পার্বত্য জেলা রাঙামাটির সরকারি খাদ্য পরিবহনের ঠিকাদার নিয়োগে নয়ছয়ের অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত জানাতে পারেনি জেলার খাদ্য নিয়ন্ত্রকের দপ্তর। পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধি অনুযায়ী প্রতি দুই বছর পর দরপত্র আহ্বান করে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ করার কথা থাকলেও গত চার বছর পর্যন্ত তা করা হয়নি।
২০১৮-২০১৯ অর্থ বছরে নিয়োগকৃত বিতর্কিত ঠিকাদারদের বারবার সময় বাড়িয়ে কাজ দিয়ে যাচ্ছে খাদ্য অধিদপ্তর। সর্বশেষ গত ২৩ জুন পুরোনো বিতর্কিত এসব ঠিকাদারদের মেয়াদ চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, একইভাবে পার্বত্য বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে গোপন চিঠিতে সময় বাড়িয়ে কাজ দিয়ে যাচ্ছে সরকারের এই সংস্থাটি। চার বছর আগে নিয়োগকৃত এসব ঠিকাদারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় পরিবহন না করে সরকারি চাল-গম বাইরে বিক্রির সহায়তার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। আবার অনেকে নিয়োগের সময় ভুয়া ঠিকাদার সনদ ব্যবহার করে ঠিকাদার তালিকাভুক্ত হয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বেনামি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে চট্টগ্রামের দেওয়ানহাট ও হালিশহর সিএসডি থেকে চাল এবং পতেঙ্গা সাইলো থেকে গম দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিবহনের কাজটিও নিয়ন্ত্রণ করছেন মূলত খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা। অপরদিকে নতুন কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের লাইসেন্স ইস্যুর উদ্যোগ নিচ্ছেন না সংশ্লিষ্ট এ সংঘবব্ধ চক্র।
অনিয়মের বিষয়ে জানার জন্য বান্দরবান জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কানিজ জাহান বিন্দুর মুঠোফোনে বেশ কয়েকবার কল দেওয়া হলেও এ প্রসঙ্গে বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। আর এদিকে চট্টগ্রাম আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. জহিরুল ইসলাম খানের মুঠোফোনে কল দেয়া হলে তিনিও কল রিসিভ করেনি।
আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের স্বাক্ষরিত একটি আদেশে ২৩ জুনের ইস্যু করা স্মারকে দেখা যায়, ২০১৮-১৯ মেয়াদে দুই বছরের জন্য নিয়োগ পাওয়া ঠিকাদারদের মেয়াদ ২০২০ সালের ৩০ জুন শেষ হয়। এরপর থেকে ৩ মাস পর পর মেয়াদ বাড়ানো হয়। এরই ধারাবাহিকতায় দশমবারের মতো জারিকৃত আদেশে আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। বিগত পত্রগুলোতে করোনার অযুহাত দেখালেও এবার ‘অনিবার্য কারণে’ এ মেয়াদ বাড়ানো হয় বলে অফিস আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকগণ বলছেন, পিপিআর অনুযায়ী ঠিকাদার অর্ন্তভুক্তি ও নিয়মিত টেন্ডারের মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতায় যখন ফিরতে বাধা, সেখানে অনিয়মকে নিয়মে পরিণত করা হয়েছে। এটা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। সরকারের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার (খাদ্য অধিদপ্তর) ভেতরে-বাইরে সংঘবব্ধ চক্রের নিকট জিম্মি হয়ে থাকা এটাও কল্যাণকর কোনো রাষ্ট্রের জন্য সুখকর নয়।
টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এসব অনিয়ম ও দুর্নীতি কঠোর হস্তে দমনে প্রয়োজনে অতীতের সকল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের খন্ডকালীন নিয়োগ চুক্তি বাতিল করে এ কাজে রাষ্ট্রীয় পরিবহন (বিআরটিসি ট্রাক) ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।
এদিকে বিআরটিসি চট্টগ্রামের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, খাদ্য অধিদপ্তর থেকে চাহিদাপত্র পাঠালে যত ট্রান্সপোর্ট (ট্রাক) প্রয়োজন সহায়তা দেওয়া সম্ভব। তবে খাদ্য বিভাগ তো চায় না। তারা চাইলে পাবে। ঢাকায় বিআরটিসির শতশত ট্রাক অলস পড়ে আছে। খাদ্য বিভাগ চাইলে এসব ট্রাক সরকারি খাদ্য পরিবহনের কাজে ব্যবহার করতে পারে।
চট্টগ্রাম খাদ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সরকারিভাবে দেশে আমদানি করা খাদ্যশস্যের বেশির ভাগই আসে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। এ ছাড়া হালিশহরের কেন্দ্রীয় খাদ্যগুদাম ও পতেঙ্গার সাইলোতেও মজুত থাকে বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য।
সেনাবাহিনী, বিজিবিসহ বিভিন্ন বাহিনীর রেশনের চাল, গম ও সরকারি খাদ্যবান্ধব প্রকল্পের সহায়তা চট্টগ্রাম বিভাগের ১১ জেলার বিভিন্ন খাদ্যগুদামে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়। এ জন্য দূরত্ব আর যোগাযোগব্যবস্থা বিবেচনা করে ঠিকাদারদের মাইলপ্রতি পরিবহন ভাড়া দেয় খাদ্য বিভাগ। এ কাজে প্রতিটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বছরে আয় ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা।
সকালের-সময়/এমএফ