বিষয় :

নিম্নমানের ১০ ইঞ্জিনের অর্থ ছাড় বন্ধ করে দিল এডিবি


২৬ মে, ২০২১ ২:৪৬ : পূর্বাহ্ণ

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণে ১০টি মিটারগেজ ইঞ্জিন কিনেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই রোটেম সরবরাহকৃত ইঞ্জিনগুলোয় দরপত্রের শর্তানুসারে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সংযোজন করেনি। এতে ইঞ্জিনগুলোর মূল্য পরিশোধ প্রায় ৯ মাস ধরে ঝুলে আছে।

এবার ইঞ্জিনগুলোর ঋণের অর্থ ছাড়ও বন্ধ করে দিয়েছে এডিবি। ইঞ্জিন নিয়ে জটিলতা নিরসন না হওয়া পর্যন্ত মূল্য পরিশোধ বন্ধ থাকবে বলে সম্প্রতি জানিয়েছে সংস্থাটি। এদিকে এডিবির ঋণ চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে ৩০ জুন। এ অবস্থায় এডিবি ঋণ চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধিতে সম্মত না হলে নতুন জটিলতা তৈরি হবে।

আর ইঞ্জিন সরবরাহকারী হুন্দাই রোটেমকে রেলের পক্ষ থেকে চিঠি দেয়া হলেও তারা সাড়া দিচ্ছে না। আবার ইঞ্জিনগুলোর অবস্থা যাচাই গঠিত কারিগরি কমিটিও কাজ করতে পারছে না। কারণ আগের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন রেলভবনে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে প্রকল্পটি নিয়ে জটিলতা বাড়ছে।

সূত্রমতে, ১০টি মিটারগেজ ইঞ্জিন (লোকোমোটিভ) কেনায় দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই রোটেমের সঙ্গে ২০১৮ সালের ১৭ মে চুক্তি করে রেলওয়ে। চুক্তিমূল্য ছিল তিন কোটি ৭৯ লাখ ৬৩ হাজার ৪০০ ডলার বা প্রায় ৩১৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২৫ শতাংশ অর্থ অগ্রিম দেয়া হয়। বাকি অর্থের মধ্যে ইঞ্জিনগুলো দেশে আসার পর ৬৫ শতাংশ বা ২০৭ কোটি টাকা পরিশোধের কথা। গুণগত মান যাচাই শেষে বাকি ১০ শতাংশ অর্থ পরিশোধের শর্ত ছিল।

যদিও নিম্নমানের ইঞ্জিন সরবরাহের কারণে চুক্তিমূল্যের ৬৫ শতাংশ অর্থ আটকে দেন তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক নূর আহম্মদ হোসেন। নিম্নমানের ইঞ্জিন গ্রহণে অস্বীকৃতিও জানান তিনি। পাশাপাশি এডিবিকেও জানানো হয় বিষয়টি। এর পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত কমিটি গঠন করে রেলপথ মন্ত্রণালয়। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়। এতে হুন্দাই রোটেম ও প্রি-শিপমেন্ট ইন্সপেক্টর সিঙ্গাপুরের সিসিআইসিকে অভিযুক্ত করা হয়।

তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ইঞ্জিনগুলো তৈরিতে কারিগরি শর্ত অনুসরণ করা হয়নি। ইঞ্জিন, অলটারনেটর, কম্প্রেসর ও ট্রাকশন মোটর এ চারটি ক্যাপিটাল কম্পোনেন্টস চুক্তি অনুযায়ী সরবরাহ করা হয়নি। ফলে টেস্ট রানের সময় ইঞ্জিনের ব্রেক হর্সপাওয়ার ২২০০বিপিএইচ ও ট্রাকশন হর্সপাওয়ার ২০০০টিএইচপি হওয়ার কথা থাকলেও পাওয়া যায় যথাক্রমে ২১৭০বিপিএইচ ও ১৯৪২টিএইচপি।

জানা যায়, রেলপথ সচিবের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়া হলেও অজ্ঞাত কারণে তিন মাস ধরে তা গোপন করে রাখা হয়েছে। আর হুন্দাই রোটেম বা সিসিআইসি কারও বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। যদিও বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম ও সকালের-সময় ডটকম অনলাইন পত্রিকায় ১০ ইঞ্জিনের অনিয়মের বিষয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে ইঞ্জিনগুলোর জন্য বরাদ্দকৃত ঋণ ছাড় আটকে দিয়েছে এডিবি। এক্ষেত্রে আগে ইঞ্জিনের গুণগত মান নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা নিরসনের শর্ত দেয়া হয়। সংস্থাটি সম্প্রতি রেলওয়েকে এক চিঠিতে এ কথা জানায় এডিবি।

