বান্দরবানের লামা বন বিভাগের অধীনে থাকা সরকারের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের তিন কোটি টাকার মূল্যবান সেগুন গাছ বিক্রি করে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে ওই বনের এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। কাঠ ব্যবসায়িরা কিনে নেয়া এসব গাছ ইতিমধ্যে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের কয়েকটি স্থান থেকে কয়েক দফায় কেটে নিয়ে গেছেন। গাছ বিক্রির ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর বিভাগীয় বন কর্মকর্তার দপ্তর হতে তিন সদস্যসের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
লামা বিভাগীয় বন কর্মকর্তার দপ্তরের সিনিয়র বন কর্মকর্তা হাবিব উল্লাকে আহবায়ক এবং লামার সদর রেঞ্জ কর্মকর্তাকে কমিটির সদস্য সচিব করা হয়। এছাড়া ডলুছড়ি রেঞ্জ কর্মকর্তাকে কমিটির সদস্য করা হয়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত কাজ শেষ করে প্রতিবেদন দায়েরের জন্য কমিটিকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন লামা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. আরিফুল হক বেলাল। তিনি বলেন, সংরক্ষিত বন থেকে গাছ পাচারের ঘটনা জানতে পেরে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দিয়েছি। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পরই জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। সে যেই হোক, সরকারি বন বিক্রি/চুরি করে পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলে জানান আরিফুল হক বেলাল।
বনের সংশ্লিষ্টরা জানান, কোনো বন কর্মকর্তা এই প্রথম সরাসরি ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে সরকারি সংরক্ষিত বনের কাটা নিষিদ্ধ গাছ বিক্রি করে কয়েক কোটি টাকা আত্মসাত করলেন। আর এই ঘটনার মধ্যদিয়ে ওই বনাঞ্চলে থাকা সরকারের হাজার কোটি টাকার সেগুন গাছের নিরাপত্তা নিয়ে এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে! অভিযুক্ত জুলফিকার আলী লামা বন বিভাগের আওতাধীন আলীকদম তৈন রেঞ্জ কর্মকর্তার দায়িত্বে রয়েছে।
যদিও জুলফিকার আলীর দাবি, এসব গাছ বিক্রি নয়, চুরি হয়ে গেছে। তিনি বলেন, সংঘবব্ধ চোর চক্র গহিন বনের মধ্য থেকে বিশাল বিশাল সেগুন গাছ কেটে নিয়ে গেছে। যেসব গাছের বয়স ৪০ হতে ৫০ বছর পর্যন্ত। আর এসব গাছ পরিবহনের জন্য সংরক্ষিত এই বনাঞ্চলের মধ্যেই স্কেভেটর দিয়ে বন ও পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি করেছে সেই চোরেরা। সম্প্রতি বনের গাছ পাচারের খবর জানাজানি হওয়ার পর বিভাগীয় বন কর্মকর্তাসহ (ডিএফও) উর্ধ্বতন কিছু কর্মকর্তা বনাঞ্চল পরির্দশনে গেলে এই রাস্তাটি সবার দৃষ্টিতে আসে।
জুলফিকারের ভাষ্য, গত ছয় মাস আগে তৈন রেঞ্জ কর্মকর্তা হিসেবে তিনি যোগদান করেছেন। সেই থেকে স্থানীয় বন বিট কর্মকর্তা মোজাম্মেল হক ও বাগান মালি অলক বাবু এতদিন গাছ চুরি সম্পর্কে তাকে কিছুই জানান নি। তবে সম্প্রতি গাছ পাচারের খবর বিভিন্ন মাধ্যমে জানাজানি হওয়ার পর উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। সেই কমিটি ইতিমধ্যে ঘটনাস্থলে গিয়ে গাছ চুরির প্রমানও পেয়েছে। চুরি যাওয়া সামান্য কিছু কাটা গাছ জব্দ করা হয়েছে।
