সুপেয় পানির সংকটের কারণে উপকূলীয় জেলাগুলোয় পানযোগ্য পানি সংগ্রহে রীতিমতো লড়াই করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। তাদের কষ্ট লাঘব করতে বিভিন্ন সময়ে বেশ কিছু প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে সরকার। বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও এর কোনোটিই শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি সাফল্যের মুখ দেখেনি।
তবে—ব্যর্থতার কারণ পর্যালোচনা না করেই নেওয়া হয়েছে নতুন প্রকল্প। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২২ সালে শুরু হয় ‘উপকূলীয় জেলাসমূহে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে পানি সরবরাহ’ প্রকল্প। হাজার কোটি টাকার সেই প্রকল্প ঘিরে চলছে নানা অনিয়ম-দুর্নীতি।
২০২৫ সালে মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এরই মধ্যে গতি হারিয়েছে প্রকল্পের বাস্তবায়ন। প্রায় সব এলাকায় উপকারভোগীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে এমন অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রাম উপকূলীয় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ প্রকল্পের পিডি নুর মোহাম্মদ ও ঠিকাদার চক্রের বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ—নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের কারণে এরই মধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে অনেক পানির ট্যাঙ্ক ও ট্যাপ। আবার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রভাবশালী ও বিত্তবানরা সুপেয় পানি সংরক্ষণ সামগ্রী পাচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, উপকূলীয় জেলাসমূহে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে পানি সরবরাহ’ প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ১ কোটি টাকা। ২০২২ সালের জুলাই মাসে শুরু হওয়া প্রকল্পটি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা।
সারাদেশে ১০টি জেলার ৪৪টি উপকূলীয় উপজেলার ২২২টি ইউনিয়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। এই প্রকল্পের আওতায় বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য দুই লাখ পরিবারকে পানির ট্যাঙ্ক সরবরাহ করার কথা। প্রতিটি ট্যাঙ্কের পানি ধারণক্ষমতা তিন হাজার লিটার। গত দুই অর্থবছরে এ প্রকল্পের ২১৮ কোটি টাকার কাজ সম্পন্ন হলেও প্রতিটি কাজে ঘাপলা রয়েছে।
প্রকল্পভুক্ত এলাকাগুলোয় সেফলি ম্যানেজড পানি সরবরাহের কাভারেজ ২০৩০ সাল নাগাদ ৬০ দশমিক ১ শতাংশে উন্নীত করা হবে। এদিকে বিভিন্ন এলাকায় কার্যাদেশের চেয়ে নিম্নমানের ট্যাঙ্ক সরবরাহ হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। আবার ২০ শতাংশ কাজ করে ৮০ শতাংশ বিল তুলে নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে এই চক্রের বিরুদ্ধে।
বিশেষ করে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড, আনোয়ারা ও সন্দ্বীপ উপজেলার কিছু এলাকায় ট্যাঙ্ক বসানোর কাজ শেষ হয়েছে। দেওয়া হয়েছে সংযোগ। তবে গত বছর বর্ষার শেষে ড্রাম বসানোর কারণে প্রকল্পের সুফল পুরোপুরি পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। কোনো কোনো এলাকায় পানি সরবরাহ শুরুর আগেই পাইপ ফেটে গেছে। এসব এলাকায়ও পানি সংরক্ষণে ট্যাঙ্ক সরবরাহের জন্য অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের তিন উপজেলায় প্রথম ধাপে ২ হাজার ২১৬টি সংযোগ দেওয়া হয়েছে। যেখানে ক্যাচমেন্ট এরিয়া নির্ধারণ করা হয়েছে ২১২টি। কার্যাদেশ অনুযায়ী প্রথম ধাপে কাজ শুরু হয়েছে ২০২৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি। যার মেয়াদকাল ২০২৪ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। প্রকল্পের প্রথম ধাপের কাজ এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে ২ হাজার ২০০টি সংযোগ চালুর লক্ষ্যে কাজ শুরু হয়েছে।
