বাংলাদেশ রেলওয়েতে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাটের পাশাপাশি প্রতিটা নিয়োগ পরীক্ষায়ও ঘুষের হাট বসে এখানে। আর রেল দপ্তরের “রেল খেকো কর্মকর্তারা” সব সময় থেকে গেছে ধরা ছোঁয়ার বাইরে। এতে অনিয়ম, দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য ও লুটপাট সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে। জনসেবার এ দপ্তরটি দুর্নীতির কারণে জনভোগান্তিতে পরিণত হয়েছে।
জানা যায়, মোছাঃ রাশিদা সুলতানা গনি, “যুগ্ম মহাপরিচালক অপারেশন” বাংলাদেশ রেলওয়ে রেল-ভবন ঢাকায় কর্মরত। তিনি প্রাক্তন অতিরিক্ত চীফ কমার্শিয়াল ম্যানেজার পূর্ব থাকাকালিন সময়ে তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ রেলওয়েতে ১২১টি সুইপার ও অন্যান্য পদে সরাসরি নিয়োগ বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠে।
এ নিয়োগের জন্য গঠিত নির্বাচনী কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সুলতানা গনি। তখন তিনি সরকারের নির্ধারিত বিভিন্ন কোটা না মেনে অনিয়মতান্ত্রিক ভাবে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। এবং উক্ত অপরাধে তার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপীল) বিধিমালা ১৯৮৫ এর বিধি-৩ (বি) মোতাবেক অসদাচারণ ও দুর্নীতির দায়ে বিভাগীয় মামলা রুজু করে রেল মন্ত্রাণালয়।
মন্ত্রণালয় তখন ৩০ শে জুন ২০১৬ ইং তারিখের ৫৪.০০.০০০০.০২৩.২৭.০৬.১৬-১৩৮নং স্মারক মূলে তার দুর্নীতির কৈফিয়ত তলব করে। তখন রাশিদা সুলতানা গনি উক্ত কৈফিয়ত তলবের লিখিত জবাবে সুনিদিষ্ট কোন জবাব দিতে পারেনি। যেহেতু রাশিদা সুলতানা গনি, অতিরিক্ত চীফ অপারেটিং সুপারিন্টেডেন্ট/পশ্চিম, ও প্রাক্তন চীফ কমার্শিয়াল ম্যানেজার/পূর্ব থাকাকালিন সময়ে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের প্রাথমিক তদন্ত হয় এবং এই তদন্তের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়।
অভিযোগ গঠনের পর রাশিদা সুলতানা গনিকে তার দুর্নীতির কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করে মন্ত্রাণালয়, তখন তার লিখিত ও মৌখিক জবাব গ্রহণ করে তদন্তকারী কর্মকর্তা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের বিষয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তার তদন্তে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপীল) বিধিমালা ১৯৮৫ এর ৩(বি) বিধি মোতাবেক অসদাচরণ/দুর্নীতির সত্যতা উঠে আসে। তখন রাশেদা গনির দুর্নীতির সাক্ষ্য প্রমাণ দ্বারা তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ বিধিমালা মোতাবেক দুর্নীতির দায় খন্ডন করতে তিনি ব্যর্থ হন। এবং তার দুর্নীতি তদন্তে প্রমানিত হয়।
সুতরাং, রাশিদা সুলতানা গনির বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী বিধিমালা ১৯৮৫ এর ৩(বি) বিধি মোতাবেক সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপীল) বিধি মোতাবেক অসদাচারনের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। এবং একই বিধিমালার বিধি ৪(২) (ক) অনুযায়ী তাকে ‘তিরস্কার’ দন্ডে দন্ডিত করা হয়।
কিন্তু! তিনি এ আদেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তিরস্কারের বদলে (৩য় স্কেলে বেতন) পুরস্কার নিতে তার সিন্ডিকেট ইতিমধ্য আবারো সুপারিশ ও ফাইল জমা দেওয়ার পায়তার করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। রাষ্ট্রপতি ক্ষমা না করা পর্যন্ত তিনি কিভাবে তৃতীয় স্কেলের বেতন পাওয়ার আবেদন করেন তা কর্মকর্তা আইনের লঙ্ঘন বলে জানান নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাদিক কর্মকর্তা। এবং তিনি মন্ত্রীর ভাগিনি পরিচয় দিয়ে রেল ভবনে আধিপত্য বিস্তার করে আসছে বলে জানান তারা।
