বান্দরবান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলে চলছে হরিলুটের মহোৎসব!


১২ মে, ২০২৪ ১:৪৪ : পূর্বাহ্ণ

বান্দরবান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের যত কাজের টেন্ডার হয় সবই স্থানীয় জনস্বাস্থ্যের মাফিয়া হিসাবে পরিচিত মোজাম্মেল হক বাহাদুরের। কিন্তু তিনি এজন্য নিজের লাইসেন্স ব্যবহার না করে ৭ পার্সেন্ট সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিতে ইউ.টি মং ও রতন সেন তঞ্চঙ্গ্যা নামের দুটি উপজাতি ঠিকাদারের লাইসেন্স ব্যবহার করেন।

জনস্বাস্থ্যের বিভিন্ন প্রকল্পের নথিতে দেখা গেছে, বান্দরবানে শতাধিক লাইসেন্স থাকলেও অলৌকিকভাবে এই দুই লাইসেন্স ছাড়া জনস্বাস্থ্যের কোনো কাজ অন্য কোনো ঠিকাদার পায় না। বান্দরবান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরকে যেন পারিবারিক সম্পত্তি বানিয়ে ফেলেছেন বান্দরবান জেলা পরিষদ সদস্য মোজাম্মেল হক বাহাদুর ও জনস্বাস্থ্যের নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গোপন আতাতের মাধ্যমেই এই টেন্ডার জমা দেওয়া হয় এবং বাকিদের কোনো শিডিউলই কিনতে দেওয়া হয় না। তবে যাদের শিডিউল কিনতে দেওয়া হয় না তাদের একটা পার্সেন্টেজ যে কাজটি পাবে সে বণ্টন করে দিয়ে থাকে। বান্দরবান জনস্বাস্থ্যে অধিদপ্তরে দীর্ঘদিন ধরেই এই অনিয়ম-দুর্নীতির চলে আসলেও নিরব ভূমিকা পালন করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা যায় বান্দরবান জনস্বাস্থ্যের প্রত্যেক প্রকল্প থেকে নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপমকে ১০% করে কমিশনের টাকা দেওয়ার অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। তবে তিনি এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। আর এদিকে জেলা পরিষদের সদস্য হিসাবে মোজাম্মেল হক বাহাদুরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বান্দরবান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর দেখাশোনা করার জন্য।

কিন্তু— তিনি সে দায়িত্ব পালন না করে বনে গেছেন ঠিকাদার। আর নির্বাহী প্রকৌশলী তাকে সব দিক দিয়ে সুযোগ-সুবিধা দিয়ে যোগসাজশে লুটপাট করছেন সরকারের শতকোটি টাকা। এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, যে দুই ঠিকাদারের লাইসেন্স ব্যবহার করা হচ্ছে, তারাও জানে না তাদের নামের লাইসেন্স দিয়ে কে কোথায় কী কাজ করছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই দুই লাইসেন্সের মালিক রতন সেন তঞ্চঙ্গ্যা ও ইউ টি মং। দুজনকেই তাদের লাইসেন্স ব্যবহারের জন্য মোটা অঙ্কের অর্থ দিতে হয়। ঠিকাদার রতন সেন তঞ্চঙ্গ্যা এসব বিষয় স্বীকারও করেছেন। তবে তিনি বলেছেন, কাজগুলো তার লাইসেন্স ব্যবহার করে হয়, কিন্তু তিনি কাজগুলো করেন না। ঠিকাদার ইউ টি মং-এর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তিনি ব্যস্ততার কথা বলে ফোন কেটে দেন। বান্দরবান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলের বিভিন্ন প্রকল্পের বেশকিছু নথি প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। এতে প্রায় শতকোটি টাকার প্রকল্প উল্লেখ রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এবং একক আধিপত্য বিস্তার করে প্রকল্পগুলোর কাজ করেছেন মোজাম্মেল হক বাহাদুর। প্রকল্পগুলোতে মোজাম্মেলের সঙ্গে ছিলেন তার আপন দুই ভাই রুবেল ও জহির এবং তার দুজন সহযোগী মোস্তফা হুজুর ও কামাল। তাদের দিয়েই মূলত মোজাম্মেল হক কাজগুলো করান। তার বেশ কয়েকজন কর্মচারীও রয়েছে যারা বিভিন্ন সাইটগুলো দেখাশোনা করেন। মূলত এভাবেই এই কয়েকজন মিলে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরকে গিলে খাচ্ছেন।