আনোয়ারা উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নে উপকূলীয় এলাকায় পানির ট্যাঙ্কের বরাদ্দ এসেছে ১৫৩৪টি। বিতরণ করা হয়েছে ১২৯৬টি। উপকারভোগীরা জানান, গত বছর বর্ষার শেষে এই ড্রাম তাদের কাছে পৌঁছার কারণে চলতি মৌসুমে তারা পানি সংরক্ষণ করতে পারেনি। সঙ্গে পুকুর ও বিভিন্ন নলকূপ থেকে পানি না পাওয়ার কারণে এসব এলাকায় সুপেয় পানির সংকট দূর হয়নি।
উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের রায়পুর গ্রামের পীর হাফেজ জালাল উদ্দিন, ছখিনা বেগম, ৭ নম্বর ওয়ার্ডের আমীর আলীর মাঝির বাড়ির জাহেদুল আলম, ৪ নম্বর ওয়ার্ডের চুল্লা জামার বাড়ির শাকিবুল ইসলাম জানান, গত বছর আগস্টে পানির ড্রাম দিয়ে যায় কর্তৃপক্ষ। এরপর প্রায় দুই মাস সেগুলো পড়ে ছিল। সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে মিস্ত্রিরা এসে তাড়াহুড়া করে পাইপের সংযোগ বসিয়ে চলে যায়। কিন্তু ততদিনে বর্ষা শেষ হয়ে যাওয়ায় আর বৃষ্টি পানি ধরে রাখার সুযোগ পায়নি।
প্রকল্পের আওতায় থাকা সীতাকুণ্ডের মানুষরা জানায়, সংযোগ পেতে নির্ধারিত অর্থের বাইরে টাকা আদায় করছেন প্রকল্প পরিচালক ও ঠিকাদারের লোকজন।অনেক বিত্তবান সরকারি এই সুবিধা পেতে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ করছেন তাদের পিছনে। তাড়াহুড়া ও নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের কারণে বিভিন্ন বাড়িতে বসানো ট্যাঙ্কের মুখ থেকে সংযোগ আলাদা হয়ে গেছে।
বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের মান্দারীটোলা গ্রামের নজরুল ইসলাম জানান, গত বছরের আগস্টের দিকে মেঝে পাকা করার পর ট্যাঙ্ক বসানো হয়। একমাস পর কিছু মিস্ত্রি এসে পাইপের সংযোগ দেয়। কিন্তু নিম্নমানের সংযোগ ব্যবহারের কারণে সংযোগ পাইপ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পাইপের বিভিন্ন অংশ থেকে উঠে আসে গাম। পরে নিজেদের উদ্যোগে সেগুলো মেরামতের পর ব্যবহার উপযোগী করা হয়েছে। একই ভোগান্তিতে পড়েছেন মান্দারীটোলা গ্রামের শাহ আলমও।
বারৈঢালা ইউনিয়নের পূর্ব লালানগর এলাকার রুবেল বলেন, সরকারি তহবিলে কত জমা দিতে হয় সেটা জানি না কিন্তু আমি আড়াই হাজার টাকা জমা দিয়েছি।
সন্দ্বীপ—সন্দ্বীপে সুপেয় পানির ভয়াবহ সংকট দূর করতে ‘বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ’ প্রকল্পের আওতায় উপজেলার মগধরায় এক হাজার এবং উড়িরচরে ৪০০ পরিবারকে পানির ট্যাংক সরবরাহের কাজ শুরু হয়েছে গত বছরের সেপ্টেম্বরে।
মগধরার সুবিধাভোগী সাহাবউদ্দিন বলেন—গত বর্ষার তিন-চার মাস পর ট্যাংকটি বসানো হয়েছে, তাই এখনো সুবিধা-অসুবিধা বুঝতে পারিনি। প্রতিটি ট্যাংকের জন্য সুবিধাভোগীকে এক হাজার ৫০০ টাকা জমা দিতে হয়েছে। তবে অনেকে নাম প্রকাশ না করে বলেছেন, তাঁরা দুই হাজার থেকে দুই হাজার ৫০০ টাকা জমা দিয়েছেন।
ভুক্তভোগীরা জানান, যদিও এই তিন উপজেলার উপজেলা জনস্বাস্থ্য কার্যালয়ের প্রকৌশলীদের যোগসাজশে হরিলুট করছেন পিডি প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী নুর মোহাম্মদ ও তার টিকাদার সিণ্ডিকেট।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম উপকূলীয় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) প্রকৌশলী নূর আহাম্মদের সঙ্গে যোগাযোগ করা তিনি কল রিসিভ করেনি। এবং হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ প্রকল্পের নানা অনিয়মের বিষয়ে অবহিত করা হলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ প্রকল্পে অনানুষ্ঠানিকভাবে মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা মগের মুল্লুকের মতো একটি বিষয়। এ ধরনের কর্মকাণ্ড কোনো অবস্থায় গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বিশেষ করে যেই জনগণের নামে প্রকল্প চলছে তাদের কাছ থেকে এভাবে প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আদায় করা দুঃখজনক।
এসএস/এমএফ