চট্টগ্রাম বন্দরের ভান্ডার শাখায় ৭ কোটি টাকার লোহার স্ক্র্যাপ মাত্র ১ কোটি ২১ লাখ টাকা বিক্রি করা হয়েছে। নামমাত্র মূল্যে কার্যাদেশ দিয়ে পুরো টাকা ভান্ডার শাখার কর্মকর্তা কন্ট্রোলার অব স্টোরস্ (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আবদুল হান্নান ও দুই প্রতিষ্ঠানের মালিক ভাগ-বাটোয়ারা করে নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে বন্দরজুড়ে তোলপাড় চলছে। জানা গেছে, এর আগেও কয়েকবার স্ক্র্যাপ নিলামের নামে কোটি টাকা লুটপাট করেছে সংঘবদ্ধ চক্রটি।
বন্দরের ভান্ডার শাখা সূত্রে জানা যায়-৩১, ৩২, ৫৮, ৫৯ ও ৬০ নম্বর পাঁচটি লটে স্ক্র্যাপ বিক্রি করা হয়। এরমধ্যে ৫৮, ৫৯ ও ৬০ নম্বর লটে স্ক্র্যাপের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। গত বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর ডাকা নিলামে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। ১৬ জানুয়ারি মেসার্স আল-আমিন এন্টারপ্রাইজকে দুই লটের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ৫৮ নম্বর লটে ৫০ টন বা ৫০ হাজার কেজি স্ক্র্যাপ দেখানো হয়।
এ লটে রয়েছে-জাহাজ ও পন্টুনের পুরাতন প্রেইট, অ্যাঙ্গেল, গার্ডার ও অকেজো মালামাল। ২৭ লাখ ৪৭ হাজার ৯০০ টাকা দাম দেখানো হয়। একইভাবে ৬০ নম্বর লটে স্ক্র্যাপের পরিমাণ একই দেখানো হয়। মালামালও একই ধরনের। ৪৩ লাখ ৪৭ হাজার ৯০০ টাকা দাম ধরা হয়। প্রকৃতপক্ষে এ দুই লটে স্ক্র্যাপের পরিমাণ প্রায় ৭৫০ টন।
কার্যাদেশ পাওয়ার পর মেসার্স আল-আমিন এন্টারপ্রাইজের মালিক আল আমিন চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্ক্র্যাপ ব্যবসায়ীর কাছে মালামাল বিক্রির চেষ্টা করেন। স্ক্র্যাপ ব্যবসায়ী আলমগীরকে তিনি ৫৮ ও ৬০ নম্বর লটের স্ক্র্যাপগুলো দেখান। তিনি জানান, ৫৮ নম্বর লটে ১৫০ টন ও ৬০ নম্বর লটে ৬০০ টনের কার্যাদেশ পাওয়া গেছে। প্রতি টন স্ক্র্যাপ ৬০ হাজার টাকা দরে আলমগীর কিনে নিতে চান। এজন্য আল আমিনকে তিনি কার্যাদেশ দেখাতে বলেন।
তবে আল-আমিন দুই লটে মাত্র ১০০ টন স্ক্র্যাপের বৈধ কাগজ দেখাতে পারেন। তাই স্ক্র্যাপ নিতে আলমগীর অস্বীকার করেন। এরপর এ খবর বাইরে প্রকাশ পায়। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী-চট্টগ্রামের সীমা স্টিল মিলের কাছে ৪ কোটি ৮৫ লাখ টাকায় স্ক্র্যাপগুলো বিক্রি করে দিয়েছেন আল-আমিন। এ নিয়ে বন্দরজুড়ে তোলপাড় চলছে।
একইভাবে চলতি বছরের ১৬ জানুয়ারি মেসার্স ইব্রাহিম ট্রেডার্সকে ৩১, ৩২ ও ৫৯ নম্বর লটের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ৩১ নম্বর লটের মালামালের দাম ২ লাখ ২৭ হাজার ৯০০ টাকা ধরা হয়। ৩২ নম্বর লটের ৭ হাজার ১১৬ কেজি স্ক্র্যাপের দাম ৩৭ হাজার ৭০০ টাকা ধরা হয়। ৫৯ নম্বর লটের স্ক্র্যাপের পরিমাণ ৯৫ টন দেখানো হয়। অথচ এ লটে স্ক্র্যাপের পরিমাণ ৩৫০ টনের বেশি। ইব্রাহিম নিজেই স্ক্র্যাপ ব্যবসায়ী হওয়ায় অন্যের কাছে মালামাল বিক্রি করেননি।