নথিতে উল্লেখ, একটি প্রকল্প হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ৪৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকার বান্দরবান জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পাথুরে এলাকার জি.এফ.এস. ও উপজেলার সব এলাকায় ডিপ টিউবওয়েলের মাধ্যমে সুপেয় পানি সরবরাহকরণ।

অন্য আরেকটি প্রকল্প হচ্ছে, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের ৪৪ কোটি ২৫ লাখ ১০০ টাকার একই অধিদপ্তরকে বান্দরবান পৌরসভা ও বান্দরবানের তিন উপজেলা সদরসহ পার্শ্ববর্তী এলাকাসমূহ নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন প্রকল্প।

এসব প্রকল্পে সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় শতকোটি টাকার পুরো প্রকল্পই বৃথা এবং অধিকাংশ প্রকল্পই অকেজো হয়ে আছে। বাসিন্দাদের কোনো কাজেই আসছে না এসব প্রকল্প। কিছু কিছু জায়গায় প্রকল্পের কাজই করেনি আবার কিছু জায়গায় কাজ অর্ধেক করে প্রকল্পের টাকা তারা ভাগবাটোয়ারা করে তুলে নিয়েছে।

এদিকে প্রকল্পগুলোতে তাদের অনিয়মের কারণে বান্দরবানে দেখা দিয়েছে সুপেয় পানি সংকট। আলীকদম উপজেলা সদরের একটি প্রকল্পের ব্যাপারে এলাকাবাসী জানান, উদ্বোধনের দিন কোনোমতে পানি পাওয়া গিয়েছিল। এরপর থেকে আর পানির দেখা মেলেনি।

লামা সদর ইউনিয়নের বইল্লারচর এলাকায় সরেজমিন গিয়ে জানা যায়, প্রায় ৫০ ভাগের মতো কাজ করার পর ঠিকাদার আর আসেনি। প্রকল্প এতটুকুতেই অকেজো হয়ে পড়ে আছে। বিষয়টা নিয়ে এলাকাবাসী বান্দরবান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন। কিন্তু অধিদপ্তর থেকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

লামা পৌরসভার টিটিএন্ডডিসি এবং আজিজনগর বাজারে অবস্থিত আরও দুটি প্রকল্প পুরোটাই অকেজো হয়ে আছে। এলাকাবাসী জানান, উদ্বোধনের প্রথম দিন পানি পাওয়ার পর তারা আর কোনোদিন পানি পাননি।

বান্দরবান সদর ইউনিয়নের সুয়ালক মাঝেরপাড়া, হাতিভাঙ্গাপাড়ার প্রকল্পগুলোও বর্তমানে অকেজো অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এলাকাবাসী জানায়, যেখানে ৫-৬শ ফুট গভীরে গিয়ে ডিপ বসানোর কথা, সেখানে তারা ১-২শ ফুটের মধ্যে কাজ শেষ করাতে এই প্রকল্পগুলো অকেজো হয়ে আছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ইউপি চেয়ারম্যান জানান, এই প্রকল্পগুলোতে যে বরাদ্দ আসছে তার ৫০ শতাংশও কাজ করেনি ঠিকাদাররা। যার কারণে শতকোটি টাকার প্রকল্পগুলো কাজে আসছে না।

এ ব্যাপারে মোজাম্মেল হক বলেন, জনস্বাস্থ্যের প্রকল্প সবগুলোর কাজ আমি করিনি, লাইসেন্স দুটি আমি ছাড়াও অনেকেই ব্যবহার করে। আমরা অনেক কষ্টে আছি, যেটা আপনাদের বলতে পারছি না। আমাদেরও অনেক কিছু মেনটেইন করতে হয়। আপনারা নিউজ করলে এডিবির একটা ফান্ড আসার কথা আছে। সেটিও আসা বন্ধ হয়ে যাবে।

জনস্বাস্থ্যের বিভিন্ন প্রকল্পে ঘুরেফিরে দুটি লাইসেন্সই কেন ব্যবহার করা হয় এমন প্রশ্নে সদুত্তর দিতে পারেননি মোজাম্মেল হক ও নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দে। নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, আমি দশ বছর ধরে এক্সইএন (এলজিইডি জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী)। আমি সব বুঝি। আপনি বাকি ঠিকাদারদের ডেকে এনে টেন্ডার মারতে বলেন। আপনিও লাইসেন্স বানিয়ে কাজ করেন।

সূত্র—ডিজে

0Shares

আরো সংবাদ