের চাকরির জন্য। দেশের চাকরির মহাসংকটের মধ্যে মো. হোসাইনের চাকরির দোকানের খবর পেয়ে ভিড় জমাচ্ছেন গ্রামের সহজ সরল ও বেকার যুবকরা।

যদিও হোসাইন কাউকে রেলওয়েতে চাকরি নিয়ে দিতে পারার নজির না থাকলেও চাকরি দেওয়ার চুক্তিতে মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নিয়ে প্রতারণা করার। গত এক দশকে তার বিরুদ্ধে অন্তত অর্ধশত অভিযোগ দাঁড় হয়েছে। এরমধ্যে অনেকে মো. হোসাইনকে চাকরির জন্য টাকা দিয়ে প্রতারণার শিকার হয়ে আদালতে মামলা ঠুকেছেন।

আবার অনেকে নিকট আত্মীয় বা পরিচিতজনের সহযোগিতায় কিছু টাকা ফেরৎ পেয়েছেন। তবে অধিকাংশ চাকরি প্রার্থীকে কৌশলে নিজেদের আস্তানায় ডেকে নিয়ে আগ্নেয়াস্ত্রের মুখে জিম্মিকরে টাকার বিপরীতে দেওয়া জামানতের চেকসহ সকল প্রমান কেড়ে নেয় হোসাইন ও তার সাঙ্গু-পাঙ্গুরা এমন অভিযোগ ও করেন ভুক্তভোগীরা।

সম্প্রতি চাকরির প্রলোভনে মো. হোসাইনকে টাকা দিয়ে প্রতারণা শিকার ও প্রাণ নাশের হুমকিতে থাকা মো. সিরাজুল ইসলাম, নূর আলম ও মো. আব্দুর রাজ্জাক সুমন নামে তিন যুবক অভিযোগ দিয়েছেন বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহা ব্যবস্থাপক (জিএম) বরাবরে। একইভাবে হোসাইনের প্রতারণা ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিস্তারিত তুলে ধরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন দুর্নীতি দমন কমিশন চট্টগ্রামের উপপরিচারক বরাবরেও।

পঞ্চগরের মো. নূর আলম অভিযোগে উল্লেখ করেন, ৭ লক্ষ টাকায় “পোর্টার” পদে চাকরি দেওয়ার কথা বলে মৌখিক চুক্তি করেন হোসাইন। এরমধ্যে তাকে নগদ প্রদানকরা হয় ৪ লক্ষ টাকা। অবশিষ্ট্য টাকা চাকরির নিয়োগপত্র বুঝে পেয়েই দেওয়ার কথা ছিল।

নুরুল আলম আরও জানান, নগদ চার লক্ষ টাকার বিপরীতে জামানত হিসেবে মো. হোসাইন দুই লক্ষ করে দুই চেকে মোট ৪ লাখ টাকার চেক প্রদান করেন নুর আলমকে। তবে টাকা ও চেক নেওয়ার পর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও চাকরি না পেয়ে নুরুল আলম প্রদানকৃত টাকা ফেরৎ চান।

পরে গত ১৮ রমজান সেই টাকা ফেরৎ দেওয়ার কথা বলেন নগরের আলকরণে উত্তরা ব্যাংকের পার্শ্ববর্তী একটি অফিসে ডেকে নিয়ে অস্ত্রের মুখে নুর আলমও তার চাচা আব্দুল কাদেরকে জিম্মিকরে চার লাখ টাকার চেক ছিনিয়ে নেয়। এ সময় নুর আলম টাকা বুঝে পেয়েছে অস্ত্রধরে এমন অভিনয় করতে বাধ্যকরে তারা। আর সেই দৃশ্য দুই সন্ত্রাসীকে দিয়ে নিজেদের মোবাইলে ভিডিও ধারণ করান মো. হোসাইন।

কান্না জড়িত কন্ঠে নূর আলম বলেন, দুইটি চেক কেড়ে নিয়ে তা ছিড়ে টুকরো টুকরো করে সন্ত্রাসীরা নূর আলম ও আব্দুল কাদেরের মুখের দিকে ছুড়ে মারে। এই বিষয়ে কোথাও কাউকে কিছু না বলার জন্য তারা সেই সময় তাদের শাসিয়ে দেয়। এমনকি আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা বা অন্যকাউকে এই বিষয়ে কিছু বললে দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে তুলে নিয়ে গায়েব করে ফেলবে বলে হুমকি দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।

অপর অভিযোগকারী মো. সিরাজুল ইসলাম অভিযোগ উল্লেখ করেন, ‘অফিস সহকারী’ পদে চাকরির ৯ লক্ষ টাকা কন্টাক্ট করেন হোসাইন। এরমধ্যে হোসাইন তিন লক্ষ টাকা নগদ এবং ৬ লক্ষ টাকার একটি চেক নেন সিরাজুল ইসলামের কাছ থেকে। আর সিরাজুল ইসলামের নগদ তিন লক্ষ টাকার বিপরীতে মো. হোসাইন তার আইএফআইসি ব্যাংকের হিসাবের একটি চেক সিরাজুল ইসলামকে প্রদান করেন। তবে চাকরি দেওয়ার চুক্তিতে টাকা নেওয়ার বিষয়টি হোসাইন অস্বীকার করেছেন।