এদিকে এডিবির ঋণ চুক্তির মেয়াদ আগামী ৩০ জুন শেষ হচ্ছে। তবে এ মেয়াদ বাড়ানো হবে কি না তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া গত ২৪ এপ্রিল হুন্দাই রোটেমকে চিঠি দিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক। এতে নিম্মমানের অলটারনেটর বদলে দেয়া ও এ-সংক্রান্ত কর্মপরিকল্পনা জানানোর অনুরোধ করা হয়। তবে এর কোনো উত্তর দেয়নি কোম্পানিটি। ফলে গতকাল পুনরায় এ-সংক্রান্ত আরেকটি চিঠি ইস্যু করা হয়েছে।

এ বিষয়ে প্রকল্পটির বর্তমান পরিচালক মোহাম্মদ হাসান মনসুর জানান, এডিবি চিঠি দিয়ে অর্থ ছাড় বন্ধ রাখার বিষয়টি জানিয়েছে। নিম্নমানের ইঞ্জিনের কারণে ইমেজ ক্ষুন্ন হওয়ার বিষয়টিও জানানো হয়েছে চিঠিতে। তবে ঋণ চুক্তির মেয়াদ বাড়বে কিনা তা বলা যাচ্ছে না।

বিষয়টি নিয়ে এডিবির সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। তবে এডিবি ঋণ না দিলে জটিলতা আরও বাড়বে। কারণ তখন সরকারি তহবিল থেকে ইঞ্জিনের মূল্য পরিশোধ করতে হবে। অন্যথায় হুন্দাই রোটেম আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করতে পারে।

তিনি আরও বলেন, ইঞ্জিনগুলো জটিলতা নিরসনে কোনো পক্ষই সহায়তা করছে না। রেলওয়ে ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিয়ে চুপ রয়েছেন। আবার হুন্দাই রোটেমকে চিঠি দেয়া হয়েছে। কিন্তু তারাও উত্তর দিচ্ছে না।

যদিও গত ২৩ মার্চ রেলপথ মন্ত্রণালয় কারিগরি কমিটি গঠন করে ইঞ্জিনগুলো চালানোর উপযুক্ত কিনা যাচাইয়ের জন্য। এর এক সপ্তাহ পর ১ এপ্রিল আগের প্রকল্প পরিচালককে বদলি করে দেয়া হয়। আর ৪ এপ্রিল থেকে নতুন প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন মোহাম্মদ হাসান মনসুর। তিনি দায়িত্ব নেয়ার পর ইঞ্জিনগুলো নতুন করে ট্রায়াল রানের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এরই মধ্যে কয়েক দফা কনটেইনার ট্রেন চালানো হয়েছে ইঞ্জিনগুলো দিয়ে।

এদিকে ২৫ ফেব্রুয়ারি জমা দেয়া তদন্ত প্রতিবেদনে নিম্নমানের ইঞ্জিন সরবরাহের কারণে হুন্দাই রোটেম ও সিসিআইসির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করেছিল তদন্ত কমিটি। তবে তিন মাস পেরিয়ে গেলেও কোম্পানি দুটির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। উল্টো এখন তদন্ত প্রতিবেদনই খুঁজে পাচ্ছে না কারিগরি কমিটি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রেলপথ সচিবের কাছে প্রতিবেদনটি জমা দেয়া হলেও এ বিষয়ে কারিগরি কমিটি সহায়তা পাচ্ছে না। তাদের জানানো হয়েছে, প্রতিবেদনটি দেখতে অন্য কোনো কর্মকর্তাকে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু কাকে দেয়া হয়েছিল তা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এতে বাধ্য হয়ে তদন্ত কমিটির প্রধান ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব প্রণব কুমার ঘোষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে কারিগরি কমিটি।

তবে তিনি প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন বলে জানান। এছাড়া প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ হাসান মনসুরের সঙ্গে যোগাযোগ করে কমিটি। তবে তাকে প্রতিবেদনের কোনো কপি দেয়া হয়নি বলে কমিটিকে জানান তিনি। এ বিষয়ে তিনি বলেন, প্রতিবেদনের কপি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না শুনতে পেলাম। এর বেশি বলতে পারছি না।

বিষয়টি নিয়ে জানতে রেলপথ সচিব মো. সেলিম রেজার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল রিসিভ করেননি। পরে এসএমএস দেয়া হলে ও একাধিকবার কল করলেও তিনি উত্তর দেননি।

সূত্র: এসবি

0Shares

আরো সংবাদ