চট্টগ্রাম বন্দরের ভান্ডার শাখার একজন কর্মকর্তা জানান, ৫৮, ৫৯ ও ৬০ নম্বর লটের স্ক্র্যাপের পরিমাণ ১ হাজার ১০০ টনের বেশি। অথচ মাত্র ১৯৫ টন দেখানো হয়েছে। কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা ও দুই প্রতিষ্ঠানের মালিক স্ক্র্যাপগুলো লুটপাট করেছে।
মেসার্স আল-আমিন এন্টারপ্রাইজের মালিক আল-আমিনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করেও পাওয়া যায়নি। হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, টেন্ডারে যা পেয়েছি তা আনুমানিক হিসাবে নিয়েছি। কাগজপত্রে ১০০ টন উল্লেখ করা আছে কেন? এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, সাংবাদিককে জবাবদিহি করতে তিনি বাধ্য নন।
৭ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব ফাঁকি এবং পরিমাণ কম দেখিয়ে কেন স্ক্র্যাপগুলোর দরপত্র আহ্বান করা হয়-জানতে চাইলে এবিষয়ে বন্দরের কন্ট্রোলার অব স্টোরস আবদুল হান্নান জানান, আমি মিটিংয়ে আছি বলে লাইন কেটে দেন।
এরপর চট্টগ্রাম বন্দর সচিব ওমর ফারুকের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হলে তিনিও মিটিংয়ে আছেন বলে জানান।
এদিকে আবদুল হান্নানের লুটপাটের মহাযজ্ঞের সত্যতাও পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মঙ্গলবার (১৪ মে) দুপুরে চট্টগ্রাম বন্দরের ভান্ডার শাখায় এ অভিযানে নেতৃত্ব দেন দুদক চট্টগ্রাম-১ এর সহকারী পরিচালক মো. এনামুল হক।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার বন্দরে অভিযান চলাকালে ভান্ডার শাখার ৩১, ৩২, ৫৮, ৫৯, ও ৬০ নম্বর লটে লোহার স্ক্র্যাপসহ অন্যান্য মালামাল বিক্রির কাগজ, স্টক রেজিস্ট্রার, মুভমেন্ট রেজিস্ট্রার এবং স্টক করা মালামাল সরেজমিন পরিদর্শন করে দুদক। পরিদর্শনে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে বলে গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন দলের এক সদস্য।
এ ব্যাপারে দুদকের সহকারী পরিচালক মো. এনামুল হক বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের ভান্ডার শাখার ৭ কোটি টাকার লোহার স্ক্র্যাপ অনিয়ম দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে মাত্র ১ কোটি ২১ লাখ টাকা বিক্রি করে অর্থ আত্মসাৎ করার একটি অভিযোগের ভিত্তিতে এনফোর্সমেন্ট পরিচালনা করা হয়েছে।
এ সময় সরেজমিনে ভান্ডার শাখা পরিদর্শন করা হয়। নানান ডকুমেন্ট পর্যালোচনা করা হয়। সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র যাচাইকালে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যায়। এখন এ সংক্রান্ত যাবতীয় রেকর্ডপত্র সংগ্রহ এবং মালামালের ওজন পরিমাপ সাপেক্ষে বিস্তারিত প্রতিবেদন দুদক প্রধান কার্যালয়ের দাখিল করা হবে বলে জানান তিনি।
এসএস/এমএফ