সকালেরসময় বিশেষ প্রতিবেদক:: জাতীয় পতাকা কীভাবে ব্যবহৃত হবে, সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট আইন থাকা সত্ত্বেও অজ্ঞতার কারণে তার লঙ্ঘন হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এতে করে জাতীয় পতাকার মর্যাদাও বিনষ্ট হচ্ছে। জেনে হোক বা অজ্ঞতার কারণে হোক, জাতীয় পতাকার অবমাননা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বিষয়টি নিয়ে লিখেছেন আবরার মাসুদ
বাংলাদেশ পতাকা রুলস, ১৯৭২ এমন একটি আইন, যেখানে জাতীয় পতাকা ব্যবহারের যাবতীয় বিধি বর্ণিত হয়েছে। আইনটির ৪ ধারায় কোন কোন দিন জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে, সে সম্পর্কে বলা হয়েছে। ওই ধারামতে, বাংলাদেশের ভেতরে ও বাইরে সরকারি-বেসরকারি ভবনে এবং বাংলাদেশ সরকারের ডিপ্লোম্যাটিক মিশনে ও হাইকমিশনে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মদিনে (ঈদে মিলাদুন্নবি), ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে, ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা যাবে।
এ ছাড়া ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস এবং জাতীয় শোক দিবসে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত করা হবে। স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসে জাতীয় পতাকা উত্তোলন আর শহীদ দিবস কিংবা জাতীয় শোক দিবসে পতাকা উত্তোলন এক নিয়মে নয়। শহীদ দিবস ও জাতীয় শোক দিবসে বা সরকার প্রজ্ঞাপিত অন্যান্য দিবসে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকার বিধান করা হয়েছে। অর্ধনমিত রাখতে হলে পতাকা উত্তোলনের নিয়ম হলো, অর্ধনমিত অবস্থায় উত্তোলনের প্রাক্কালে পতাকাটি পুরোপুরি উত্তোলন করে অর্ধনমিত অবস্থানে আনতে হবে এবং পতাকা নামানোর প্রাক্কালে পতাকাটি শীর্ষে উত্তোলন করে নামাতে হবে।
ইচ্ছা করলেই যে কেউ গাড়িতে পতাকা ব্যবহার করতে পারে না। কোন কোন ভবনে ও কারা জাতীয় পতাকা উত্তোলন করতে পারবেন, এ সম্পর্কে ওই আইনের ৬ ধারায় বলা হয়েছে। ওই ধারায় বলা হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবন ও অফিসে সব কর্মদিবসে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। ৬(৩) ধারায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর গাড়িতে, নৌযানে ও বিমানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করতে পারবে। এ ছাড়া স্পিকার, প্রধান বিচারপতি, মন্ত্রী, চিফ হুইপ, ডেপুটি স্পিকার, জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের নেতা, মন্ত্রী সমমর্যাদার ব্যক্তি, বিদেশে বাংলাদেশি মিশনের প্রধানের গাড়িতে ও তাদের নৌযানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করতে পারবেন।
প্রতিমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদাপ্রাপ্ত ব্যক্তি, উপমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীর মর্যাদাপ্রাপ্ত ব্যক্তি রাজধানীর বাইরে ভ্রমণকালে গাড়িতে ও নৌযানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করতে পারবেন। ৭ ধারায় জাতীয় পতাকার মর্যাদা রক্ষার কথা বলা হয়েছে। ওই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, জাতীয় পতাকার প্রতি যথাযথ মর্যাদা ও সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। যদি পাশাপাশি ২টি পতাকা উত্তোলন করা হয়, সে ক্ষেত্রে জাতীয় পতাকা ভবনের ডান দিকে উত্তোলন করতে হবে। জাতীয় পতাকার ওপর অন্য কোনো পতাকা উত্তোলন করা যাবে না।
এ ছাড়া বাংলাদেশ জাতীয় সঙ্গীত, পতাকা ও প্রতীক অর্ডার, ১৯৭২-এর ৩ ধারায় বলা হয়েছে, জাতীয় পতাকা কেমন মাপের ও রঙের হবে। জাতীয় পতাকার মাপ হবে ১০:৬ দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের আয়তাকার ক্ষেত্রের গাঢ় সবুজ রঙের মাঝে লাল বৃত্ত এবং বৃত্তটি দৈর্ঘ্যের এক-পঞ্চমাংশ ব্যাসার্ধবিশিষ্ট হবে। ভবনে ব্যবহারের তিন ধরনের মাপ হচ্ছে ১র্০:র্৬, র্৫:র্৩ ও ২.র্৫:১.র্৫। তবে অনুমতি সাপেক্ষে ভবনের আয়তন অনুযায়ী এবং দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের অনুপাত ঠিক রেখে বড় আয়তনের পতাকা প্রদর্শন করা যাবে।