মো. আব্দুর রাজ্জাক নামক বান্দরবানের লামার এক যুবক অভিযোগে উল্লেখ করেন, গেইট কিপার পদে চাকরির জন্য ৩ লক্ষ ৭০ হাজার টাকায় তার সঙ্গে মৌখিক চুক্তিকরেন মো. হোসাইন। এরমধ্যে প্রথমে নগদ দেড় লাখ টাকা নেন। অবশিষ্ট্য ২ লক্ষ ২০ হাজার চাকরির নিয়োগপত্র বুঝিয়ে দেওয়ার সময় প্রদানের শর্তে আব্দুর রাজ্জাকের বড়ভাই আব্দুল কাদেররের একটি চেক লিখিয়ে নেন। হোসাইন বর্তমানে সেই টাকাও অস্বীকার করে চলেছেন।

শুধু নূর আলম, সিরাজুল ইসলাম বা আব্দুর রাজ্জাকই নয়! চাকরি দেওয়ার কথা বলে চট্টগ্রামের বাঁশখালীর এক যুবকের কাছ থেকে ৪লক্ষ টাকা নেন হোসাইন। ১৬ লক্ষ টাকা নিয়ে চাকরি না দেওয়ায় নগরের রিয়াজউদ্দিন বাজার ব্যবসায়ি সমিতিতে একটি অভিযোগ বিচারাধীন। প্রতারণার শিকার চট্টগ্রাম আদালতে অপর এক যুবকের দায়েরকৃত মামলা ধামাচাপা দিয়ে হোসাইন কোনোভাবে রক্ষাপান। এভাবে আরও চাকরি প্রত্যাশি ১০/২০ জন থেকে কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় হোসাইন।

রেলওয়ের জেলা সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক শিপিং (পূর্ব) এর দপ্তর সূত্রে জানা যায়, মো. হোসাইন চাকরি বিকিকিনি করেই ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরের ‘আলকরণ এলাকায় চারগন্ডা জমিসহ পাঁচতলা একটি ভবন’ ক্রয় করেছেন। যার বাজার মূল্য আড়াই কোটি টাকা।

আমির এন্ট্রারপ্রাইজ” নামে নগরের কোতোয়ালী থানাধীন ৯২, স্টেশন রোডের মহিউদ্দিন মাকের্টের নীচ তলায় ৩, রিয়াজউদ্দিন বাজারের আরএস রোডের আনন্দবিতানে ১৫১/১ ও আগ্রাবাদ চৌমুহুনীর কর্ণফুলী মার্কেটের ২৫৯ নম্বর সিরিয়ালে চারটি দোকান গড়ে তুলেছেন তিনি। একইভাবে ৫/৬, সদরঘাট রোডে ‘আমিন ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি, বিটিএল লুব্রিকেন্টস্ ও ঈগলু আইসক্রিমের’ চট্টগ্রাম বিভাগীয় ডিলারশীপ নিয়ে গড়েছেন আরও কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।

যদিও সরকারি চাকরি বিধি অনুযায়ি কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারি চাকরিকরা অবস্থায় আর্থিক লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসা কোন কিছুতেই সম্পৃক্ত হওয়ার নিয়ম নেই। এমনকি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের আত্মীয়-স্বজনও ব্যবসা করতে হলে সংশ্লিষ্ট সংস্থা হতে আগে অনুমতি নিতে হবে। তবে সরকারের এই চাকরি বিধিকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে একে একে সাতটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন মো. হোসাইন।

এই বিষয়ে মোহাম্মদ হোসাইনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি সকালের-সময় বলেন, আমি চাকরি প্রত্যাশীদের কাছ থেকে যে টাকা নিয়েছি সেটাকা বিভিন্ন মেয়াদে ফেরত দিয়েছি। এবং ৭ ব্যবসায়ি প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার ৭ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান আছে সেটা ঠিক, ২৫ হাজার টাকার বেতনে চলে না, শহরে ছেলে-মেয়ের লেখাপড়া করে বেঁচে থাকা খুব কষ্ট হয়ে যাচ্ছে, তাই ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দিয়ে সচল ভাবে জীবন-যাপন করছি।

মো. হোসাইনের বাড়ী চকরিয়া বদরখালীতে, তিনি বিএনপি সরকারের আমলে চকরিয়ার তৎকালীন সংসদ সদস্য (এমপি) সালাউদ্দিন আহমেদ এর সহযোগিতায় চাকরিটা পেয়েছেন। তার স্ত্রী ও রেলে চাকরি করেন। তবে—এই বিষয়ে নিউজ না করতে প্রতিবেদকে অনুরোধ করনে তিনি।

বিষয়টি নিয়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান সরঞ্জাম কর্মকর্তা ফরিদ আহমেদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি সকালের-সময়কে বলেন, মো. হোসাইন যদি চাকরি প্রত্যাশি কারো কাছ থেকে টাকা নিয়ে থাকে তাহলে তার বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রিয় পাঠক—মো. হোসাইনের আরও ফিরিস্তি দ্বিতীয় পর্বে দেখুন।

এসএস

0Shares

আরো সংবাদ