জানা যায়, নিয়ম অনুযায়ী পানিসমেন্টে থাকা কোন কর্মকর্তার স্কেল উন্নতি চাওয়ার সুযোগ না থাকলেও তিনি কতিপয় কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে ৩ নম্বর স্কেলে উন্নিত করার জোর তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন বলে বিশ্বস্ত সুত্রে জানা গেছে। ইতিমধ্যে তার স্কেল উন্নতির প্রস্তাবনাটি সংস্থাপন মন্ত্রনালয়ে প্রেরন করা হয়েছে তবে শাস্তির আদেশপত্রটি সুকৌশলে ফাইল থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে বলেও সুত্র জানিয়েছে। একজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে শাস্তির বদলে প্রমোশন দেওয়ার প্রস্তাব করায় রেল ভবনেও চলছে নানা সমালোচনা ও সৎ কর্মকর্তাদের মাঝে বিরাজ করছে চাপা ক্ষোভ।
সূত্র জানায়, মহাখালী ব্রিজ, মালিবাগ, ও মগবাজারে তার তিনটি ফ্লাট রয়েছে। নামে-বেনামে তার ঢাকা শহরে রয়েছে অসংখ্য জায়গা জমি। এবং তার বড় ছেলে জার্মানি পড়াশুনা করার সুবাধে সে দুর্নীতির টাকা বিদেশেও পাচার করে বলে জানা যায়।
এ ব্যাপারে রেল মন্ত্রাণালয়ের ২ উর্ধতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সকালের-সময়কে বলেন, রাশিদা সুলতানা গনির ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, তাকে তিরস্কার ও করা হয়েছে। তারপরও যদি তিনি চাল-চাতুরীর আশ্রয় গ্রহণ করে তাহলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সে চাইলেও তৃতীয় স্কেলের বেতন ভোগ করতে পারবে না।
জানা যায়, রেলওয়েতে ১২১ জন সিপাহী ও বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় ঘুষ, প্রশ্নফাঁস হওয়া প্রশ্নে পরীক্ষা গ্রহণ, নিয়োগের ক্ষেত্রে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা লঙ্ঘনের প্রমাণও পাওয়া গেছে তার বিরুদ্ধে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার দুর্নীতি তদন্তে নেমে এসব প্রমাণ পায়। তারপরও রেলের এই ‘রেল খেকো কর্মকর্তা’ নিরাপদেই রয়ে গেছে। দুর্নীতির দায়ে তাকে তিরস্কারের মুখোমুখি হতে হলেও তিনি রয়েছেন বহাল তবিয়তে। ফলে দুর্নীতি ও হরিলুট কান্ডে এখনো ধুঁকছে রেল।
জানা যায়, নতুন মন্ত্রণালয় হওয়ার পর হরিলুটের মাত্রা বেড়ে যায় রেলে। তখন রেলকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেয় সরকার। তখন রেলের বিভিন্ন দপ্তরে জনবল নিয়োগ হয় ব্যাপকহারে। সেই সুবাদে নিয়োগ বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য ও প্রশ্নফাঁসের মতো অনিয়ম করতে থাকে রাশিদা গনি।
বর্তমানেও রেলে একের পর এক রেল খেকো কর্মকর্তাদের বিভিন্ন দুর্নীতির কেলেঙ্কারি ফাঁস হচ্ছে। এই দুর্নীতিতে রাশিদা গনির সিন্ডিকেট এখনো জড়িত বলে জানা যায়। নানা অনিয়ম-দুর্নীতি আর মামলার কারণে বর্তমানে রেল বিভাগের বিভিন্ন পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত রয়েছে। কিন্তু, তারপরও থেমে নেই নানান কৌশলে তলে তলে এই রেল কর্মকর্তার সিন্ডিকেট রেল দপ্তরে বিভিন্ন অনিয়ম চালিয়ে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে জানার জন্য রেলের যুগ্ম মহাপরিচালক (অপারেশন) মোছাঃ রাশিদা সুলতানা গণির মোঠোফোনে একাদিকবার কল দেয়া হলেও তিনি কল রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
জানা যায়, তৎকালিন ১২১ জন সিপাহি ও অন্যান্য নিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে। নিয়োগ তালিকা প্রকাশের আগে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার প্রাপ্ত নম্বর সংবলিত টেবুলেশন শিট করা হয়নি। কোটা ব্যবস্থার অপপ্রয়োগ হয়েছে। এ নিয়ে নিয়োগ কমিটির কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি দুর্নীতিবাজচক্র শত শত কোটি টাকার বাণিজ্য করেছে বলে জানান দীর্ঘ সূত্র।
সকালের-সময়/এমএফ