কোনো মোটরগাড়িতে পতাকা প্রদর্শিত হলে পতাকার দ- অবশ্যই দৃঢ়ভাবে গাড়ির চেসিস কিংবা রেডিয়েটর কেনের ক্ল্যাম্পের সঙ্গে দৃঢ়াবদ্ধ করতে হবে। বিদেশি পতাকা বা রঙিন পতাকার সঙ্গে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনকালে বাংলাদেশের পতাকাকে সম্মান প্রদর্শনের জন্য স্থান সংরক্ষিত থাকবে। যে ক্ষেত্রে শুধু দুটি ভিন্ন পতাকা থাকবে, সে ক্ষেত্রে ভবনের ডানপাশে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করতে হবে এবং দুইয়ের অধিক পতাকার সঙ্গে উত্তোলনকালে পতাকার সংখ্যা বিজোড় হলে বাংলাদেশের পতাকা ঠিক মাঝখানে থাকবে।
তবে জোড়সংখ্যক পতাকার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পতাকা কেন্দ্র থেকে ডান দিকের প্রথমে উত্তোলন করতে হবে। অন্য কোনো দেশের পতাকার সঙ্গে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পতাকা প্রথম উত্তোলিত হবে এবং সর্বশেষে নামানো হবে। বাংলাদেশের পতাকার ওপর অন্য কোনো পতাকা বা রঙিন পতাকা ওড়ানো যাবে না। মিছিলে ব্যবহার করতে হলে মিছিলের কেন্দ্রে অথবা মিছিলের অগ্রগমন পথের ডান দিকে বহন করতে হবে। অনেকেই জাতীয় পতাকায় নকশা করে ফ্যাশন হিসেবে ব্যবহার করেন।
কিন্তু জাতীয় পতাকার ওপর কোনো কিছু লেখা বা মুদ্রিত করা যাবে না অথবা কোনো অনুষ্ঠান বা উপলক্ষে কোনো চিহ্ন অঙ্কন করা যাবে না; এমনকি জাতীয় পতাকাকে পোশাক হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না এবং গায়ে জড়িয়ে রাখা যাবে না। তবে পূর্ণ সামরিক মর্যাদা বা পূর্ণ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ব্যক্তিকে সমাধিস্থ করা হলে তার শবযাত্রায় জাতীয় পতাকা আচ্ছাদন হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। অনুমতি ছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্য বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে জাতীয় পতাকাকে ট্রেডমার্ক, ডিজাইন বা পেটেন্ট হিসেবে ব্যবহার করাও অপরাধ। কোনো অবস্থায়ই পতাকা নিচে অবস্থিত কোনো বস্তু যেমন_ মেঝে, পানি ও পণ্যদ্রব্য স্পর্শ করবে না এবং কবরের ওপরে স্থাপন করার সময় পতাকাটি কবরে নামানো যাবে না কিংবা মাটি স্পর্শ করবে না।
পতাকা এমনভাবে উত্তোলন, প্রদর্শন বা মজুদ করা যাবে না, যাতে এটি সহজেই ছিঁড়ে যেতে পারে, মাটি লাগতে পারে বা নষ্ট হতে পারে। কোনো দেয়ালে দ-বিহীন পতাকা প্রদর্শিত হলে তা দেয়ালের সমতলে এবং রাস্তায় প্রদর্শিত হলে উলম্বভাবে দেখাতে হবে। গণমিলনায়তন কিংবা সভায় পতাকা প্রদর্শন করা হলে বক্তার পেছনে ও ঊধর্ে্ব স্থাপন করতে হবে।
আইনের ৫ ধারায় বলা হয়েছে, জাতীয় পতাকার প্রতি অবমাননা প্রদর্শন করা বা জাতীয় পতাকার প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন না করলে ওই ব্যক্তিকে ১ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে।
২০১০ সালের জুলাই মাসে এই আইন সংশোধিত হয়। এই সংশোধনীতে সর্বোচ্চ ২ বছর পর্যন্ত শাস্তি এবং ১০ হাজার টাকা অর্থদ-ের বিধান রাখা হয়। না জেনে, না বুঝে আর অতি উচ্ছ্বাসে যারা পতাকা ব্যবহারবিধি লঙ্ঘন করেন, তাদের অপরাধের মাত্রা বিবেচনা করে এই শাস্তির বিধান যথাযথ হতে পারে। তবে কোনো প্রতিষ্ঠান যদি বাণিজ্যিক কোনো প্রচারণায়, বিজ্ঞাপনে জাতীয় পতাকার ব্যবহার বিধিবহির্ভূতভাবে করে থাকে, তার জন্য ১০ হাজার টাকা অর্থদ-ের বিধান রাখা হয়েছে, যাকে অনেকেই অপ্রতুল মনে করছেন।
ভারতীয় ক্রিকেটার শচীন টেন্ডুলকারের জন্মদিনের কেক ভারতীয় পতাকার মতো তিনরঙা ছিল বলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল পতাকা অবমাননার। সেলিব্রেটিদের পতাকা-রঙা শাড়ির পাড় পা ছুঁই ছুঁই করেছিল বলে বিষয়টা আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছিল। খেলার সময় পরিধেয় হেলমেটে বিসিসিআইর পরে জাতীয় পতাকা অঙ্কিত ছিল বলে শচীন টেন্ডুলকার আরো একবার পতাকা অসম্মানের দায়ে অভিযুক্ত হন। এরপর তাকে হেলমেটে আগে জাতীয় পতাকা ও তারপর বিসিসিআই অঙ্কিত করতে হয়েছিল।
এক্ষেত্রে চীনের আইন আরো কঠোর। আটকাদেশ, তিন বছরের জেল-জরিমানা ছাড়াও ব্যক্তির রাজনৈতিক অধিকার খর্ব হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে চীনের জাতীয় পতাকা ব্যবহারবিধি আইনে। ফিনল্যান্ড, জার্মানি এবং ডেনমার্কে জাতীয় পতাকার অবমাননা অবৈধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আরব বিশ্বের অনেক দেশেই জাতীয় পতাকায় ইসলামিক স্বাক্ষর রয়েছে। এসব দেশে জাতীয় পতাকার মর্যাদাকে অগ্রাধিকার দেয়া হয় এবং জাতীয় পতাকার নূ্যনতম অবমাননাকে ইসলামের অবমাননা হিসেবে বিবেচিত হয়।