মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী জনগোষ্ঠী যারা রয়েছে, তারাই মাঝে মাঝে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ঢুকছে এবং হত্যার ঘটনা ঘটিয়ে যাচ্ছে। এসব বিছিন্নতাবাদীরা যাতে সীমান্তে অনুপ্রবেশ করতে না পারে সেজন্য বর্ডার ফোর্সকে আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।
শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর নটরডেম কলেজে উত্তরবঙ্গ আদিবাসী ফোরাম আয়োজিত এক আলোচনা সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন তিনি। ১৬৮তম মহান সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবস উপলক্ষে এই আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
মন্ত্রী বলেন, মিয়ানমারের সঙ্গে আমাদের কিছু সীমান্ত এলাকা অরক্ষিত রয়েছে, যেসব এলাকায় কোনো যাতায়াত নেই। নাফ নদীতে এমন কয়েকটি চরের মতো জায়গাও রয়েছে, যেখানে মিয়ানমার এবং বাংলাদেশের নো ম্যানস ল্যান্ড রয়েছে। সেখানে তারা অভয়ারণ্য তৈরি করেছে। সেখানে তারা অহরহ যাতায়াত করছে। আমরা সেই জায়গাগুলোর জন্য নিরাপত্তা বাড়াচ্ছি।
আসাদুজ্জামান খান বলেন, আমরা দুটি হেলিকপ্টার কিনেছি, সারা বর্ডারে সেন্সর লাগাচ্ছি। এ ধরনের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ব্যবস্থা নিচ্ছি। যে সমস্যাই সামনে আসছে, সেটা মাথায় নিয়ে সমাধান করছি। আপনারা দেখেছেন, আমাদের একজন সৈনিককেও তারা হত্যা করেছে।
মিয়ানমারে প্রায় ৩০টি বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী রয়েছে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমার সম্পর্কে আপনারা জানেন, সেখানে শুধু আরাকান আর্মিদের বিছিন্নতাবাদী নেই, বরং সেখানে কুকি-চিনসহ প্রায় ৩০টি গোষ্ঠী সব সময় সংঘর্ষে লিপ্ত। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী সেখান থেকেই আসছে। সেখান থেকে আসার কারণে হয়ত এখানে (রোহিঙ্গা ক্যাম্পে) তাদের দু’চারজন অনুপ্রবেশ করেছে।
তাদের মধ্যেই সংঘর্ষ হয়ে থাকতে পারে। এখানে কে নেতৃত্ব দেবে, সেটা নিয়েই সংঘর্ষ হচ্ছে। আজকের ঘটনাটি (রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দুই পক্ষের গোলাগুলিতে পাঁচ জন নিহত) আমাদের আরও বিস্তারিত জানতে হবে। ঘটনাটি ঘটেছে, এটা সত্য। তদন্ত প্রতিবেদন পেলে আমরা আরও তথ্য জানতে পারব।
আইসিসির প্রধান কৌশলী করিম খান রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনের পরদিনই পাঁচ রোহিঙ্গা হত্যার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা মনে করি, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী যত তাড়াতাড়ি তাদের দেশে ফেরত যায় ততই তাদের দেশ জন্য এবং আমাদের দেশের জন্য মঙ্গল। রোহিঙ্গারা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে এখানে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীদের একটি কেন্দ্রস্থলে পরিণত হতে পারে। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরাতে বিশ্ব ফোরামকে আহ্বান জানাতে চাই। এদের যত তাড়াতাড়ি তাদের নিজ দেশে ফেরানো যায় ততই মঙ্গল।
এর আগে আলোচনা সভায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাঁওতালদের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, আপনারা দেশের সম্পদ। কারণ আপনারা বিদ্রোহ করতে জানেন, ঘুরে দাঁড়াতে জানেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে জানেন। যেটা এ উপমহাদেশে সবাই বিশ্বাস করি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ১৬৮ বছর আগে আপনাদের দাবি অনুসরণ করে চলছেন। আমি মনে করি আপনারা সঠিক পথেই আছেন। আপনাদের যেই ইতিহাস, কৃষ্টি, আপনাদের সংস্কৃতি তা রক্ষার জন্য আপনারা যা যা করা দরকার করবেন। সরকার সবসময়ই সহযোগিতা করবে। ১৮৫৫ সালে সাঁওতাল বিদ্রোহ অনুষ্ঠিত হয়। বন্দুকের সামনে সাঁওতালরা তীর ধনুক আর শাল দিয়ে বিদ্রোহ করেছে। সেই যুদ্ধেও ৩০ জন ইংরেজ মারা গিয়েছিল। তাই যারা বীরের মতো জীবন দিয়েছিলেন তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই।
আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, আমরা বীরের জাতি। অতীতে আমরা কোনো অন্যায় বা অপকর্ম মেনে নেইনি। একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণে আমরা বার বার ঐক্যবদ্ধ হয়েছি। আমরা গারো, হাজং, মারমাসহ সবাইকে নিয়ে চলতে চাই। সবাই মিলে একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন এ দেশ হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, সাঁওতাল কিংবা এ ভূমি সবার। আমরা তার এ ডাকে সবাই সাড়া দিয়েছিলাম। স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু ঘাতকরা তাকে হত্যা করেছিল।
তিনি বলেন, সব দাবি প্রধানমন্ত্রী জানেন এবং সেগুলো পূরণে কাজ করছেন। প্রাথমিক শিক্ষা যার যার বর্ণমালা ও ভাষায় নেবে সরকার, সেই সিদ্ধান্ত নীতিগতভাবে নেয়া হয়েছে। ভূমির প্রকৃত মালিকরাই ভূমির মালিকানায় থাকবে সেই ভূমিনীতিই আমরা করছি।
সাঁওতাল জনগোষ্ঠীকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, আমরা ২০৪১ সালে স্মার্ট বাংলাদেশে রূপান্তর হচ্ছি। এ যাত্রায় সবাইকে এগিয়ে যেতে হবে। শিক্ষার আলোতে আপনারা যারা শিক্ষায় এগিয়ে যাচ্ছেন আরও এগিয়ে যেতে হবে। এখানে পিছিয়ে গেলে হবে না। আমরা সবাই মিলেই এগিয়ে যাবো। এর আগে সার্বজনীন প্রার্থনার মাধ্যমে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন খ্রিস্টান ধর্মযাজক কার্ডিনাল প্যাট্রিক ডি রোজারিও।
এসময় উত্তরবঙ্গ আদিবাসী ফোরাম এর সহ-সভাপতি মি. বদন মুরমুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট গ্লোরিয়া ঝর্ণা সরকার, বাংলাদেশ খ্রিস্টান অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নির্মল রোজারিও, ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলাম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
এসএস/ফোরকান