তবে—আলীকদম তৈন রেঞ্জের সদর বিট কর্মকর্তা মোজাম্মেল হক এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, গাছ নাই হয়ে যাওয়ার বিষয়ে রেঞ্জ কর্মকর্তা জুলফিকার স্যার ই ভালো বলতে পারবেন। কিছু জানার থাকলে ওনার সাথে কথা বলেন।
নাম প্রকাশ না করা শর্তে বনের একাধিক কর্মকর্তা জানান, জুলফিকার আলী গত ছয়মাস পূর্বে কক্সবাজারের মহেশখালী থেকে বদলী হয়ে লামা বন বিভাগের আওতাধিন তৈন রেঞ্জ কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেছেন। এর কিছু দিন না যেতেই বেপরোয়া হয়ে উঠেন তিনি। নিজেকে চট্টগ্রাম আঞ্চলিক বন সংরক্ষক বিপুল কৃষ্ণ দাশের খাস লোক হিসেবে পরিচয় দিয়ে বন বিভাগে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন তিনি। যখন তখন আঞ্চলিক বন সংরক্ষকের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলে দেখান তাদের সম্পর্কের মাত্রা কত? আর এর মাধ্যমে তিনি স্থানীয় বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারিদের মধ্যে এক প্রকার ভীতি সৃষ্টি করেন।
এসব কর্মকর্তা আরও বলেন, জুলফিকার আলী যোগদানের তিন মাস না যেতেই তৈন সংরক্ষিত বনাঞ্চলের তিন শতাধিক কাটা নিষিদ্ধ সেগুনগাছ কাঠ ব্যবসায়িদের নিকট বিক্রি করে দিয়েছেন। ব্যবসায়িরা দীর্ঘ সময় নিয়ে এসব গাছ কেটে লামা ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের বনপুর ও কাঠালছড়া দিয়ে চকরিয়ার মালুমঘাটের দিকে নিয়ে গেছেন। কাঠ ব্যবসায়িরা গাছ পরিবহনের জন্য স্কেভেটর দিয়ে সংরক্ষিত বন ও পাহাড় কেটে ট্রাক চলাচল করার মতো রাস্তাও তৈরি করে নিয়েছে।
লামা বিভাগীয় বন কর্মকর্তার (ডিএফও) দপ্তর সূত্রে জানাগেছে, ১৯৮৪, ৮৫ ও ৮৬ সালের দিকে লামা ও আলীকদমের দক্ষিণ-পূর্ব এলাকা তৈন মৌজায় ৫৭ হাজার একশত ৮৪ একর জায়গায় সরকারি অর্থায়নে সেগুন বাগান সৃজন করা হয়। নিয়মানুসারে সে সময় থেকে লামা বন বিভাগের তৈন রেঞ্জ এই বন সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষনের দায়িত্বে আছে।
অপরদিকে এক লাখ দুই হাজার ৮৫৪ একর আয়তনে মাতামুহুরী নদীর অববাহিকায় মাতামুহুরী সংরক্ষিত বনাঞ্চল সৃষ্টি করা হয় এরও কয়েক দশক পূর্বে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে মাতামুহুরী সংরক্ষিত বনাঞ্চল উজার করার পর এবার তৈন সংরক্ষিত বনাঞ্চল ধ্বংস যজ্ঞ চলছে।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক বন সংরক্ষক বিপুল কৃষ্ণ দাশ বলেন, গাছ কোথায় গেছে, কি হয়েছে তা তদন্তে বেড়িয়ে আসবে। এই জন্য তিন সদস্যের কমিটি করে দেয়া হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন হাতে পেলেই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনের আওতায় আনা হবে।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে আঞ্চলিক এই বন সংরক্ষক বলেন, বনের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারি সবাই আমার কাছের। সবাই আমার লোক। তবে আমার কাছের বা সম্পর্ক আছে পরিচয় দিয়ে বন, মাটি বিক্রি করে দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। কেউ অপরাধ করলে, তার শাস্তি তাকে পেতেই হবে। সে যদি আমার বাপ বা ভাইও হয়ে থাকে। অপরাধিদের বিষয়ে আমার পক্ষ থেকে জিরো টলারেন্স।
এসএস/এমএফ